ছোটগিন্নী অবশ্য বেইমান।
আড়ালে আবডালে বলে বেড়ায়, আমার বুঝি ভাগ নেই দত্তদের বিষয়-সম্পত্তিতে? বানের জলে ভেসে এসেছি বুঝি আমি? কাঠ হাত করে ঢুকি নি আমি এদের উঠোনে। গাঁটছড়া বেঁধে সঙ্গে করে নিয়ে আসে নি এদেরই একজন? তাকে উষ্ণুনিও দেয় কেউ কেউ।
কিন্তু সে নেহাতই আড়ালে। বড়গিন্নীর সামনে সবাই ঠাণ্ডা।
কিন্তু সে যাক।
পথ চলতে চলতে বামুনমেয়ের সঙ্গে নিম্নোক্ত কথাবার্তা হয় পঞ্চুর মার, যতই হোক তুমি হলে স্বজাতি, তোমায় সমেহা দেখাবে।
স্বজাতি অবশ্য সত্যবতীর। কারণ সেও বামুন।
বামুনমেয়ে কিন্তু এ আশ্বাসে উল্লসিত হয় না। উদাসভাবে বলে, সোনারবেনের অন্ন খাওয়া বামুন আবার বামুন! তুইও যেমন পঞ্চার মা। তোরা ‘বামুনদি বামুনদি’ করিস তাই, নিজেকে বামুনের মেয়ে বলে পরিচয় দিতে আমার ইচ্ছে করে না। নেহাৎ নাকি কাজ করতে এসে শুদ্র বললে পাছে পা টিপতে, ছাড়া কাপড় কাঁচতে, এটো বাসন মাজতে বলে, তাই ওই পরিচয় দেওয়া।
তা কেন বামুনদি, তোমার আচার-আচরণ তো সদ্ বাম্মনের মতনই। নইলে রাঁধুনী কুটনোকুটনী ভাড়ারদিনি আরও যে-সব বামনী ধনী আছেন, তাদের আচার-কেতা তো আর পঞ্চুর মার অবিদিত নেই! ঘেঁচার মা তো সেদিন লুকিয়ে গরম মাছভাজা খেতে গিয়ে জিভে কাটা ফুটিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়ল, তাই কি মাগীর হায়া আছে? আসল কথা কি জান বামুনদি, স্বভাব-চরিত্তিটি যতক্ষণ ভাল আছে, ত্যাতোক্ষণ কক্ষনো সে আচারবিচার ছাড়বে না। আচার-অনাচার ত্যাগ করলেই বুঝবে মতিগতি বিগড়েছে। ধম্মকম্ম আচার-আচরণ হচ্ছে নদীর বাঁধ, যদি একবার ভাঙ্গে–
বাসনমাজা ঝি পঞ্চুর মার এই জীবনদর্শনের ব্যাখ্যার শেষাংশটা আপাতত মুলতুবী থাকে। সত্যবতীর দরজায় এসে পড়েছে দুজনেই। পঞ্চুর মা শানানো গলায় ডাক পাড়ে, কই গো বৌদিদি কোথায়? একবার বেরিয়ে এসো গো। নতুন মানুষ এয়েছে তোমায় দশ্যন করতে।
৩৪. নিতাইয়ের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ নেই
অনেকদিন নিতাইয়ের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ নেই, ছাতাটা হাতে নিয়ে রোদের মধ্যে বেরিয়ে পড়ে নবকুমার। আজ ছুটির দিনে বাসায় আছে নিশ্চয়। নিতাই চলে যাবার পর প্রথম প্রথম নিতাইয়ের সামনে মুখ তুলে দাঁড়াতে লজ্জা করত, নিজেকে ভারী অপরাধী মনে হত, কিন্তু সময়ে সবই সয়। সেই লজ্জা একটু একটু করে কমেছে। সত্যবতীই বার বার ঠেলে পাঠিয়েছে নেমন্তন্ন করতে। আর অবাক কাণ্ড, দিব্যি সহজভাবে নিতাইয়ের সঙ্গে কথা কয়েছে সত্য, নিতাই যা যা ভালবাসে, মনে করে করে বেঁধেছে, অনুরোধ উপরোধ করে খাইয়েছে।
এই সব অসমসাহসিক কাণ্ডগুলো কী করেই যে করে সত্য! যাক, আজ নবকুমার নিজেই যাচ্ছে। আজ বাড়িতে মন বসল না। সেই যে পরশু সন্ধ্যেবেলা পঞ্চুর মা কোথা থেকে একটা বিধবা মেয়েছেলে নিয়ে এসে বকবক করল, তারপর থেকেই সত্য যেন কেমন হয়ে গেছে। কথা নেই বার্তা নেই, ছেলেদের সঙ্গে হাসিখুশি নেই, যেন কোন্ জগতে বাস করছে।
কথাটা সত্যি–পরশু থেকে সত্য এক ধাঁধার জগতে বাস করছে।
কাকে নিয়ে এল পঞ্চুর মা? শুধু দত্তবাড়ির পানসাজুনি? তাহলে কি জন্যেই বা এল সে?
সত্যকে দর্শন করার বাসনা এমন প্রবল হবার হেতু কি তার? তা তাই যদি হয়, মন খুলে কথাই বা কইল কই? কেমন চেপে চেপে রেখে রেখে কথা, থেমে থেমে নিঃশ্বাস, ভেতরে যেন কত কি!
ওকে কি সত্য আগে কোথাও দেখেছে? সত্যর খুব একটা চেনা মানুষের মতন কি দেখতে ও? কিন্তু সে মানুষটা তো এমন পোড়ামূর্তি ছিল না! ওর নিয়তি কি শেষ অবধি আগুন হয়ে ওকে ঝলসা পোড়া করে ছেড়েছে?
দুজনের মধ্যেই যেন উত্তাল ঢেউ, কিন্তু কেউই নিজে থেকে এগিয়ে এসে খপ করে হাত ধরে বলে উঠল না, তুমি সেই না?
পঞ্চুর মা খনখন করে বলে উঠেছিল, কই গো বামুনদি, এত আগ্রহ করে এলে, অথচ বাক্যি ওকি নেই কেন?
সেই বামুনদি আস্তে আস্তে বলেছিল, কথা কইতে তো আসি নি, দেখতে এসেছি।
গলার শব্দটা কি সত্যর শোনা নয়?
যেন অনেক সাগরের ওপারে অনেক যুগের আগে সত্য এই স্বর শুনেছে। তবু বলতে পারা যায় নি, আমার চোখকে তুমি ফাঁকি দিতে পারবে না গো, আমি বড় ধুরন্ধর মেয়ে।
বাধা অনেক।
হয় কি নয়, নয় কি হয়–এর আলো-আধারির বাধা, সমাজ-সামাজিকের বাধা, অবস্থার তারতম্যের বাধা, সর্বোপরি পঞ্চুর মার উপস্থিতির বাধা, সেটাই হয়েছিল বোধ করি সব থেকে বড় বাধা। হঠাৎ একলা দুজনে মুখোমুখি দাঁড়ালে হয়তো অন্য বাধাগুলো মুহর্তে খসে পড়ত, হয়তো দ্বিধামাত্র না করে ঝপ করে বলে ফেলা হত, শেষ অবধি তা হলে এই হাল হয়েছে? বেশ ভাল। সুখটা করলে ভাল! আগে হলেও বলতো। অনেক যুগ আগে ছেলেমানুষ ছিল সত্য, এখন তো নেই।
তাই সে সব হল না। খানিক পরে পঞ্চুর মা হাই তুলে বলল, চল তা হলে বামুনদি, তোমাকে দুয়োর অবধি এগিয়ে দিয়ে আমি ঘরে যাই। সারাটা দিন রপটানি গেছে, চোখ ভেঙে ঘুম আসছে।
চল। বলে উঠে পড়েছিল সে। বলে নি, আর একটু থাকি না!
সত্য বলে নি, আর একটু বসো না!
সেই অবধি বিমনা হয়ে রয়েছে সত্য।
নবকুমার বলেছিল, পঞ্চুর মার সঙ্গে ওই মাগীটা কে এসেছিল? কেন।
কথা শেষ করতে পারে নি, তীব্র স্বরে থামিয়ে দিয়েছিল তাকে, ছেলেপেলের সামনে অভিব্যির মত কথা কও কেন? বলেছিল সত্য। আর তদবধিই যেন সত্য চিন্তামগ্ন।
