অগত্যাই তখন সত্যর চিকিৎসাধীন হতে হয় সত্যর বীরপুরুষ স্বামীকে। জল-বাতাস, মাথায় ফু। ধাতস্থ হতে সময় লাগে।
আর ধাতস্থ হওয়া মাত্রই সত্য নিম্নস্বরে বলে, সংসারে আর দুজন মানুষ বাড়ল, একটু জানিয়ে রাখছি তোমায়। নইলে যেমন মতিবুদ্ধি তোমার, হঠাৎ হৈ-চৈ লাগাবে- কে এরা, কোথা থেকে এল?
নবকুমার বলতে পারত, তা সে কথা তো জিজ্ঞেস করবই আমি। সত্যিই তো–কে এরা, কোথা থেকে এল? কেন এল? আর আমিই বা খামোকা দুটো মানুষকে সংসারে জায়গা দিতে যাব কিসের জন্যে?
বলতে পারল না।
সেই বিষম-খাওয়া ধরা-গলায় যা বলল সেটা হচ্ছে এই, তা আমাকে জানাবার কি আছে? তুমি যা ভালো বুঝবে
কার গলা?
নবকুমারের?
নবকুমার এ কথা বলল কেন?
এতক্ষণ ধরে এই কথাটা বলবার জন্যেই কি “মহলা” দিচ্ছিল নবকুমার মনে মনে?
.
সেই সেদিন পঞ্চুর মার সঙ্গে একবারের জন্যে দেখা করে গিয়ে পর্যন্ত দত্তবাড়ির “পানসাজুনি”র প্রাণটা যে কেন দেয়ালে মাথা কুটতে চাইছিল তা ভগবানই জানেন। আর তার সাক্ষীও শুধু তিনিই।
তাই আবার যখন এদিন সে দিনদুপুরে পঞ্চুর মাকে ধরে বসল, চুপি চুপি আর একবার আমায় নিয়ে যাবি? তখন পঞ্চুর মা হাঁ হয়ে গেল।
বলল, হ্যাঁগা, সেদিন তো কথাই কইলে না! আবার আজ যাবে বলছ মানে?
কি জানি পঞ্চুর মা, মনটা কেমন টানছে। আমার একটা ছোট বোন ছিল, অনেকটা তেমনি দেখতে।
পঞ্চুর মা বোধ করি একটা তবু মানে পেয়ে আশ্বস্ত হয়। তবে এ প্রশ্ন তোলে–দিন-দুপুরে চুপি-চুপিটা সম্ভব কি করে?
সে বুদ্ধি পানসাজুনিই দিয়েছে। কালীতলায় যাবার নাম করে বেরিয়ে পড়া। ঠনঠনের মা কালী জাগ্রত কালী, তাঁর কাছে সময়-অসময় যায়ও সবাই। দূরও বেশী নয়, এই তো একটু গেলেই।
দেবীদর্শনেই এসেছিল পানসাজুনি বামুনদিদি। আর সে দর্শন তার মিলেছিল।
তারপর তো সেই নবকুমারের প্রবেশ।
শঙ্করী বলে, ঠাকুরঝি বলে ডাকবার মুখ নেই, তবু বলতে বড় সাধ যাচ্ছে তাই বলছি, মিথ্যে ছেলেমানুষি করো না সত্য ঠাকুরঝি, তুমি যা বলছ তা হবার নয়।
হবার নয়?
সত্য জোরালো গলায় বলে, কিন্তু কেন হবার নয়, সেই কথাটাই আমায় বোঝাও কাটোয়ার বৌ! ভুল-ভ্রান্তি মানুষেই করে, তা বলে কস্মিনকালে আর সে ভুল শোধরাতে পাবে না সে?
শোধরাব বললেই হল? সমাজ সে আবদার শুনবে? শঙ্করী নিঃশ্বাস ফেলে বলে, মেয়েমানুষ যে মাটির পাত্তর ঠাকুরঝি, ও তো ছুঁৎ লেগেই গেল!
মেয়েমানুষ যে মাটির পাত্তর, এ কথা বুঝি বিধাতাপুরুষ তার গায়ে দেগে দিয়ে ধরাভূমিতে পাঠিয়েছিল? সত্য তীক্ষ্ণ স্বরে বলে, আর বেটাছেলেকে সোনার বাসন বলে ছাপ মেরে পাঠিয়েছিল? তাই তাদের বেলা যা করুক তাই বাহবা! হ্যাঁ, অন্যায়ই তুমি করেছিলে সত্যি, খুব করেছিলে। তুমি বয়সে বড়, গুরুজন সম্পর্ক, বলাটা আমার শোভা পায় না, তবু না বলেও পারছি না, যা করেছিলে তা মহাপাতক। তখন জ্ঞান-বুদ্ধি ছিল না, পুরো বুঝতে পারি নি, কিসের জন্যে কি! কিন্তু পরে তো বুঝেছি। বুঝে মিথ্যে বলব না, মনে মনে তোমায় নোড়া দিয়ে ছেঁচেছি আমি। শুধু মহাপাতক বলেই নয়, বাবার মতন মান্যিমান মানুষের উঁচু মাথাটা যে তুমি হেঁট করে দিয়েছিলে, সেই ঘেন্নার জ্বালায় তোমায় শতেক ধিক দিয়েছি। তবে এও তো সত্যি, অতি পাতকেরও প্রাচিত্তির আছে। যেমন মহাপাতক করেছ তুমি, তার মহা প্রাচিত্তিরই করেছ। তুষানলে জ্বলে জ্বলে খাক হয়েছ।
সত্য ঠাকুরঝি!
শঙ্করী আবেগ-কম্পিত স্বরে বলে, মান্যে ছোটর কথা বলি না, তবে তুমি আমার চেয়ে বয়সে আদ্দেক, তাই পায়ের ধুলো নিলাম না তোমার। কিন্তু জিজ্ঞেস করি, রাতদিন যে আমি তুষানলে জ্বলছি, এ তুমি কেমন করে টের পেলে?
শোন কথা! এর আবার টের পাবার কি আছে? প্রেত্যক্ষ দেখতে পাচ্ছি না? দিষ্টিহীন তো নই? তুষানলে যে জ্বলছ, সে সাক্ষী দিচ্ছে তোমার ওই পোড়াকাঠ দেহ। কি সোনার বর্ণ রং ছিল, কী মোমে গড়া দেহ ছিল তোমার, সেটা তো আর ভুলি নি! তা যাক, রূপ গেছে বালাই গেছে, থাকলে আর কী ধুয়ে জল খেতে? ওই রূপই কাল হয়ে দংশন করেছে তোমায়। গেছে যাক, কিন্তু শরীর স্বাস্থ্যটা তো দেখতে হবে? গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে এহকালের বালাইটা ঘোচাও নি যখন?
শঙ্করী কাতর কণ্ঠে বলে, সেই ইচ্ছে কি আর হয় নি ঠাকুরঝি? রাতদিন সে ইচ্ছে হয়েছে, কিন্তু পারি নি। ওই পেটের জঞ্জালটাই পায়ের বেড়ি হয়েছে। আমিই মহাপাতকী, ওর আর অপরাধ কী! ত্রিজগতে কেউ নেই ওর, মরে ওকে কোথায় ভাসিয়ে দিয়ে যাবো?
সত্য ঝঙ্কার দিয়ে বলে, যাক সে সুমুতিটুকু যে হয়েছিল তাও মঙ্গল। একে তো এই পাতকের বোঝা, তার উপর আবার আত্মঘাতী মরণের পাপ! নরকেও ঠাই হত না। যাক গে মরুক গে, গতস্য শোচনা নাস্তি। এখন সোজা কথা হচ্ছে–এতাবৎ যা করেছ, এখন আমার চোখে যখন ধরা পড়েছ, আর তোমার শুদ্দুরের দাস্যবিত্তি করা চলবে না!
শঙ্করী বিষণ্ণ হাসি হেসে বলে, বয়েস হয়েছে, ছেলেপুলের মা হয়েছ, তবু স্বভাবটি তোমার দেখছি ঠিক তেমনি ডাকাবুকো আছে সত্য-ঠাকুরঝি। কিন্তু জগৎকে চিনতেও বাকি আছে। আমায় ঘরে ঠাই দিলে তোমাকে কি আর কেউ ঘরে ঠাঁই দেবে?
হঠাৎ সত্যর মুখটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। একটু মুখ টিপে হাসে সে। তার পর বলে, কে ঘরে ঠাই দেবে না? তোমার ননদাই?
