নবকুমার সমস্ত বীরত্ব ত্যাগ করে ওই সেই চিরমুখস্থ কথাটা বলে বসে, হল তো! অমনি রাগ হয়ে গেল? রাগের কথা কিছু বলি নি আমি। শুধু বলেছি সুখে থাকতে ভূতের কীল খাওয়া কেন?
সত্যর মুখের কাঠিন্য কিছুটা হ্রাস হয়।
সত্য স্থির স্বরে বলে, আর একদিন তোমার এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলাম, আজ আবার দিচ্ছি, কীল খাওয়া কেন জান? মানুষ জাতটা মানুষ’ বলে। গরু-গাধা পাখী-পক্ষী নয় বলে।
আর ওই যে আবার একটা মেয়ে রয়েছে
রয়েছে সে কথা তো হয়েই গেছে।
সেও মায়ের মত হবে কি না—
যাতে না হয় সেই চেষ্টাই করতে হবে।
সত্য উঠে যায় দৃঢ় সংকল্পের মুখ নিয়ে।
.
সুহাসিনী!
ডাকনাম সুহাস।
হ্যাঁ, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে রূপের ডালিই হচ্ছে। শঙ্করীর বাস্তুহারা কৈশোর মূর্তি যেন ওর মধ্যে এসে পুনর্বাসন করেছে। এত দুঃখ-ধান্ধা, এত লাঞ্ছণা-গঞ্জনা, মায়ের এত কড়া শাসন, তবু কলায় কলায় ভরে উঠেছে দেহ। পনেরো কলা ভর ভর, আর একটা কলা হলেই সম্পূর্ণ।
মেয়ের মুখ দেখে শঙ্করীর বুক ভয়ে ওঠে। মেয়ের রূপ দেখে শঙ্করীর বুক কেঁপে ওঠে। তাই কখনো মেয়েকে কোলে নিয়ে কাঁদে, কখনো মেয়েকে দাঁতে পেষে।
মেয়েকে দাঁতে পেষা তো নয়, নিজেকেই জাঁতার পেষা। কিন্তু করবে কি শঙ্করী, তার যে বেড়া আগুন!
যেদিন সত্য হাত ধরে বসল–সে রাত্রে মেয়েকে যাচ্ছেতাই করল শঙ্করী। বলল, তবে আন খানিক বিষ আন, তুইও খা, আমিও খাই। সকল জ্বালা জুড়োক। সকল সমস্যা মিটুক।
কথাটা এই, মার মারফত সত্যর প্রস্তাব শুনে সুহাস একেবারে বেঁকে বসেছে। ওসব অনাসৃষ্টির মধ্যে যেতে রাজী নয় সে। অনেক হাঁড়ির হালের শেষ, অনেক ঘাটের জল পার করে এতদিনে যদি পায়ের তলায় একটু মাটি মিলেছে, যার তুল্য নেই রাজবাড়িতে আশ্রয় জুটে গেছে, এখন আবার অনিশ্চিতের সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে যাবার কী দরকার?
আপনার লোক!
তিনকুলে কেউ ছিল না, একমুঠো পোড়ামুড়ি নিয়ে কেউ এগিয়ে আসে নি, এখন হঠাৎ ভূঁই ফুড়ে আপনার লোক গজাল! হতে পারে কোন এক সময় দেশের লোক ছিল, কিন্তু তাতে কি চারখানা হাত-পা বেরোচ্ছে? হঠাৎ তার এত দরদ উথলে ওঠবার কারণটাই বা কি? আর কিছুই নয়, বিনি মাইনের দাসী-রাধুনী পেয়ে যাবার আশ্বাস। ভেবেছে দুটো দরদের কথা কয়ে একবার বাড়িতে পুরে ফেলতে পারলে হয়।… শঙ্করী যেমন বোকা তাই বুঝতে পারে না, এর পর একূল ওকূল দুকূল যাবে।
হ্যাঁ, প্রথমটায় এত কথাই বলেছিল সুহাস। এত কথাই বলতে পারে সে। অবিশ্যি আর কারুকে নয়, শুধু মাকেই। মায়ের ওপর দাপটের অবধি নেই। জন্মাবধি যত দুঃখ-কষ্ট অভাব-অসুবিধে পেয়েছে, চিরদিন তার ঝাল ঝেড়েছে মায়ের ওপর।
তবু তো সম্পূর্ণ ইতিহাস জানে না। সত্যি ইতিহাস জানে না। জানে–গর্ভে নিয়ে বিধবা বলে সে সন্তানকে অপয়া বলে দূর দূর করেছিল বাড়ির লোক, তাই শঙ্করী দুঃখে অভিমানে মেয়ে নিয়ে পথে বেরিয়েছিল।
সেইটাই অভিযোগ সুহাসের।
মার অবিমৃষ্যকারিতাতেই যে তাদের এই হাঁড়ির হাল সে বিষয়ে সন্দেহ নাস্তি।
যাক, সে যাহোক হয়ে গেছে।
এখন আবার এ কী!
মায়ে ঝিয়ে তর্ক বাধে।
শঙ্করী যাচ্ছেতাই করে মেয়েকে।
এবং সুহাস সতেজে বলে, ঠিক আছে। আমি যখন এতই পাথর তোমার গলার, সে পাথর সরিয়ে দিয়ে যাব।
৩৬. কথায় আছে মাটি বোবা
কথায় আছে মাটি বোবা।
কিন্তু কলকাতার মাটি বোধ করি কথা কয়। বোধ করি তার মূল বনেদে অনন্তকালেব সহস্ৰস্তরের ঐতিহ্য নেই বলেই প্রকৃতিতে তার উঠতি বয়সের মেয়ের চপলতা আর মুখরতা। সেই মুখরতার ঝাঁপটায় সে মূককে বাচাল করে তুলতে পারে। তাই কলকাতার বাসিন্দারা কিছু। না শিখেও পণ্ডিত, কিছু না বুঝেও বোদ্ধা।
সত্য বলে, এ নাকি শুধু কলকেতার হাওয়ারই নয়, কলের জলেরও গুণ।
তা হতেও পারে।
আদি অনন্তকাল তো লোকে পৃথিবীর গহ্বর থেকেই আঁজলা ভরে নিয়ে তৃষ্ণা নিবারণ করেছে, জীবনযাত্রার প্রয়োজন মিটিয়েছে। যেখানে সে গহ্বর আছে ভাল, যেখানে নেই সেখানে কোদাল চালিয়ে গহ্বর খুঁড়েছে। তার পর তার কাছে এসেছে ঘট নিয়ে কলসী নিয়ে, ভরে নিয়ে গেছে অসময়ের জন্যে। কে কবে মাটির নীচে নল চালিয়ে জলকে হাতের মুঠোয় পৌঁছে দিয়ে তাকে হুকুমের চাকর বানিয়ে ফেলবার কল গড়তে শিখেছিল? শেখে নি!…. কলকাতা শিখে ফেলেছে। জল হেন দুর্লভ বস্তু, কল মোচড় দিয়েই তাকে আদায় করছে। এ কী কম তাজ্জব!
এ জলের বিশেষ গুণ শরীরে বর্তাবে বৈকি। আর কিছু না হোক, কলের জলটা সাহসের যোগানদার।
নইলে আর নবকুমারের সাহস হয় ভবতোষ মাস্টারকে মুখের ওপর বলতে, আমরা আপনাকে ত্যাগ করলাম মাস্টার মশাই। ভবিষ্যতে আপনি আর আমাদের বাড়িতে মাথা গলাতে আসবেন না।
বলেছে সে খবরটা নবকুমার নিজেই গিয়ে পৌঁছে দিল নিতাইকে। বলল, রেখে ঢেকে বললাম, বুঝলি? আচ্ছা করে শুনিয়ে দিলাম। যখন মান্যের ছিলেন তখন মান্য করেছি, এখন উনি যদি মান্যের মর্যাদা নিজে ঘুচিয়ে গালে মুখে চুনকালি লেপেন, মান্য রাখবার দায় আমার নয়। এই বুড়ো বয়সে উনি যদি ধর্ম খোয়াতে পারেন, মানুষের ছেদ্দা-ভক্তি-ভালবাসা সবই খোয়াতে হবে। ছি ছি, কি করে যে এ দুর্মতি হল মাস্টারের, ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছি না। বিদেশবিভুঁই জায়গায় একটা অভিভাবকের মত ছিলেন সেটা ঘুচল।
