নিতাই একটু পরিতৃপ্তির হাসি হেসে বলে, সম্পর্ক আর রাখবি না তা হলে?
ক্ষেপেছিস! উনি তো ‘পতিত’! পতিতের সঙ্গে আবার সম্পর্ক কি?
না, নিতাইকে পতিত বলে ত্যাগ করে নি নবকুমার। প্রতিদিন ওর মেসে ধর্না দিয়ে যায়, আর হাতে পায়ে ধরে বলে, এবং শেষ অবধি ভবতোষ মাস্টারের পরামর্শমত সত্যকে দিয়ে বলিয়ে সুরাহার পথে এনেছে তাকে।
অবিশ্যি সেও হয়ে গেল অনেকদিন। নবকুমারের বড় ছেলে, যার ভাল নাম নাকি সাধনকুমার, সে তখন ফোর্থ ক্লাসে পড়ত, আর এখন সে এনট্রেন্স পাসের পড়া পড়ছে। সত্য বলেছে জলপানি নেওয়া চাই। বলেছে জলপানি নিয়ে পাস করতে না পারলে সত্যর জীবনের সাধনাই মিথ্যে।
গাঁয়ের ছেলেরা পাঁচ মাইল রাস্তা ভেঙে ইস্কুলে পড়ে পড়ে যেটুকু করছে, সত্যর সাধনকুমারও যদি এতখানি সুযোগ সুবিধে পেয়েও সেইটুকু করে, কি হল এই যুদ্ধ আর বলক্ষয়ে?
অবিশ্যি শুধু জলপানি পাওয়াটাই শেষ কথা নয়। মানুষের মত মানুষ হতে হবে সত্যর ছেলেদের। কিন্তু লেখাপড়ায় মুখোজ্জ্বলটা তো তার প্রথম সোপান।
তা ছেলেটা মুখ রাখবে বলে মনে হয়। অন্তত ওর মাস্টার তো তাই বলে, নগদ মাস মাস দশ দশটা টাকা দিয়ে যে মাস্টারকে পুষছে নবকুমার।
কিন্তু নবকুমারের মাস্টার যে এভাবে নবকুমারের মুখ পোড়াবেন, এ কথা কে কবে ভেবেছিল?
স্বস্তি জিনিসটা কি এতই দুর্লভ!
সেই কতদিন তো গেল নিতাইয়ের দুর্মতির গ্লানিতে। কত হাঁটাহাঁটি করতে হয়েছে তার মেসে, কত কাকুতিমিনতি করতে হয়েছে তার কাছে, হেসে উড়িয়েছে নিতাই। জ্বালাভরা তিক্ত হাসি। বলেছে, আমাদের মতন একটা অখদ্যে অবদ্যের জন্যে আবার ভাবনা! রইলাম কি উচ্ছন্ন গেলাম ত্রিভুবনের কার কি এসে গেল তাতে? বেশ আছি। খাচ্ছিদাচ্ছি রঙিন নেশা নিয়ে পড়ে আছি। তোমরা বাবা গুড বয়, দামী মাল, জগতে তোমাদের দরকার আছে, তোমরা ভাল হও গে।
কিন্তু এই এক জায়গায় নবকুমার হালছাড়া হয় নি, দৃঢ় থেকেছে। নিতাইকে সুপথে আনতেই হবে।
শেষ পর্যন্ত ভবতোষ মাস্টারের নির্দেশমত সত্যর কাছেই নিতাইকে টেনে এনে হাজির করেছিল নবকুমার। বলেছিল, নাও এবার মোকাবিলা কর দ্যাওরের সঙ্গে। বোঝাও সংসারে ওর দাম আছে কি নেই?
সত্যর তখন শঙ্করীর ব্যাপারে মনপ্রাণ ভাল নয়, তাই থমথমে মুখে বলেছিল, দাম আছে কি নেই সে কথা আমি বোঝাব?
নবকুমার মাথা চুলকে বলে, ও তো তাই বলছে। মানে, বলছে, ও উচ্ছন্ন গেলে কারুর কিছু এসে যাবে না।
হঠাৎ স্পষ্ট করে চোখ তুলে তাকিয়েছিল সত্য নিতাইয়ের দিকে, বলেছিল, কারুর কিছু এসে যাবে না, সেটা জেনে ফেলেছ? সবজান্তা তুমি?
নিতাই সেই দৃষ্টির সামনে মাথা নীচু করেছিল।
সত্য তীব্রস্বরে বলে উঠেছিল, আমি বলছি, আমার এসে যাবে। মানবে সে কথা?
নবকুমার এই তীব্রতার মানে খুঁজে পায় নি, ঘাবড়ে গিয়েছিল। ওর ধারণা ছিল সত্য কাকুতি মিনতি করবে, দিব্যিদিলেশা দেবে। কিন্তু কই! তেমন তো দেখা গেল না!
ধমকই কি দিল?
মনে হচ্ছে না তা, অথচ কথাটা যে জোরালো তাতে সন্দেহ নেই। আবার তেমনি জোরালো সুরেই বলে সত্য, আমি বলছি তোমায় ভালো হতে হবে, সভ্য-ভব্য ভদ্দরলোক হতে হবে। মানুষ যে বনের জন্তু-জানোয়ার নয় সেটা মনে রাখতে হবে। আপিসে ছুটি নাও দশ দিন, দেশে যাও, বৌ নিয়ে এস। আমি এখানে বাসার ব্যবস্থা করে রাখছি।
বৌ!
বাসা!
নিতাই আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে।
সে অসম্ভব।
অসম্ভব! কেন, অসম্ভবটা কিসে?
বাড়িতে রাজী হবে না।
কে রাজী হবে না? তোমার বৌ? সত্যর স্বর তীব্র।
না, মানে একরকম তাই। নিতাই মলিন স্বরে বলে, মামা-মামী রাজী হবে না, কাজে কাজেই সেও
কাজে কাজেই সেও? এ তো দেখি আচ্ছা স্বার্থপর মেয়ে!
স্বার্থপর!
নিতাই আকাশ থেকে পড়ে।
যেখানে পরার্থপরতার চরম পরাকাষ্ঠা, সেখানে কিনা স্বার্থপরতার অপবাদ!
আপনার কথাটা ঠিক বুঝতে পারলাম না বৌঠান।
সঙ্গে সঙ্গে নবকুমারও বলে, তাই তো! এ কথাটা তোমার আবোল-তাবোল হল বড় বৌ।
বুদ্ধি খরচ করলে বুঝতে আবোল-তাবোল নয়। বলি ওপরওয়ালাদের গোড়ে গোড় যে দেবে বৌ, সে কি ছেদ্দায়, না ভালবাসায়? বোঝাও তুমি আমায়। স্বামীর থেকে বেশী ভালবাসে তাদের? স্বামীর কাছে থেকে স্বামী বেঁধেবেড়ে খাইয়ে যত্ন করে যে পরিতৃপ্তি পাবে, তার থেকে বেশী পরিতৃপ্তি পাচ্ছে তেনাদের যত্ন করে? হক কথা বল?
প্রশ্নটা নিতাইকেই, তবে উত্তর দেয় নবকুমার।
বলে, আহা এটা আবার কথা নাকি? বাসায় আসতে চাইলে লোকনিন্দে নেই? পাঁচজনে মন্দ বলবে না? তোমার মতন–
হ্যাঁ, আমার মতন ডাকাত আর কে আছে! সে যাক, অনেক দিনের পুরনো কথা ওটা। বলি পাঁচজনে আমায় একটু মন্দ বলবে এই ভয়ে স্বামী হেন বস্তুকে ভাসিয়ে দেব, হোটেলের ভাতে ছেড়ে দিয়ে শরীর স্বাস্থ্য ঘোচাব তার, উচ্ছন্নতার পথে যেতে দেব তাকে, এটা স্বার্থপরতা নয়? পাঁচজনের মন্দ বললে কি আমার গায়ে ফোঁসকা পড়বে? কাজটা যে মন্দ নয়, সেটা আমার অন্তরাত্মা বুঝবে না? সে তো আবার বাজা মানুষ। কি নিয়ে আছে শুনি? উদয়াস্ত জগতের যাবতীয় ওঁচা কাজ নিয়ে পড়ে আছে, তার বিনিময়ে লোকে সুখ্যাতি করছে, এই কি একটা মনিয্যির জীবন? আমি তোমায় বলছি ঠাকুরপো, যদি নিজের হিত চাও, বৌকে নিজের কাছে এনে রাখ। বাসা আমি দেখছি।
