সত্যর সেই জোড়া ভুরুর নীচের গভীর কালো চোখ জোড়া সহসা একটি কৌতুক-রসাশ্রিত বিদ্যুকটাক্ষে ঝিলিক মেরে ওঠে, সত্য বামনী কবে তার মতলব ছেড়েছে?
নবকুমার সেই মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। সত্যর হাসিটা দুর্লভ বলেই কি এত অপূর্ব?
না, এ অপবাদ নবকুমার দিতে পারে না–সত্য বামনী কখন তার মতলব ছেড়েছে। শুধু নবকুমারই বুঝতে পারে না, অকারণ সুস্থ শরীর ব্যস্ত করে কী সুখ পায় সত্য!
সঙ্গে সঙ্গে হাঁ করে তাকিয়ে থাকা চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বেজার মুখে বলে নবকুমার, কেন, এ বাসা আবার কি অপরাধ করল?
সে তোমাকে বললে তুমি বুঝবে না।
না, আমি তো কিছুই বুঝব না। যত বোঝার কত্তা তুমি। বাসা-ফাসা বদলানো হবে না। বারে বারে এক কেত্তন! পাখী-পক্ষী নাকি, যে রাতদিন বাসা বদলাবো? হবে না বলে দিচ্ছি–ব্যস।
তা বেশ, হবে না। সত্যি, কর্তার কথাই বজায় থাক।
বলে সত্য উঠে যায়।
.
এ বাসা বদলানোর ইচ্ছে যে সত্যরই খুব আছে তা নয়। বাড়িটা সব দিক দিয়ে সুবিধেয়। কিন্তু ওই মাথার ওপর প্রভু নিয়ে প্রজা হয়ে থাকাটাই তার বরদাস্ত হচ্ছে না। আর মজাটাও দেখ নিজের বাড়িতে নিজের মতন থাকব তা নয়, ঝিটা এবাড়ি ওবাড়ি করে যন্ত্রণা ঘটাতে থাকবে। ওকে ছাড়িয়ে দিলেও কতকটা সুরাহা হয় বটে কিন্তু সেটাও ঠিক মনের সঙ্গে খাপ খায় না। মানুষটা দুষ্টুপাজী নয়। উপকারীও আছে। দোষের মধ্যে হচ্ছে অবোধ। আর অবোধ বলেই অতিরিক্ত কথা হয়। সেই কথার জ্বালাতেই ছেলে দুটোর কুশিক্ষা জন্মাচ্ছে।
তা সেই কথাই বলে ছাড়িয়ে দিতে হবে পঞ্চুর মাকে। বলতে হবে, আমার ছেলেদের যদি তুমি শেখাও মা নয়, রাক্ষুসী, তা হলে তোমায় কি করে রাখি বল তো বাছা? সামনের মাস থেকে অন্য কাজ দেখ।
সেই কথাই ঠিক করে মনে মনে।
এবাড়ি ওবাড়ি আনাগোনার কথা তুলে খেলো হবে না। আসুক কাল সকালে।
.
কিন্তু কাল সকাল অবধি অপেক্ষা করতে হল না সত্যকে, সেই সন্ধ্যাতেই এসে হাজির হল পঞ্চুর মা, সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত এক বার্তা নিয়ে।
এ কী!
এ কোন্ বিপদ অপেক্ষা করছিল সত্যর জন্যে?
সন্ধ্যের আগে দুপুরের কথাটা তা হলে বলে নিতে হয়।
.
দত্তগিন্নী পিচ করে পিক ফেলে বলেন, হ্যাঁলা পঞ্চার মা, তোর মনিবগিন্নী বয়সে তো কাঁচা, ওর এত অঙ্কার কিসের বল্ দিকিনি?।
দত্তগিন্নীর চির মোসাহেব “ভাগ্নে-বৌ” হি-হি করে হেসে উঠে বলে, ওই কাঁচা বয়সেরই অহঙ্কার গো মামী! নইলে অহঙ্কার করবার আর কিছু তো দেখছি না।
দত্তগিন্নী ভারীমুখে বললেন, উঁহু, এ বাপু বয়সের দেমাক নয়, এ হচ্ছে স্বভাবের দেমাক। সংসারের ওর আর কে আছে রে পঞ্চার মা?
পঞ্চুর মা এ বাড়িতে কোনদিনই পঞ্চার মা বৈ পঞ্চুর মা শোনে না, তাই ওই অগ্রাহ্যের ভঙ্গী তার গা-সহা। অতএব বিনয়ে বিগলিত হয়েই সে উত্তর দেয়, আর কে? ওই উনি, ওনার সোয়ামী, আর দুটো সাত আট বছরের খোকা!
অঃ! তাই! কথাতেই আছে, মেঘা খেয়ে রোদ হয় তার বড় চড়চড়ানি, আর বৌ হয়ে গিন্নী হয় তার বড় ফড়ফড়ানি। তা শাশুড়ীমাগী বুঝি মরেছে?
পঞ্চার মা কৌতুকের ভঙ্গীতে বলে, বালাই ষাট! মরবে কেন? শাশুড়ী আছে শ্বশুর আছে, আছে সবাই। দেশ-গেরামে আছে। উনি বাসায় এসেছেন স্বামীপুত্তুর নিয়ে। সোয়ামী সাহেবের আপিসে চাকরি করে।
বটে! তাই তো বলি! তাতেই তেজে মটমট! দেশ কোথা?
কোথা কি বিত্তান্ত কে শুধোবে মা? পঞ্চুর মা মনে মনে সত্যর প্রতি স্নেহশীল এবং সমীহপরায়ণ হলেও, নিতান্তই দত্তগিন্নীর সুয়ো হতে মনিবের প্রতি অগ্রাহ্য দেখিয়ে বলে, গপপো করবার সময় আছে তেনার? ঘরের কাজ মিটল তো বই কেতাব মুখে দিয়ে বসল
বই কেতাব!
ঘরের মধ্যে একটা ব্যঙ্গহাসির ঢেউ খেলে যায়, তাই নাকি? ওরে পঞ্চার মা, তুই যে দেখচি খুব ভাল বাড়িতে চাকরি ধরেছিস! দেখিস বাপু, গিন্নীর হাওয়া লেগে তুই সুদ্ধ পণ্ডিতনী হয়ে যাস নি!
পঞ্চুর মা হেসে বলে, তা পারলে গিন্নী আমাকেও বই ধরায়। বাবা, ছেলে দুটোকে পড়া পড়া করে যা দিক করে। তবু ওই ছেলে দুটোই যা গপপোগাছা করে আমার সঙ্গে। ওদের মুখেই শুনেছি, বারুইপুর না কোথায় যেন দেশ, ঠাকুমা আছে ঠাকুন্দা আছে পিসি আছে আর মামার বাড়ি সেই তিরবেণীর কাছে নিত্যেনন্দপুর না কি যেন। দাদামশায় কবরেজ খুব বড়মানুষ
সহসা ঘরের মধ্যে একটা মানুষের মুখ কেমন উদ্ভ্রান্তের মত হয়ে যায়, দেয়ালের কোলে একখানা পেতলের চৌকিতে পাতিয়ে পাতিয়ে পান সাজছিল সে, কাজ করা হাতটা তার থেমে যায়। হাঁ করে তাকিয়ে থাকে পঞ্চুর মার মুখের দিকে, কানে যায় না দত্তগিন্নীর মন্তব্য।
বড়মানুষের ঝি বলেই এত দেমাক সাত নম্বর বাড়ির গিন্নীর–সেই মন্তব্যই করেন দত্তগিন্নী।
পঞ্চুর মাও মন্তব্য দিয়ে পরিসমাপ্তি করে, সেই তো!
শুনলাম নাকি ছাঁদার হাঁড়ি ছোঁয় নি– ভাগ্নে-বৌ নিভন্ত আগুনে কাঠ ফেলে, ঢপ শোনে নি!
সেই কথাই তো বলে মরছি বৌদিদি– পঞ্চুর মা আক্ষেপ করে, এত এত নোকের সময় হল, আর তোর সময় হল না? পাড়ার সকল ছেলে ঘরে বসে রইল, তোর ছেলেদেরই ইস্কুলের মান্যি এত হল! ছেলে দুটোর জন্যে মরছি করকরিয়ে।
তা যাস, হাঁড়িখানা নয় তুই-ই নিয়ে যাস। দিস গিয়ে ছোঁড়াদের।
বলেন অপর এক মহিলা।
কিন্তু পানসাজুনি বিধবাটির কানে বুঝি এসবের বিন্দুবিসর্গও যায় না। সে তেমনি হাঁ করে তাকিয়ে থাকে পঞ্চুর মার মুখপানে, আর কি বলে সে সেই আশায়।
