দত্তদের খিড়কির দরজা দিয়ে বার হয়ে গেল শঙ্করীর মৃতদেহ। নিজের দরজায় কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল সত্য। যখন চলে গেল, চোখছাড়া হয়ে গেল, হাত দুটো একবার তুলে নমস্কার করে মনে মনে বলল, এত পতনেও ভেতরে ভেতরে তুমি খাড়া তেজী ছিলে বৌ, বুঝতে পারছি। তাই ছোট ননদের করুণার আশ্রয়ে থাকতে আর রইলে না। সবাই শুধোচ্ছে কারণ, কারণ! হাড়ে হাড়ে বুঝেছি, আমিই কারণ। কি করব, আমার নিয়তি! ভগবান যাকে যার নিমিত্ত করেন!
ঠিক এই সময়ে ও-বাড়ি থেকে একজন দাসী ডাকতে এল সত্যকে, বড় গিন্নীমা ডাকতেছে।
সত্য দ্বিরুক্তি করল না।
হয়তো এই ডাকটির প্রতীক্ষাই করছিল।
অবশ্য ডেকে ওকে সন্দেশ খাওয়াবেন দত্তগিন্নী, এমন আশা করবারও হেতু ছিল না। তবে এটাও ভাবে নি সত্য। ভাবে নি ন ভূতো ন ভবিষ্যতি করে গাল পাড়বেন তিনি তার সাত নম্বরের প্রজার বৌকে। একবার যেন পুলিসেরও ভয় দেখালেন, কারণ দশেধর্মে সাক্ষী দেবে, সত্যর পরামর্শতেই হঠাৎ সাদাসিধে ভালমানুষটা কেমন বিগড়ে গেছল।
তুমিই ওর মৃত্যুর কারণ। নইলে বেশ তো ছিল এযাবৎ! বললো দত্তগিন্নী।
সত্য মাথা নীচু করে সব অভিযোগ মেনে নিয়ে শুধু বলল, যা হবার তা তো হয়েই গেল, মেয়েটাকে আমায় দিন।
তোমায় দেব? মেয়েটাকে?
অমন একটা রূপবতী উঠতি বয়সের মেয়েকে অমনি এক কথায় বিলিয়ে দেবেন, এত বোকা নন দত্তগিনী! ও জিনিস হল হাতের একটা হাতিয়ার। ওকে দিয়ে সময়ে অসময়ে কত কাজ হাসিল হতে পারে, কত কাজে লাগতে পারে। তাই ভুরু কুঁচকে বলেন তিনি, তোমায় দেব মানে? তুমি কি ওর অছি? আমার সংসারেই থাকবে ও। যেমন ওর মা ছিল।
সত্য মুখ তুলে প্রশ্ন করে, পানসাজুনি চাকরানী হয়ে?
দত্তগিন্নী কালিমুখে কঠিন গলায় বলেন, তা চাকরানীর মেয়ে চাকরানী হবে না তো কি রাজরানী হবে? তবে কিনা আমাদের ঘরের পুরুষ বেটাছেলেদের দয়ার শরীর, নজরে পড়তে পারলে তাও হওয়া আশ্চয্যি নয়।
এই বিষাক্ত হুলটা যে দত্তগিন্নী জেনে বুঝে ইচ্ছে করে ফোঁটালেন, তাতে আর সন্দেহ কি! আসল কথা শঙ্করীর মরণটার জন্য আগাগোড়া সত্যকে দায়ী করে বসে আছেন তিনি, কি না জানি মন্তর কানে দিলে, আর জলজ্যান্ত ভাল ঝিটা তার কর্পূরের মত উপে গেল! এর ওপর আবার তার মেয়েটাকে দাবি করতে আসছে!
ওরে আমার কে রে!
তোমার অহঙ্কার ভাঙবার দিন এবার এসেছে আমার। বুঝেছি তোমার ভেতরের শাঁস। ওই সুহাসের মা তোমার দেশের লোক! কোন না আত্মীয়ই! তুমিও তবে সেই পদেরই লোক। মুখে অহঙ্কার দেখিয়ে আমার সঙ্গে টেক্কা?
সত্যবতী দত্তগিন্নীর মনের কথাটা বোধ করি মুখের ভাষা থেকেই আবিষ্কার করে ফেলে। তাই বিচলিত হব না প্রতিজ্ঞা করেই বলে, তা হলে তো সুবিধেই। আপনাদের ঘরের পুরুষদের যখন এত দয়ার শরীর, তখন আর ওর কী গতি হবে ভেবে কাতর হই কেন? সদ্গতিই হবে মনে হচ্ছে।
দত্তগিন্নী ভুরু কুঁচকে বলেন, কী বললে?
ওই তো বললাম!
সদগতির কথা কি বললে?
ওই তো বললাম, যদি বুঝতে না পেরে থাকেন, তবে বোঝাতে পারব না, পরে বুঝবেন। আচ্ছা তা হলে যেতে অনুমতি দিন।
দত্তগিন্নী আবার নিজমূর্তি ধলেন। বললেন, তোমায় আমি পুলিসে দিতে পারি জান? বলতে পারি, আমার লোক তোমার প্ররোচনায় মরেছে?
সত্য মৃদু হেসে বলে, তবে সেই চেষ্টাই করুন। কিন্তু আপাতত আপনাদের কোন দাসী কি ছোট ছেলেকে আমার সঙ্গে দিন, দেখিয়ে দেবে কোথায় আপনাদের বৈঠকখানা!
বৈঠকখানা দেখিয়ে দেবে? বৈঠকখানায় যাবে তুমি? তোমার মতলবখানা কি তাই বল তো?
দয়ার মানুষদের কাছে একটু ভিক্ষে চাইব। বামুনের মেয়ের তাতে দোষ নেই।
এ তো আচ্ছা জাহাবাজ মাগী! দত্তগিন্নী তেড়ে খাট থেকে উঠে দুম দুম করে মাটিতে নেমে আসেন, বলেন, তোমার রীতি-নীতি তো ভাল দেখছি না! বৈঠকখানা বাড়িতে গিয়ে পুরুষদের কাছে কী ছলা-কলা করতে যাবে শুনি? বলি একটু লাজ লাগবে না?
সত্যর মাথার কাপড়টা খসে পড়েছিল, সত্যর মুখটা লাল হয়ে উঠেছিল, দুটোকেই সংবরণ করে সত্য শান্ত সুরে বলে, লজ্জার কি আছে? শুদ্দুর মাত্রেই ব্রাহ্মণকন্যার সন্তানতুল্য। সন্তানের কাছে মায়ের লজ্জার কথাটা উঠবে কেন?
তারপর কিসে কি হল দত্তগিন্নীর অজ্ঞাত!
তবে সুহাসিনীকে সত্যর সংসারেই ভর্তি করে দিতে হল তাঁকে।
মেজকর্তা অর্থাৎ মেজ দ্যাওর চটি ফটফটাতে ফটফটাতে অন্দরে ঢুকে এসে আদেশ দিলেন, ওই বামনী-মাগীর মেয়েটাকে সাত নম্বর বাড়িতে চালান করে দাও গে বড়বৌ, মেয়েটা নাকি ওদের দেশের লোক।
বৌ-মরা দ্যাওর, বলতে গেলে বড়গিন্নীর হাতের মুঠোর সম্পত্তি, তাই ভ্রূভঙ্গী করে প্রশ্ন করেন তিনি, কে কার দেশের লোক, সে খবর তোমার কানে আসে কোথা থেকে?
আসে কোথা থেকে! শোন কথা! কানে গিয়ে ঢেলে দিয়ে এলে আসবে না? ওই বাড়ূয্যের পরিবার তো নিজে গিয়ে বলল
বলল! তোমার সঙ্গে কথা কয়ে বলল!
আহা পষ্টাপষ্টি কথা কয়ে কি আর বলল? একটা চাকরানীকে দিয়ে বলল-
আর তুমি অমনি সোন্দর মুখ দেখে গলে গেলে! ধন্য বটে! এসব অন্দরমহলের কথায় তোমার থাকবার দরকার নেই মেজবাবু। পুরুষ-মজানি মেয়েমানুষকে কি করে শায়েস্তা করতে হয় আমার জানা আছে।
মেজবাবু বিচলিত হলেন।
আঃ, কী যা-তা বলছ? ভদ্রঘরের মেয়েছেলে, বলতে গেলে আমার মেয়ের বয়সী, এসব কী কথা! ছি ছি!
