পঞ্চুর মা কিন্তু আর কথা বাড়ায় না। সত্যর বিরুদ্ধে কথা বলতে তার বিবেক তেমন সায় দিচ্ছে, তবে নেহাৎ নাকি এ ঘরে এখন পালের হাওয়া উল্টো দিকে তাই। বড়মানুষের কথার ধামা তো ধরতেই হবে। তা ছাড়া সত্যর ওপর তার আজ সত্যিই বড় রাগ হয়েছে।
সে কোথায় ভেবে রেখেছিল সত্যকে নিয়ে এসে বড়লোকের বাড়ির জাঁকজমক দেখাবে, আর তার বোনঝি শৈলর যে এ বাড়িতে কতখানি মানমর্যাদা তা বুঝিয়ে ছাড়বে। একটা মান্যিমানের মাসী পিসি হওয়াও তো কম গৌরবের নয়।
মান্যিমান বৈকি!
দত্তগিন্নীর মেজছেলের সঙ্গে শৈলর দহরম-মহরম তো আর রাখা-ঢাকা নেই। মেজবাবুর উপর শৈলর আধিপত্য একেবারে প্রকাশ্য ব্যাপার। মেজবৌটাকে ঢিট রাখতে দত্তগিন্নী এ আগুনে রীতিমতই ইন্ধন দিয়ে চলেন। শৈলর জন্যে গন্ধতেল গন্ধসাবান সরবরাহ হয় দত্তগিন্নীর নিজের ভাড়ার থেকে। শৈলর জন্যে পানে খাবার সব চেয়ে দামী কিমা আসে গিন্নির খরচে। শৈলর ফিতেপেড়ে শান্তিপুরী হাফশাড়ীর যোগানদার অবশ্য মেজবাবু স্বয়ং, তবে একটু ময়লা কি ছেঁড়া চোখে পড়লেই দত্তগিন্নী গ্যাদারী বেজারমুখী মেজবৌটাকে শুনিয়ে শুনিয়ে শৈলকে বলেন, হালা, কাপড় এত ময়লা কেন? নেই বুঝি? বলতে পারিস না তোর মেজদাদাবাবুকে?
এতজন থাকতে মেজদাদাবাবুকেই কেন, সে প্রশ্নটা অবশ্য উহ্য থাকে।
তা এসব রঙ্গরসের গপপো অবশ্য পঞ্চুর মার মনিবনীর সঙ্গে করার জো নেই, কিন্তু শৈলর দখলত্বিটা দেখানো যেত–তা হল না কিছুই।
মরুক গে।
যার যেমন বুদ্ধি।
বুদ্ধির দোষেই ঠকে মানুষ। বৌদিদি যে এত বুদ্ধিমতী, তা কই জিততে পারল কই, হেরেই তো মলো। নিজে ভাল করে খেলি না, স্বামীপুত্তরকে খেতে দিলি না, গান শুনলি না, সব দিকেই ঠকলি। ধুত্তোর!
মনঃক্ষুণ্ণ পঞ্চুর মা পানসাজুনির দিকে এগিয়ে এসে বলে, দাও বামুনদি, দুটো বেশ মচমচে করে পান দাও দিকি খাই
দুটো পান তাড়াতাড়ি সেজে কম্পিত হাতে সে দুটো পঞ্চুর মার হাতে তুলে দিয়ে পানসাজুনি বামুনদি চাপা নীচু গলায় বলে, কই তোর মনিবনীকে তো আমায় দেখালি না?
ওমা শোন কথা! ক’দণ্ড থাকল তিনি? এল আর চলে গেল বৈ তো না।
তোদের কথাবার্তা শুনে একটু কৌতূহল হচ্ছে। বলি এত তেজদম্ভ শুনছি–দেখাবি না একবার?
আর দেখানো! বৌদি কি আর এমুখো হবে? আর এ বাড়িতে আসবে? তবে যদি তুমি
বামুনদি আরও মৃদু গলায় বলে, তবে তাই চল না, দেখে আসি।
ওমা! হঠাৎ আমার মনিবের ওপর এমন নেকনজর কেন গো বামুনদি?
আস্তে। এক্ষুনি গিন্নীর কানে উঠবে আর না করে বসবে!
বেশ, সন্ধ্যের পর নিয়ে যাব।
.
যাবার মুখটায় কিন্তু বামুনদিদি কেমন যেন বিচলিত হয়, আগ্রহটা যেন ঝিমিয়ে আসে তার। বলে, থাক গে পঞ্চুর মা–কাজ নেই।
ওমা কেন? ত্যাখন অত মন করলে!
হ্যাঁ, ঝোঁকের মাথায় তখন বলেছিলাম বটে, তা বলি কি, গেলে আবার এ গিন্নীর যদি গোসা হয়?
শোন কথা! কে টের পাচ্ছে? তোমার আমার মতন চুনোপুঁটির খবর রাখতে ওনাদের দায় পড়েছে। কাজের বাড়িতে নানা গোলমাল, দশটা নতুন রাঁধুনী চাকরানী খাটছে, ফাঁকি দেবার এই তো সুযোগ।
না ভাবছি গিয়েই বা কি হবে! শুনেছি নাকি দেমাকী, রাঁধুনী পানসাজুনির সঙ্গে যদি কথা না কয়!
ওমা না না, তা তুমি ভেবো না বামুনদি– পঞ্চুর মা অভয় দেয়, তাকে যদি কেউ ঘাঁটাতে না যায় সেও কিছু বলবে না। বাড়িতে অতিথি এলে বরং আদর-আভ্যানই করবে, রাধুনী চাকরানী বিচার করবে না। এই তো সেদিন তাতিনী মাগী গেছল, তাকে কত যত্ন করে বসাল, তেষ্টার জল দিল পান দিল। কাপড় অবিশ্যি নিল না, বলল দরকার নেই, তবে দূর-ছাই তো করল না।
অনেক অগ্রপশ্চাতের পর শেষ অবধি অগ্রেরই জয় হয়।
পেঁজা তুরতুরে সিল্কের চাঁদরখানা গায়ে জড়িয়ে সন্ধ্যের দিকে খিড়কির দরজা খুলে পঞ্চুর মার সঙ্গে রাস্তায় নামল পানসাজুনি বামুনমেয়ে।
বামুনের মেয়ে একদা কাজের দরকার নিয়ে এসেছিল দত্তবাড়িতে। নেহাৎ ঝি-চাকরানীর কাজ তো দেওয়া যায় না তাকে, তাই এই কাজের ভার। অবশ্য পান সাজা কথাটা শুনতে যত হালকা, এ বাড়িতে সে ব্যাপারটা তত হালকা নয়। দৈনিক অন্তত হাজার তিনেক পান তাকে সাজতে হয়। তদুপযুক্ত সুপুরিও কেটে নিতে হয়। তাছাড়া সব পান ঠিক এক ধরনের সাজলে চলে না, তার আবার শ্রেণীবিভাগ আছে। কারুর কারুর মিঠাপানের খিলি বরাদ্দ, কারুর কারুর জায়ফল দারচিনি জৈত্রি কাবাবচিনি এলাচ কর্পূর সম্বলিত রাজকীয় পান, কারো বা দোক্তা খাওয়া মুখের রুচি অনুযায়ী শুধু খয়ের দুপুরি। আবার সুপুরিও মিহি মোটা নানা প্রস্থ। এই সব পানের নৈবেদ্য সজিয়ে যার যার ঘরের বাটায় রেখে আসতে হয় গোলাপজলে ভিজানো ন্যাকড়া চাপা দিয়ে।
এছাড়া সরকার গোমস্তা লোজন, অতিথি ফকির, আসুন্তি যাউন্তি, আশ্রিত অভ্যাগতদের জন্যে মোটা বাংলা পানের ব্যবস্থা আছে। সমস্ত ওই বামুনমেয়ের ঘাড়ে। শুধু পান নিয়েই সারাটা দিন তার প্রাণ যায়-যায়। তার ওপর আবার বাড়িতে যজ্ঞি হলে তো কথাই নেই। সেও তো আছে যখন তখন। বিয়ে, সাধ, মুখেভাত এসব বাদেও বাড়ির হরেক রকম মেয়েমানুষের হরেক রকম বত্ত সারাও তো সারা বছর। লোকজন খাওয়া লেগেই আছে। দত্তগিন্নীর ছোটজা অনন্ত-চতুর্দশীর বত্ত সারল, তিন-চারশ লোক খেল। পতিপুত্রহারা বিধবা, তবু কমতি কিছু হল না। বড়গিন্নী উদারমনা, বললেন, তা হোক। ওই কেউ না থাক, আমি যখন আছি আমিই ওর সব করাব। ইহকালটা তো বৃথাই গেল, পরকালটা বজায় থাক্।
