বড়গিন্নী চাপা ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, ইল্লি মারি গুরু গোঁসাই! কত ছলাই জানো! মেয়ের বয়সী মেয়েমানুষ আর কখনো দেখি নি আমি! যাও যাও, যেখানের মানুষ সেখানে যাও। সুহাসকে আমি কোথাও পাঠাব না, ব্যস।
মেজকর্তা নিরুপায় ভঙ্গীতে বলেন, কিন্তু আমি যে কথা দিয়েছি। আমার কথাটার একটা দাম আছে তো?
ওঃ! আর আমার কথার দাম নেই, কেমন?
কী মুশকিল! সে কথা কে বলছে-, মেজকর্তা কূট-কৌশল ধরেন, আমি বলছি ও তোমার যখন বিনি চেষ্টায় আপদ বিদেয় হচ্ছে হতে দাও! জানই তো গলায়-দড়ি-মড়ার সদ্গতি হয় না? আর পৃথিবীতে যার প্রতি বেশী টান ছিল, তার ধারে কাছে ঘুরে ঘুরে আসে। ওই মেয়েটা তো ওর একটাই সন্তান, অবিশ্যিই টান ছিল খুব।
বড়গিন্নী শিউরে রামনাম করে উঠলেন।
খুব!
খুব বললে আর কতটুকু বলা হয়? সন্তানে এত আকর্ষণ দত্তগিন্নী অন্তত দেখেন নি কখনো। যাক আর কাঠ-খড় পোড়াতে হল না, ওই এক মশালেই কার্যসিদ্ধি হয়ে গেল মেজবাবুর। সুহাসিনী শত অনিচ্ছে নিয়ে সত্যর সংসারে এসে উঠল।
.
অনিচ্ছে সকলেরই।
নবকুমারের তো মোল আনাই অনিচ্ছে, সত্যরও আগের সেই বেশ একটি মধুর কর্তব্যের আনন্দ রইল না আর। নেহাতই নীরস কর্তব্যের দায়ে ঘরে আনল তাকে। বাক্যদত্ত হয়েছিল শঙ্করীর কাছে তাই।
তা এসব তো সেই বছর চারেক আগের কথা।
এখন তো বেথুন স্কুলে তিন ক্লাস পড়া হয়ে গেল সুহাসিনীর।
স্কুলে সুবিধের জন্যেই হোক আর দত্তবাড়ির আওতা-মুক্ত হতেই হোক, মুক্তারাম বাবু স্ট্রীটের সেই বাড়ি ছেড়ে বাগবাজারে উঠে এসেছিল সত্য। এ বাড়িতে ভাড়া বেশী, অসুবিধের ঢের, তবে পরম লাভ গঙ্গা খুব নিকটে। নিত্য গঙ্গাস্নানের পুণ্য অর্জন হয়।
আর?
আরও একটা আকর্ষণ আছে, যে খবর নবকুমারের অজ্ঞাত। নবকুমারের অজানিতেই দুপুবেলা একটা জায়গায় আনাগোনা শুরু করেছে সত্য।
যাক, সে তো নবকুমারের অজানিতেই, তার জন্যে নবকুমারের সুখ-দুঃখ নেই, মোটামুটি সুখেই তো থাকবার কথা তার। কারণ বাড়ির ভাড়া যেমন বেড়েছে, তেমনি অফিসের মাইনেও তার বেড়েছে অনেক। ছেলে দুটি প্রত্যেক বছর ফার্স্ট সেকেণ্ড হয়ে ক্লাসে উঠেছে, একজন পাস দিয়েছে। সত্যর অটুট স্বাস্থ্য আর অপরিসীম কর্মক্ষমতা সংসারটিকে একখানি নিটোল মুক্তোর মত করে রেখেছে।
দেশের বাড়িতে মা-বাপও আছেন ভাল।
নিতাইটারও মতিগতি ফিরেছে বলা চলে। আর কি চাইবার আছে?
ছিল না।
চাইবার আর কিছু ছিল না, কিন্তু হঠাৎ ভয়ানক লোকসান ঘটে গেল।
হ্যাঁ, হঠাৎই। আর যা হয়েছে তার চারা নেই।
বিনা মেঘে বজ্রাঘাত ঘটেছে নবকুমারের, ষোলো সুখে বিষাদ!
ভবতোষ মাস্টার ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেছেন!
পতিত হয়েছেন।
৩৭. দেশের বাড়িতে আর এক চেহারা
দেশের বাড়িতে আর এক চেহারা ছিল ভাবিনীর। সারাদিন গাধার মত খাটুনি, সারারাত মোষের মত ঘুম। সাত চড়ে মুখে ‘রা’ নেই। মামাশ্বশুরবাড়ির তামন্ত প্রাণীকে যমের মত ভয়।
কলকাতার বাসায় আসার আগে, এতখানি বয়েস পর্যন্ত নিতাইয়ের সঙ্গে কটা কথা বলেছে তার বৌ, বোধ করি হাতে গুনে বলতে পারে নিতাই। শুধু সেই অনেকদিন আগে যখন একবার বাসায় আসার কথা উঠেছিল, তখনই যা বৌয়ের একটু স্পষ্ট গলা শুনতে পেয়েছিল নিতাই।
বৌ বলেছিল, গলায় দড়ি আমার! লোকলজ্জা ভাসিয়ে গালে মুখে চুনকালি মেখে বাসায় যাব তোমার সঙ্গে?
আশেপাশে কোনোখান থেকে যে ‘আড়িপাতা’র লীলা চলেছে, এ জ্ঞান টনটনে থাকার দরুনই বোধ হয় বৌয়ের এই উচ্চ কণ্ঠ।
শুনে নিতাইয়ের চুন মুখ আরো চুন হয়ে গিয়েছিল।
পরদিন মামী বলেছিল, কি রে নিতাই, পরিবারকে বাসায় নিয়ে যাবি নাকি, তোর ওই পেরাণের বন্ধুটার মতন?
নিতাই উড়িয়ে দিয়ে বলেছিল, কী যে বল! ক্ষেপেছ?
মামী বলেছিল, দ্যাখো বাপু, ভবিষ্যতে আমায় দুষো না। বৌমাকে আমি বলেছিলাম, মনের বাসনা চেপে এখেনে পড়ে থাকার দরকার নেই, যাবে তো যাও। তা আবাগীর বেটি বলে কি, তোমাদের পা আঁকড়ে পড়ে থাকব, দেখি আমায় কে নিয়ে যেতে পারে তোমাদের আচ্ছয় থেকে।
মামীর কণ্ঠে পরিতৃপ্তির সুর ঝরে পড়েছিল।
আর নিতাই তার ধর্মপত্নীর ধর্মজ্ঞানের পরিচয়ে পরিতৃপ্ত হয়েই কলকাতায় এসে নবকুমারের সংসারে ভর্তি হয়েছিল।
কিন্তু সে তো সেই গোড়ার দিকের কথা।
তারপর তো কত জল গড়াল, কত জল ঘোলাল। নিতাইয়ের দশ দশা ঘটল। এবং অবশেষে বন্ধুপত্নীর নির্দেশে অথবা আদেশে আবার সেই পুরনো প্রস্তাব নিয়ে দেশে গেল!
ভেবেছিল বেশ একটু লড়তে হবে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এবারে বিনাযুদ্ধেই রাজ্য দখল হয়ে গেল। ঈশ্বর জানেন কে কোথায় কি কলকাঠি নেড়েছিল, তবে নিতাইয়ের বলার আগেই মামী বললেন, কতকাল আর ‘মেছে’র ভাত খাবি, বৌমাকে এবার নিয়ে যা।
মামাও তাই বললেন।
এবং দেখা গেল বৌ বিনাবাক্যে সুড়সুড় করে নিতাইয়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করল। তার গায়ে যে চুনকালি পড়েছে, এমন মনে হল না ভাবগতিক দেখে।
তাহলে ব্যাপারটা এই
নিতাইয়ের চরিত্র-চ্যুতির খবর দেশ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। কারণ নিন্দে আর মন্দ খবরের পাখা থাকে। আর সে পাখা অনেক ‘অশ্বশক্তি’ সম্বলিত।
শুনে অবধি বৌ ধরাশয্যা নিয়েছিল, আর অভিভাবকরা চিন্তান্বিত হয়ে স্থির করেছিলেন, ঘাঁটি আগলাতে সেনাপতি পাঠানো প্রয়োজন। আর ইতিমধ্যে তো গ্রামের বেশ কয়েকটা বৌ-ই গ্রাম ছেড়েছে। মামীর নিজের বাপের বাড়ির গ্রাম থেকেই চার-চারটে বৌ জামালপুরে চলে গেছে। এখানের একটা গেছে কাঁচড়াপাড়ায়, একটা সাহেবগঞ্জে। রেলের চাকরি হয়েই ছেঁড়াগুলো সাপের পাঁচ পা দেখছে, লজ্জাসমের মাথা খেয়ে বৌ নিয়ে বাসায় যাচ্ছে।
