হঠাৎ আরও একদিনের মত নিতাই একটা কাজ করে বসে। হেঁট হয়ে সত্যর দুই পায়ে হাত দিয়ে সে মাথায় হাত ঠেকিয়ে বলে, নিজের হিত অহিত আমি বুঝি না বৌঠান, বুঝি শুধু আপনাকে। আপনি যদি হুকুম করেন, তা হলেই
হ্যাঁ, হুকুমই করছি আমি। সত্য দৃঢ় স্বরে বলে, হুকুম করছি মানুষের মত ঘর-সংসার কর, অলীক স্বপ্ন নিয়ে মাথা ঘামিও না।
নিতাই চলে যায়।
সত্য চলে যায় নিজের কাজে। নবকুমার বোকার মত দাঁড়িয়ে থাকে ফ্যালফেলিয়ে। প্রকৃত ঘটনা যে কি ঘটল, তা যেন অনুধাবন করতে পারছে না। অথচ ওর চোখের ওপরই এমন একটা কিছু ঘটল, যেটা ঠিক সচরাচরের নয় এ বোধ আসছে। সত্য আর নিতাই যেন উর্দু ফার্সি অন্য আর এক ভাষায় কথা বলল।
অথচ সত্যকে এখন জিজ্ঞেস করে ব্যস্ত করাও চলে না। শঙ্করীর কীর্তিতে সত্য নিতান্তই মনমরা এখন।
.
সত্যি, শঙ্করী যে সত্যর সঙ্গে এত বড় শক্রতা সাধবে, এ কি সত্য স্বপ্নেও ভেবেছিল? এ যেন পূর্বজন্মের শত্রুতার ঋণশোধ করে গেল শঙ্করী!
নইলে চিরদিনই হারিয়ে যাওয়া মানুষটা, একদিনের তরে মনের কোণেও যাকে আনে নি, সে হঠাৎ এমন আচমকা দেখাই বা দেবে কেন, চেনাই বা করবে কেন?
কত সুখে কাটাচ্ছিল সত্য, হঠাৎ যেন শঙ্করী তার সেই সুখের প্রাণে একটা ছুরির আঁচড় টেনে ক্ষত করে দিয়ে গেল।
সেই যে গল্প আছে কবর থেকে প্রেতাত্মা উঠে এসে মানুষকে যন্ত্রণা দেয়, সেই প্রেতাত্মার মতই করল শঙ্করী।
কী করেছিল সত্য তার কাছে যে এইভাবে দাগা দিয়ে গেল সত্যকে?
বাবাকে চিঠি লিখেছিল সত্য, শঙ্করীকে পাওয়ার খবর জানিয়ে, বাবা কি বলেন না বলেন জানতে। সে চিঠির জবাব আসার আগেই নতুন খবর ঘটাল শঙ্করী।
দু দিনও তর সইল না তার?
এ যেন সত্যিই সত্যকে ধরল আর ধারালো অস্তরখানা শানিয়ে তুলে বসিয়ে দিল সত্যর বুকের মাঝখানে!
এই দীর্ঘকাল ধরে শত লাঞ্ছনা আর শত ধিক্কারের ভাত খেয়ে খেয়ে যে প্রাণটাকে পুষে রেখেছিল শঙ্করী, একটা দিন সত্যর কাছে ভালবাসার ভাত খেয়ে হেলায় বিসর্জন দিলে সেই প্রাণটাকে?
এর চাইতে ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুরতা আর কি আছে?
খবরটা শুনেই সত্য মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে সেই কথাই বলেছিল, জানি, জানতাম। চিরকেলে পাষাণ! মেয়েমানুষ এত বড় নিষ্ঠুর, উঃ!
তারপর ডাক ছেড়ে বলে উঠেছিল, ওগো বৌ, কুক্ষণে আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল তোমার, কুক্ষণে আমি বলেছিলাম তোমার মেয়েটার ভার নেব! কেন মরতে বললাম গো! না বললে তো তুমি এমনভাবে দায়মুক্ত হতে পারতে না!
তা কথাটা তো ভুল নয়, সুহাসের দায়েই তো এ যাবৎকাল অত বড় গ্লানির জীবন বয়ে বেড়াচ্ছিল শঙ্করী!
সে দায় থেকে মুক্ত হল বলেই তো
নাকি শুধু সাময়িক উত্তেজনার ফল? মেয়ে যখন মায়ের সঙ্গে কোদল করে বলে বসেছিল, আমি যখন এতই গলার পাথর তোমার, সে পাথর সরিয়ে দিয়ে যাব, তখন কি শঙ্করীর মুখে একটা ক্রুদ্ধ আক্রোশের তীব্র হাসি ফুটে উঠেছিল? ভেবেছিল কি, বটে! চিরকাল আমিই শুধু জব্দ হব তোমার কাছে? পাপের প্রাচিত্তির আর হচ্ছে না আমার? জন্মাবধি জব্দ করে রেখেছ তুমি আমাকে, আবার মরে জব্দ করতে চাও? আচ্ছা দেখ এবার কে কাকে জব্দ করে!
কে জানে কোন কথাটা সত্যি!
ঠাণ্ডা মাথায় ভেবেচিন্তে দীর্ঘকালের পরিকল্পনাকে রূপ দিয়েছিল শঙ্করী, নাকি ক্ষণিক মুহর্তের অসতর্কতায় কূলে এসে ওঠা নৌকোখানাকে ডুবিয়ে বসেছিল?
না, প্রকৃত কথা কেউ জানে না।
আত্মহত্যা করবার আগে যে একটু লিখে রেখে যেতে হয়, আমার মরার জন্যে কেউ দায়ী নয়– সেটুকুও জানত না শঙ্করী। অথবা সে রেওয়াজ তখনও চালু হয়নি।
লিখতে ওরা শেখে নি বলেই হয়তো চালু হয় নি।
চালু হয় নি, তাই রাত পোয়াতেই দত্তদের বাড়ির অন্দরে হৈ-হৈ উঠল। রাতে রান্নাঘরের পাশের ঘরে আড়ায় দড়ি বেঁধে জুলে মরেছে পানসাজুনি বামুনদিদি
ওমা কেন গো!
কী দুঃখে!
এই যে কাল আহ্লাদের সাগরে ভাসছিল, দেশের লোকের সন্ধান খবর পেয়ে, তাঁদের কাছে আদরের ভাত খেয়ে। চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে যাবই তো বলেছিল, বলেছিল, দেশের লোক, চিরকালের চেনা-জানা, ছাড়ছে না, মেয়েটার সুদ্ধ ভার নেবে বলেছে, এ সুযোগ ছাড়তে পারব না মা। অনেক দিন তো দাস্যবিত্তি করলাম।
কালীতলায় নাকি পরিচয় হয়েছিল।
কিন্তু মানুষটা আর কেউ না, দত্তদের সাত নম্বর বাড়ির সেই অহঙ্কারী ভাড়াটে।
তার কাছেই আশ্রয়ের আশ্বাস পেয়েছিল সে।
চলেই যেত।
তবে দিনক্ষণের ছুতো দেখিয়ে বলেছিল, চৈৎ পোষ ভাদ্দর এ তিনটে মাসে পোষা বিড়ালটাকেও বিদেয় দিতে নেই মা, দিলে গেরস্থর অকল্যাণ। এতদিন নেমক খেলাম, অকল্যাণ করব না তোমার। এ মাসটা আর যাব না।
হঠাৎ সবুদ্ধি কি করে বিনষ্ট হল শঙ্করীর? কি করে বিস্মৃত হল সে নিমকের ঋণ!
তাই অদিনে অক্ষণে গেরস্থর অকল্যাণ ঘটিয়ে চিরদিনের মত বিদেয় হয়ে গেল?
.
হৈ-হৈ হল।
তবে নাকি বড়মানুষের অন্দর, আর দীনদুঃখী চাকরানী বিধবার প্রাণ। তাই সে হৈ হৈ ফুটল আর মরল। থানা পুলিস তো দূরের কথা, বৈঠকখানার কর্তারাও সবাই টের পেলেন কি না পেলেন। অন্তত টের পেয়েছেন এ লক্ষণ প্রকাশ পেল না তাদের আচরণে।
গড়গড়ায় একটানা শব্দটার একবার হয়তো একটু ছন্দপতন হল, গলা থেকে একবার হয়তো একটু হুঙ্কার উঠল, তার বেশী নয়।
