ছুটির সকালটা দু-দণ্ড রান্নাঘরের দোরে বসে গল্প করেতে কত ভাল লাগে। মনমেজাজ ভাল থাকলে সত্য অপূর্ব! সত্যি বলতে–মনমেজাজ ভাল না থাকলেও কী যে এক আকর্ষণ! নবকুমারকে যেন দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখে। নেহাৎ অফিসের সময়টুকু ছাড়া বাড়ি থেকে বেরোতেই ইচ্ছে করে না! তুড়ু-খোকার পড়াটড়াগুলো একটু দেখতে হয়, কারণ মাস্টারমশাই আজকাল নিয়মিত আসেন না। কিন্তু ওই ছাই কর্তব্য কর্মটর্ম তেমন ভাল লাগে না, এক যা বাজার করাটা একটু ভাল লাগে। বাদে ইচ্ছে হয় দুজন মুখোমুখি বসে থাকি। তা হবার জো নেই। সত্যি, সংসার করাটা এত ভারী করে তোলার দরকারটাই বা কি? হাসলাম গল্প করলাম, খেলাম ঘুমোলাম চুকে গেল তা নয়–রাতদিন দশের একজন হবার সাধ কর, ছেলেদের মানুষের মতন মানুষ করে তোলবার চেষ্টা কর, মান মর্যাদা রইল কি গেল তাই ভেবে মাথা খারাপ কর, কেন রে বাবা? গা-দুই ছেড়ে বাসায় এসে তা হলে লাভটা কি হল? আমোদ-আহ্লাদে থাকা যাবে বলেই না আসা?
এই যে সেদিন শুনল আপিসের বন্ধু রামরতনবাবু তার পরিবারকে নিয়ে নাকি থিয়েটার দেখতে গেছল, “নিমাই সন্ন্যাস” পালা, রামরতনের পরিবার নাকি দেখতে দেখতে কেঁদে বুক ভাসিয়েছে, বাড়ি এসে তিনদিন ধরে কেঁদে মরেছে। নবকুমার সত্যকে ধরে পড়েছিল যাবার জন্য, গেল না!
বলল কিনা, এখন মাসের শেষ–হাতের টানাটানি। থিয়েটারে যেতে তো পয়সা লাগবে। তা ছাড়া তুড়ু-খোকাকে নিয়ে সমিস্যে। ওদের দেখবে কে রাত অবধি?
ওদের নিয়ে যাবার কথা তো উড়িয়েই দিল। ছেলেদের ঘোড়দৌড়ের খেলা দেখাতে নিয়ে যেতে চেয়েছিল নবকুমার, তাও বারণ।
কেন যে সত্য এ রকম!
এক যুগ ধরে মনকে এই প্রশ্নই করে চলেছে নবকুমার।
আজ কপালটাই অভাগ্যির।
নিতাইয়ের সঙ্গে দেখা হল না। কোথায় গেছে। তার মেসের এক ভদ্রলোক বললেন, জানি না মশাই, মানুষের সঙ্গে তো মিশতেই চান না নিতাইবাবু। ভাবগতিও তেমন ভাল ঠেকে না আমাদের। চোখে না দেখলে কারুর নামে অপবাদ দিতে নেই, ওঁর পাশের সীটের হারাণবাবু যা বলেছেন তাই বলছি-স্বভাবচরিত্র ভাল নেই নিতাইবাবুর।
অ্যাঁ! কী বললেন!
প্রায় মাটিতেই বসে পড়ে নবকুমার।
এ কী সর্বনেশে সংবাদ!
ভদ্রলোক বললেন, আপনার বিশেষ বন্ধু বুঝি? তবে তো আপনাকে কথাটা বলা আমার ভুল হয়েছে। তবে একরকম ভালও। দেখুন আপনি যদি বুঝিয়ে-সুঝিয়ে সুপথে আনতে পারেন। অবিশ্যি ও পথ থেকে ফেরানো বড় শক্ত কথা।
.
মনের মধ্যে একটা দারুণ যন্ত্রণা নিয়ে ভবতোষ মাস্টারের কাছে যায় নবকুমার। বোধ করি এই প্রথম সে সত্যর নির্দেশ ব্যতীতই একটা কাজ করে ফেলে।
মাস্টার একখানা বই সামনে রেখে উপুড় হয়ে পড়ে তা থেকে খাতায় কি সব লিখে নিচ্ছিলেন, নবকুমার কাছের গোড়ায় বসে পড়ে বিনা ভূমিকায় বলে ফেলে, ভয়ানক একটা বিপদে পড়ে আপনার কাছে এসেছি মাস্টার মশাই!
মাস্টার চমকে ওঠেন।
কী হল? কারুর অসুখবিসুখ নয় তো? সত্যবতী ফেন গালতে পুড়ে যায় নি তো? উঠোনে আছাড় খেয়ে পড়ে যায় নি তো? চকিত হয়ে বলেন, বসে বসো, আগে একটু স্থির হও। ব্যাপারটা কি?
ব্যাপারটা গুরুতর। নিতাইয়ের চরিত্রদোষ ঘটেছে!
কী ঘটেছে নিতাইয়ের?
ঝোঁকের মাথায় কথাটা বলে ফেলেই লজ্জা পায় নবকুমার। এবার মাথাটা চুলকে নীচু গলায় বলে, আজ্ঞে আজ গিয়েছিলাম নিতাইয়ের মেসে, তা দেখা হল না। একজন বলল, নিতাই কোথায় যায় কোথায় না যায় ঠিক নেই, আর–আর তার স্বভাবদোষ ঘটেছে।
ভবতোষ মিনিটখানেক চুপ করে থেকে বলেন, লোকটা নিতাইয়ের শত্রুটত্রু নয় তো?
আজ্ঞে না না। সেরকম কিছু না।
তবে তো সত্যিই বিপদ! ভবতোষ নিজের মনে বিড়বিড় করে বলেন, এই রকম একটা ভয়ই আমার ছিল।
নবকুমার বলে, আজ্ঞে কী বলছেন?
নাঃ, তোমায় কিছু বলি নি।
আপনি একবার তার সঙ্গে দেখা করে বোঝান মাস্টার মশাই।
বোঝাব? ভবতোষ হাসে।
এসব ক্ষেত্রে মাস্টারের বুঝ কোনো কাজে লাগে না নব!
কিন্তু একটা তো কিছু করতে হবে মাস্টারমশাই।
চিরনিস্তেজ নবকুমারের এই ব্যাকুলতা মনকে স্পর্শ করে ভবতোষের। তিনি স্নেহার্দ্র গলায় বলেন, আচ্ছা আমি চেষ্টা করব। তবে কি জান
আজ্ঞে কি বলছেন?
বলছি–মানে বলছিলাম কি, আমার বলার চাইতে অনেক বেশী কাজ হবে যদি বৌমা একবার
বৌমা!
নবকুমার বিমূঢ় নির্বোধ গলায় বলে, কার কথা বলছেন, ইয়ে তুড়ুর মা?
হ্যাঁ, তাই বলছি। উনি যদি একবার নিতাইকে দিব্যি-দিলেশা দিয়ে বলতে পারেন, হয়তো কাজ হতে পারে।
নবকুমার তেমন গলাতেই বলে, আপনি বললে কাজ হবে না, হবে ওর কথায়?
ভবতোষের মুখে রহস্যের জালে আবৃত সূক্ষ্ম একটু হাসির রেখা ফুটে ওঠে। ধীরে বলেন, হলে ওঁর কথাতেই হবে। নচেৎ
তবে তাই বলতে বলব। বলে বিমূঢ় নবকুমার উঠে দাঁড়ায়। তবে মাস্টারের প্রস্তাবটা তার হৃদয়ঙ্গম হয় না। আর সত্যি বলতে কি, ভালও খুব লাগে না। ভাল লাগে না নিতাইয়ের সামনে সত্যকে উপস্থাপিত করার কথাটা। যতই বন্ধু হোক নিতাই, তার যখন স্বভাব খারাপ হয়েছে তখন বিশ্বাস কি? কে জানে মদ-টদও ধরেছে কিনা। মাতাল চরিত্রহীন, এদের কাছ থেকে মেয়েছেলেদের শতহস্ত দূরে থাকা উচিত।
নবকুমারের বাপ নীলাম্বর বাড়ূয্যে নামক ব্যক্তিটিও যে ওইসব অপরাধে অপরাধী এবং চিরদিন তিনি সমাজের মাথার ওপর বাস করে আসছেন, সেটা অবশ্য মনে পড়ে না নবকুমারের।
