ফাঁকি, ফাঁকি, সব ফাঁকি, বুঝলে ঠাকুরঝি, সেই নরকের কীট পাপিষ্ঠ শয়তান ফাঁকি দিয়ে আমাকে–, রুদ্ধকণ্ঠ পরিষ্কার করে বলে শঙ্করী, কী বলব ঠাকুরঝি, ওই ভোগায় না পড়লে কি দুর্মতি হত আমার? বলল, কলকাতায় এখন বিধবা বিয়ের চল হয়েছে। কত অল্পবয়সী বিধবা আবার সুখে-স্বচ্ছন্দে ঘর করছে। সেই ভোগায় ভুলে পাতালের সিঁড়িতে পা ফেললাম।
সত্য বিরসমুখে বলে,তা হলে বিয়ে করে নি?
না, সে মিথ্যে বলব না, করেছি। বিধবা বিয়ে দিতে রাজী হয় এমন পুরুত ডেকে অগ্নি নারায়ণ সাক্ষী করে ঠাট একটা দেখিয়েছিল। কিন্তু সেই বিয়েকে যদি সে মনেপ্রাণে সত্যি বলে মানত, তা হলে কি পেটে সন্তান এসেছে শুনেই আমাকে ছেঁড়া কাপড়ের মতন ফেলে চলে যেত?
তা যাক। সত্য একটা অস্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে, তার চরিত্তিরের উপযুক্ত কাজই সে করেছে। কিন্তু তুমি তো একপ্রকার ধর্মে খাঁটি আছ। আর তোমার মেয়েকেও অধর্মের সন্তান বলে চলে না। বিধবা বিয়ে আমার চোখে অবিশ্যি ভাল ঠেকে না, তবে মন্দের ভাল। বড় বড় পণ্ডিতেরা যখন শান্তর পড়ে বুঝেসুঝে বিধান দিয়ে রেখেছেন, তখন একেবারে তো উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাঁদের চেয়ে আমি পণ্ডিত নই। তবু বলব কাটোয়ার বৌ, মেয়ের এই মিথ্যে বিধবা পরিচয়টা তোমার দেওয়া উচিত হয় নি। তার কাছেও তো একটা জবাব আছে? সে যখন বড় হবে, পাঁচজনের বিয়েথাওয়া গয়নাকাপড় ঘরবর দেখবে, তখন তার প্রাণের ভেতরটি কেমন করবে? তখন তোমায় একদিন শুধাবে না, মা, মা হয়ে তুমি আমার এই করলে–
শঙ্করী কথায় মাঝখানেই উদাস গভীর সুরে বলে, সে জিজ্ঞেসের গোড়াও মেরে রেখেছি ঠাকুরঝি। তাকে ওই কথাই বুঝিয়ে রেখেছি। বলেছি পাঁচ বছর বয়সের ঘটনা, তোর স্মরণে নেই।
বৌ! আবেগ-কম্পিত স্বরে শুধু এই একাক্ষর শব্দটুকু উচ্চারণ করে সত্য।
শঙ্করী সত্যর সেই ক্ষুব্ধ বিস্মিত আহত মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, তা তুমি শতেক ঝাটা মারতে পার ঠাকুরঝি, কিন্তু এ ছাড়া আর কোনও উপায় আমি দেখতে পাই নি। বলতে পার আমি মা নই রাক্ষসী, কিন্তু তবু তো সেই দুর্দিনে গর্ভসুদ্ধ গঙ্গায় ডুবে মরতে পারি নি? আর ওর জন্যেই দোর দোর ঘুরেছি, হাজার লাথি ঝাটা খেয়েছি, মান-অপমান জলাঞ্জলি দিয়েছি, আর আজ সোনারবেনের দাসত্ব করে ভাত খাচ্ছি। কিন্তু বাড়ি ভাল নয়। লোকে বলে অন্নদাতার নিন্দে করতে নেই, তবু না বলে উপায় নেই, সোমত্ত মেয়ে নিয়ে ও বাড়িতে থাকা কাঁটা হয়ে থাকা। শুধু মেয়েটাকে যদি তুমি চুপ করে যায় শঙ্করী।
অনেকক্ষণ নীরবতার পর সত্য আস্তে বলে, নাম কি রেখেছ?
নাম! শঙ্করীর কণ্ঠে যেন অপরাধের সুর বাজে, দু মাস বয়স থেকে হাসিটা লক্ষ্মীছড়ির এত মন-কাড়া ছিল যে নাম রেখে বসেছিলাম সুহাসিনী!
তা অপরাধের সুর আসাই স্বাভাবিক, ওই হতভাগ্য মেয়েটার নাম ‘মলিনা’ কি ‘অশ্রুমতী’ নিদেনপক্ষে ছায়া’ কি ‘দাসী’ এমনি একটা হলেই যেন শোভা পেত।
কিন্তু সত্য সে খোটা দিল না। সত্য বলল, তা মন্দ নয়। সে যাক, বাড়ি যখন অমন বলছ, আর তো থাকা ঠিক নয়। মেয়ে নিয়ে অবিলম্বে চলে এস।
.
হ্যাঁ, বাড়ি ওদের অমনি! নবকুমারের কাছে বসে সত্য চাপা তীব্র স্বরে বলে, ভদ্রঘরের মেয়ের এসব কথা মুখে আনলেও পাপ, তবে অবস্থাটা তোমায় স্পষ্ট করে খুলে না বললেও তো বুঝবে না তুমি। ওই রূপের ডালি মেয়ে নিয়ে কি কাঁটা হয়ে থাকে বৌ বুঝে দেখ। বলে, নীচের তলায় রান্নাবাড়ির কাছে একখানা ছোট ঘর আছে, তাতে নাকি কাঠ-ঘঁটে থাকত, সেই ঘর পরিষ্কার করে মায়ে-ঝিয়ে আছে। কেন? না পাছে কারুর চোখে পড়ে যায়! দিনান্তে একবার নাইতে খেতে ঘর থেকে বেরোতে দেয় মেয়েকে, তাও নিজের কড়া পাহারায়। আইবুড়ো মেয়েটাকে বিধবা পরিচয় দিয়ে রেখে দিয়েছে! ভাব কষ্ট!
নবকুমার কিন্তু বেশী বিচলিত হয় না, বরং নিতান্ত ব্যাজার মুখে বলে, তা সে যার কথা সে বুঝবে, তোমার এত আগ বাড়াবার দরকার কি? শুধু গরীব দুঃখী অবীরে বিধবা ভাজ হত তার মানে ছিল। এসব কি? না না, এসব কেচ্ছাকেলেঙ্কারী আমার বাড়িতে ঢোকানো চলবে না। বাসাতেই এসেছি, তা বলে তো বেওয়ারিশ নই আমি। মা শুনলে আর আমার মুখ দেখবে, না তোমার হাতে জল খাবে?
সত্য স্থিরকণ্ঠে বলে, বলার আমার অনেক কথা ছিল, কিন্তু বলব না সে সব। শুধু বলছি, আমি যদি তাদের মত করাতে পারি?
হ্যাঁ, মত করাতে পার! নবকুমার বলে ওঠে, এ তোমার কাছা-আলগা নবকুমার বাঁড়ুয্যের কিনা, যে তোমার কথায় উঠবে বসবে! সে বড় শক্ত ঘাঁটি!
সত্য ভ্রূভঙ্গী করে বলে, নিজের মুখে নিজের ব্যাখ্যানটা আর নাই করলে। বেশ, ওনাদের মতটা পেলেই তো হল?
তা তোমাকে বিশ্বাস নেই। তুমি যা ডাকাত, হয়তো শ্বশুর-শাশুড়ীর গলায় গামছা মোড়া দিয়ে মত আদায় করবে। কিন্তু এত ঝামেলায় দরকার কি শুনি? আমি বলে দিচ্ছি-আমার সংসারে ওসব চলবে না।
সত্য সহসা ভ্রূভঙ্গী ত্যাগ করে উদাস মুখে বলে, বেশ তাই ভাল। সেই কথাই বলে দেব ভাজকে। বলব, না বৌ, এ সংসারে তোমার ঠাই হবে না, ভুল করে ভেবেছিলাম, সংসারটা বুঝি আমার, তা মস্ত একটা হাতুড়ির ঘায়ে ভুলটা ভেঙেছে। চোখ ফুটে গেছে। ভালই হল, শিক্ষা হয়ে গেল।
নবকুমার বসে পড়ে।
নবকুমার চোখে সর্ষেফুল দেখে।
