নিতাইয়ের এই অধঃপতনের খবরটা এবং ভবতোষ মাস্টারের ওই অনাসৃষ্টি প্রস্তাবটা কিভাবে সত্যর কাছে ফেলবে, আর সত্য সেটা কিভাবে নেবে ভাবতে ভাবতে বাড়ি ফেরে।
বেলাও হয়ে গেছে ঢের। সত্য হাঁড়ি নিয়ে বসে আছে। দ্রুত এসে দরজাটায় ধাক্কা দিতে যায় নবকুমার, কিন্তু ধাক্কার আগেই হাত ঠেকাতেই খুলে যায় সেটা। তার মানে আগল দেওয়া ছিল না।
কী কাণ্ড! ভরদুপুরে দোরটা খুলে রেখেছে! বলবে বলে ব্যস্ত হয়ে ঢুকেই দু-পা পিছিয়ে আসে।
দাওয়ার খুঁটির কাছে সত্য একজনের হাত ধরে দাঁড়িয়ে।
৩৫. হাত ধরার অপরাধে জাত যাবে না
না, হাত ধরার অপরাধে জাত যাবে না, পুরুষ নয় মেয়েমানুষ। বিহ্বল দৃষ্টি এক বিধবা! শীর্ণ দেহ পোড়া রং। নবকুমারও বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে শুনতে পায়, সত্য তার নিজস্ব সবল ভঙ্গীতে বলছে, হাতে যখন পেয়েছি, আর ছাড়ি? মেয়ে নিয়ে চলে এস তুমি আমার কাছে। আমার যদি দুবেলা দুমুঠো জোটে, তোমারও একবেলা একমুঠো জুটবে। আমার ছেলে দুটো যদি খেতে পরতে পায়, তোমার মেয়েটাও পাবে।
শুনে গায়ের রক্ত হিম হয়ে যায় নবকুমারের। এসব আবার কি কথা?
কে এ? কোথায় এর মেয়ে? সত্যর সঙ্গে কী সম্পর্ক এর? আবার হঠাৎ সেই হিম হয়ে যাওয়া রক্ত উত্তপ্ত হয়ে উঠল। পুরুষের রক্ত!
নবকুমারের সঙ্গে একবার পরামর্শ পর্যন্ত না করে দু-দুটো মানুষকে খেতে পরতে দেবার ভরসা দিয়ে বাড়িতে জায়গা দিতে চাইতে সত্য! এতই বা সাহস কেন মেয়েমানুষের? নবকুমার কিছু বলে না বলে বড় বাড় বেড়ে গেছে!
নবকুমারের চিরদিনের প্রাণের বন্ধু নিতাই, বিনি অপরাধে তাকে বাড়ি থেকে সরিয়ে দেওয়া হল। যার জন্যে মনের দুঃখে, ঘেন্নায়, অভিমানে স্বভাবটাই খারাপ করে ফেলল ছেলেটা। নবকুমারের সঙ্গে এক বাড়িতে থাকলে কখনই এসব ঘটত না। মেসে কত রকম কুসঙ্গ।
নবকুমারের চোখে জল এসে গেল। তার পর ভাবল, এখন কিনা কে কোথাকার একটা মাগী, নবকুমার যাকে সাতজনও চোখে দেখে নি, তাকে বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করবার ষড়যন্ত্র আঁটা হচ্ছে।
চালাকি!
চলবে না, এসব চলবে না। নবকুমার সাফ জবাব দিয়ে দেবে–নবকুমারের বাড়িতে এসব চালাকি চলবে না।
নির্ঘাৎ সত্যর বাপের বাড়ির দেশের লোক। তাই এত ভালবাসা! সত্যি বলতে কি একটা ঈর্ষাও অনুভব করে নবকুমার। নবকুমারের সম্পূর্ণ অপরিচিত জগতের কাউকে যে সত্য মনে জায়গা দেবে এ অসহ্য। হোক না সে মেয়েমানুষ, তবুও!
মনের কথা যে মন ছাড়া আর কেউ জানতে পারে না, এ বাঁচোয়াতেই পৃথিবী টিকে আছে। নইলে পৃথিবী তার সমাজ সভ্যতা শিক্ষা সংস্কৃতি সব কিছুর বড়াই নিয়ে কোন কালে রসাতলের অতল তলায় তলিয়ে যেত।
মনের কথা অন্যে টের পায় না।
নিতান্ত মনের মানুষটাও না।
এই আনন্দের যথেচ্ছ নেচে বেড়াচ্ছে মানুষ, যত পারে বড় বড় কথা বলছে। আর স্নেহ প্রেম ভালবাসার মহিমা দেখাচ্ছে। তা এ রহস্যটা মানুষ নিজেও খেয়াল করে না, এই যা মজা।
নবকুমারও খেয়াল করে না, বিধাতার কাছে এ কত বড় পাওয়া পেয়ে বসে আছে সে। মনে মনে তাই শুধু সত্যকেই বাক্যবাণে বিদ্ধ করে না, বিধাতাপুরুষকেও করে। করে বিধাতা নবকুমারকে পুরুষ আর সত্যকে মেয়ে করেছেন বলে। সহ্য হচ্ছে না। এই হাত ধরা দৃশ্য আর সহ্য হচ্ছে না।
গলা ঝাড়ার শব্দ করল নবকুমার।
এতক্ষণ সত্য নিজের ঝোঁকে ছিল, খেয়াল করে নি আর, আর একজন তো দরজার দিকে পিঠ করে দাঁড়িয়ে। গলার শব্দে উভয়েই সচকিত হল। বিধবাটি একটু সরে গেল।
আর সত্য ধরা হাতটা ছেড়ে দিয়ে হাত তুলে মাথার কাপড়টা টানল।
বুদ্ধিমতী সত্য অবশ্য তক্ষুনি হৈ-হৈ করে আবির্ভূত মহিলার পরিচয় দিতে এল না স্বামীর কাছে। তা ছাড়া লজ্জা-শরম বলেও কথা আছে। গুরুজনদের সামনে বরের সঙ্গে কথা বলা চলে না। তাই মাথার কাপড়টা টেনে গলা নামিয়ে আস্তে বলল, চল বৌ, ও ঘরে গিয়ে বসবে চল।
নবকুমার ভেবেছিল যা বলবে গলা চড়িয়ে বলবে, যাতে ওই মেয়েমানুষটার কানে পৌঁছয়। যাতে সে বুঝতে পারে বাড়ির প্রকৃত কর্তা কে। আর এও বুঝতে পারে বৃথা আশায় প্রলুব্ধ হয়ে কোনও লাভ নেই তার। সত্য ছেলেমানুষ, না বুঝেসুঝে কি না কি বলেছে, সেটা ধোপে টিকল না। এ সবই আশা করছিল নবকুমার।
কিন্তু গলা চড়ল না।
শুধু চড়ল না নয়, প্রায় বাকস্ফূর্তিই হল না। একটা গমগমে রাগ-রাগ ভাব নিয়ে চান করে এসে খেতে বসল।
ভাতের থালা ধরে দিতে দিতে সত্য প্রশ্ন করে, এত বেলা অবধি গিয়েছিলে কোথায়?
নবকুমার পাতের উপর হুস করে সমস্ত ডালটা একসঙ্গে ঢেলে ফেলে ভাত মাখতে মাখতে গম্ভীর গলায় বলল, যেখানেই যাই না, তোমার কাছে তার কৈফিয়ৎ দিতে হবে নাকি?
শোন কথা! কী কথার কী উত্তুর! কৈফিয়ৎ দিতে হবে, এ কথা কে বলেছে? নাইতে খেতে বেলা গড়িয়ে গেল, তাই শুধাচ্ছি।
না, শুধোতে হবে না। তেমনি গলাতে চালিয়ে যায় নবকুমার, শুধোবার কোনও এক্তিয়ার নেই তোমার। কি জন্যে শুধোবে? তুমি আমায় মেনে চল? তাই আমি তোমায় মেনে চলব?
সত্য অবাক হয়ে বলে, রোদের তাতে হঠাৎ মাথাটা গরম হয়ে গেল নাকি? কী বলছ আবোল-তাবোল?
আবোল-তাবোল! আবোল-তাবোল বকছি আমি? আর নিজে যখন বলা নেই কওয়া নেই—
গলা চড়াবার ব্যর্থ চেষ্টায় বিষম খায় নবকুমার।
