বালাই ষাট! তা বলছি না। তিনি তোমায় চিরকাল রাজরাণী, মাথায় মণি করে রাখুন। এই সমাজের কথা বলছি। জানাজানি হয়ে গেলে
জানাজানি হয়ে যাবার আবার কি আছে কাটোয়ারী বৌ! আমি কি লুকোছাপ করব? আমি তো ঠিক করছি আজই বাবাকে পত্তর দেব। বাবা এই কাজ করেছি আমি, এখন আমায় মারতে হয় মার, কাটতে হয় কাট আর রাখতে হয় রাখ!
বাবা শব্দটা শুনেই শঙ্করী সহসা দু হাত জোড় করে কপালে ঠেকায়।
সেই বাবা নামক মানুষটার উদ্দেশে কি ভগবানের উদ্দেশে?
বোধ করি ভগবানের উদ্দেশে।
সাহস করে সেই বাড়ি, মানুষগুলো, সর্বোপরি সেই দৃপ্তমূর্তি দেবোপম ব্যক্তিটি সম্পর্কে কোনও প্রশ্নই করতে সাহস ছিল না শঙ্করীর। ভয়, লজ্জা, অপরাধের সঙ্কোচ, এসব তো আছেই, তার ওপর এক আশঙ্কার আতঙ্ক। যদি প্রশ্ন করতে গিয়ে শোনে, মানুষটা নেই? সে বড় ভয়ঙ্কর!
কিন্তু সত্য বলছে, বাবাকে পত্তর লিখব। তাই কপালে হাত ঠেকিয়েছে শঙ্করী।
আতঙ্কটা যাবার সঙ্গে সঙ্গে ভয় লজ্জা সঙ্কোচ সবই যেন একটু সরে দাঁড়ায়। যেন শঙ্করীর অবস্থা দেখে দয়া হয়েছে ওদের।
তাই শঙ্করী ঈষৎ ইতস্তত করে বলেই ফেলে, মামাঠাকুরের শরীরগতিক মঙ্গল?
শরীরগতিক!
সত্য নিঃশ্বাস ফেলে বলে, খুব ভাল নয়, তবে মানুষটাকে তো জান? ভাঙব তবু মচকাব না। নইলে মা মারা যাওয়ার পর থেকে ভেতরে ভেতরে দেহ ভেঙে গেছে। কলকাতায় আসার আগে দেখা করে এলাম তো।
মা মারা যাওয়া!
শঙ্করী ভাবে, এ ‘মা’ রামকালীরই মা, দীনতারিণী। ভাবে তা তিনি মরবেন এটা তো আশ্চয্যিও নয়, দুঃখের নয়, তার নাকি রামকালী হৃদয়বান পুরুষ, মাতৃশোককে মর্যাদা দিয়েছেন। তবু বলে, তিনি জ্ঞানবান মানুষ হয়ে এত কাতর হয়েছেন? তা বড়দিদিমা মারা গেছেন কতদিন হল?
বড়দিদিমা!
সত্য ভুরু কুঁচকে বলে, ঠাকুরমার কথা শুধোচ্ছ? মারা গেছেন এই ক’বছর যেন হল। আমি আমার মার কথা বলছি। মা তো চলে গেছেন
সত্য চুপ করে যায়।
গলার কম্পন কেউ ধরে ফেলবে, এতে সত্যর বড় লজ্জা।
শঙ্করী স্তম্ভিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, মেজমামীমা মারা গেছেন?
সত্য নীরব
সত্য নতদৃষ্টি।
অনেকক্ষণ পর শঙ্করী একটা পরিতাপের নিঃশ্বাস ফেলে বলে, কতদিন হল?
এই আমার বড় খোকা তখন আঁতুড়ে।
আস্তে আস্তে উদ্বেলিত নিঃশ্বাস শান্ত হয়ে যায়। ক্রমশ ধীরে ধীরে কখন যে নিঃশ্বাস ফেলার ধাপ থেকে গল্প করার অবস্থায় এসে পৌঁছে গেছে ওরা, তা ওদের নিজেদেরই খেয়াল থাকে না।
অতীত স্মৃতির রোমন্থনে সময়ের জ্ঞান হারায় বুঝি।
শঙ্করী প্রশ্নকত্রী।
সত্য উত্তরদাত্রী।
শঙ্করী যেন গভীর সমুদ্রে হাতড়ে হাতড়ে কী এক হারানো মানিক খুঁজতে চাইছে, আর সত্য যেন শঙ্করীর সেই প্রশ্নের হাতড়ানির মধ্যে দিয়ে ফিরে পাচ্ছে তার হারানো শৈশবকে।
নিত্যানন্দপুরের রামকালী কবরেজের অন্তঃপুরটা না একদা সশস্ত্র-প্রহরী-বেষ্টিত অন্ধকার কারাগারের মত লাগত শঙ্করীর?
তবে আজ সেই অন্তঃপুরটা আলোকোজ্জ্বল স্বর্গের মতো মনে হচ্ছে কেন তার?
সেই স্বৰ্গকে স্বেচ্ছায় হারিয়েছে শঙ্করী! ভাঙা মাটির বাসনের মত হেলায় পথের ধুলোয় আছড়ে ফেলে শয়তানের ছলনায় স্বর্গে!
অনেক কথা অনেক নিঃশ্বাস।
ভারী হয়ে উঠেছে বাতাস।
তবু আবার একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বলে সত্য, আজ তুমি ওই দত্তবাড়ির পানসাজুনিগিরি করছ কাটোয়ার বৌ, কিন্তু এর থেকে হাজার গুণ মর্যাদা ছিল যদি তুমি কবরেজবাড়ির উঠোনটা ঝেটিয়েও খেতে।
মতিচ্ছন্ন! পূর্বজন্মের মহাপাতক! আর কিছু বলার নেই আমার।
যাই হোক, তুমি আর দ্বিধা করো না বৌ, মেয়ে নিয়ে একবস্ত্রে চলে এস। পেটের ভেতরের অন্তন্ন তো আর এক কথায় ধুয়ে মুছে সাফ হবে না, তবে পরনের ওই সব পতিত বস্ত্র পরিত্যাগ দিতে হবে। ও ত্যাগ না দিলে গলদ আর দূর হতে চাইবে না। সে যাক, মেয়ে কত বড়টা হল?
কত বড়? মানে বয়সের কথা বলছ? শঙ্করীর চোখের ছায়ায় যেন একটু ধূসর শূন্যতা। সে শূন্যতার স্পর্শ তার কণ্ঠে এসে লাগে।
বয়েস? তোমার কাছে আর লুকোছাপা করব না ঠাকুরঝি, পষ্টই বলছি–বয়েস চৌদ্দ উতরে গেছে এই মাঘে।
মাঘে! তাহলে পনেরোই! পনেরো চলছে! সত্য বিমূঢ় ভাবে বলে, বিয়ে?
বিয়ে! শঙ্করী ক্ষুব্ধ ব্যাঙ্গমিশ্রিত একটু হাসে। এ ব্যঙ্গ ভাগ্যকে। এ ক্ষোভ সত্যর প্রশ্নতে।
সত্য একটু চুপ করে থেকে বলে, তা যাদের সংসারে আছ, তারা কিছু বলে না? তাদের কি জবাব দাও?
শঙ্করী তেমন একটু হেসে বলে, সে জবাব আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলাম। বলেছি পাঁচ বছরের বিয়ে, সাত বছরে বিধবা, শ্বশুরবাড়ি চক্ষে দেখে নি
সত্য ইতিমধ্যে শিউরে উঠেছে।
বল কি বৌ, কি সব্বনেশে মা তুমি! আইবুড়ো মেয়েটাকে বিধবা বলে পরিচয় দিয়েছ? সমগ্র পৃথিবীতে এমন কথা কেউ কখনো শুনেছে? বলি এই কাণ্ডটা যে করে রেখেছ, আজন্ম তো তাকে আলোচাল কাঁচকলা গিলতে হচ্ছে?
তা হচ্ছে বৈকি। আমার যা তারও তাই। তার বেশী জুটছেই বা কোথা থেকে ঠাকুরঝি?
সত্য পরিতৃপ্ত সুরে বলে, তা যেন হল। কিন্তু এর পর ওর বিয়ে দেবে কি করে?
শঙ্করী নিঃশ্বাস ফেলে বলে, সে পরিচয় না দিলেই কি বিয়ে দিতে পারতাম ঠাকুরঝি? বাপ ঠাকুন্দার পরিচয়হীন মেয়েকে কে বৌ বলে ঘরে তুলবে?
সত্য ভুরু কুঁচকে বসে থাকে কিছুক্ষণ, তার পর বলে, তা সেই নগেন না কে, যার সঙ্গে বিয়ে তোমার হয়েছিল বললে–
