উপোসের সাজা! মানে? ওঃ, তাই তো! ছেলেদের খেতে দেওয়া হয় নি!
মুহূর্তে মনটা ভিতরে ভিতরে দ্রব হয়ে গিয়ে “হায় হায়” করে ওঠে। ছেলেদের খেতে না দিয়ে বসে আছে সে? রাগের চোটে খেয়ালই হয় নি? ইস্! পঞ্চুর মা দেখছি নেহাৎ ভুল বলেও নি। কচি ছেলে ওরা, ওদের আর ভালমন্দ বোধ কতটুকু? ওদের বাপ বুড়ো মিনসেই যদি বড়মানুষের বাড়ির খাবারের মোহময় ছবি এঁকে ওদের সামনে ধরে! রাগটা কমে গিয়ে “হায়-হায়” এলেও মুখে হারে না সত্য। গম্ভীরমুখে বলে, তা সামান্য দুটো মুড়ি-নাড়ু, নাই বা দিলাম, মণ্ডামেঠাই খাজাগজার গল্প করগে না ছেলেদের কাছে, খুব পেট ভরবে।
কথা কয়েছে। বাচা গেল।
নবকুমারের ভয়টা অনেক ভাঙে।
সত্য যখন মুখ খুলেছে, বুঝতে হবে অবস্থা একেবারে মারাত্মক নয়।
কথা না কয়ে চোয়ালের হাড় শক্ত করে নিঃশব্দে বসে থাকাটাকেই বড় ভয় নবকুমারের। অফিসে নবকুমারের কর্মদক্ষতা আর বুদ্ধিমত্তার এত সুনাম, নিম্নবতীরা এত ভয়-ভক্তি করে তাকে, সেখানে নিজেকে তো “বেশ একজন” মনে হয় কিন্তু বাড়িতে এলেই যে কী হয়! সেই চির অসহায়তা!
তবু আজ এখন সত্য মুখ খুলেছে।
তাই নবকুমারও সাহসে ভর করে বলে, আহা, খিদেয় কাহিল হয়ে গেছে একেবারে! আপিস ইস্কুল থেকে ফিরে খিদে যা জোর লাগে জানি তো!
অর্থাৎ এ সুযোগে নিজের কথাটাও ঢুকিয়ে দিল নবকুমার।
আর রাগ নিয়ে বসে থাকা চলে না। সত্য উঠে পড়ে।
নবকুমারও আর বেশী সময় নেই বুঝে তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, রাগ তো দেখালে এত, বলি ছাদায় এত ঘেন্না কিসের? ছাঁদা আবার কে না আনে? কেন, তোমার বাপের বাড়ির দেশে ছাঁদার চল নেই বুঝি? আমরা তো বাবা ছেলেবেলায় ওই ছাঁদার আশাতেই নেমন্তন্ন যেতাম। ছোট পেটে কতই আর খেতে পারতাম বল? বাড়িতে এসে পরদিন সকালে সেই ছাঁদার সরা খুলে।
থাক হয়েছে, গল্প রাখ-মুখ ধোও গে বলে সত্য উঠে যায়। মনটা হঠাৎ যেন নরম হয়ে গেল। সত্যি এতে রাগের কি ছিল? তাদের ছেলেবেলায় তারাও তো–! কেন চল থাকবে না তার বাপের বাড়ির দেশে? তাদের বাড়ির কাজকর্মেই তো কত সরা সাজানো, মালসা সাজানো, হাঁড়ি সাজানো দেখেছে, লোকে খাওয়াদাওয়ার পর নিয়ে গেছে। রামকালী নিজে দাঁড়িয়ে তদারক করেছেন, মাথাপিছু ঠিকমত যাচ্ছে কিনা। সঙ্গের ঝিটা মুনিষটা রাখালটা পর্যন্ত বাদ যেত না। আবার সত্যরাও পিস্ঠাকুমার সঙ্গে যখন এ-বাড়ি ও-বাড়ি নেমন্তন্ন গেছে, তারা দিয়েছে, নেওয়া হত না তা তো নয়।
আর একটা উৎসব ছিল বিশেষ আকর্ষণীয়। সেটা হচ্ছে আটকৌড়ে। গ্রামে কারও বাড়িতে ছেলে জন্মালেই আটদিনের মাথায় ডাক পড়ত অপর বাড়ির কুচো ছেলেদের কুলো পিটোতে। সে সম্মানটা অবশ্য শুধুই ছেলেদের।
তবে খই-মুড়কি আটভাজার সম্ভার থেকে মেয়েরা বঞ্চিত হত না। আঁটসাট করে বেড়াবিনুনি বাঁধা, কোমরে ডুরেশাড়ির আঁচল জড়ানো, পাড়া সচকিত করে মল বাজিয়ে যাওয়া নিজের সেই চেহারাটা যেন চোখের ওপর দেখতে পেল সত্য।
ফিরত সেই ডুরেশাড়ির আঁচলটা কৌশলে কোঁচড়ে পরিণত করে, তাতে খাজা গজা আটভাজার বোঝাই দিয়ে। তার মধ্যে কেউ কেউ বা আবার আটটা করে পয়সা মিশিয়ে রাখত, বাড়ি এসে কি মহোল্লাসে সেই পয়সা খোঁজার ধুম!
কই, নিজেকে বা অপরকে তো তখন হ্যাংলা মনে হত না? কেন হত না? আজই বা কেন-
স্বামী-পুত্রের খাবার গোছাতে গোছাতে কারণটা ভাবল সত্য, নির্ণয়ও করল একটা। ওদের খেতে দিয়ে উপস্থাপিত করল সেই কথাটা।
বলছিলে আমাদের নিত্যেনন্দপুরে ছাঁদার চল ছিল কিনা? থাকবে না কেন, খুবই ছিল। তবে কথাটা হচ্ছে–সেই দেওয়ার মধ্যে নেমন্তন্ন-কত্তার অহঙ্কারটা ফুটে উঠত না। বরং যেন দিতে পেরেই কেতত্থ। তাই যারা নিত, তাদের মধ্যে মান অপমান ঘুলোত না। এই তোমার দত্তবাড়ির বাপু সবতাতেই যেন অহঙ্কার। একখানি একখানা তিজেলে বাহান্ন প্রস্থ মিষ্টি সাজিয়ে রেখেছিল তো আসনের পাশে, তা সেটা মানুষ পালকিতে তুলিয়ে দেবে তো? তা নয় বাড়ির লোকেরা কে কোথায় ঠিক নেই, কাকস্য পরিবেদনা, একটা দাসীমতন মেয়েমানুষ ভাঙা কাঁসি গলায় চেঁচিয়ে উঠল, ওগো বামুন মেয়ে, তোমার ছাঁদা পড়ে রইল যে! দেখত অভব্যতা! নেব আমি হাতে তুলে?
সত্যর স্বামী-পুত্রের মনে সেই বাহান্ন রকম কী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করল কে জানে, তবে নবকুমারকে স্ত্রীর কথায় “তা সত্যি” বলে সায় দিতেই হল। তার পর কথাটা সে নিজেই পাড়ল, তা’পর–সত্যিই সেই সোনার হারছড়াটা দিয়ে এলে নাকি?
তা সত্যি দেব না তো কি মিথ্যে দেব? দেব বলে নিয়ে গেলাম।
নবকুমার আক্ষেপ-নিঃশ্বাস গোপন করে উদাসভাবে বলে, তোমার জিনিস তুমি ফেলে দিতে পার, বিলোতে পার, সে কথা না তবে পাড়ার দু-একজনকে শুধিয়েছি সকালে, কেউ আধুলিটা কেউ সিকিটা দিয়েছ, টাকার উর্ধ্বে কেউ ওঠে নি।
সত্য এ প্রসঙ্গে যবনিকাপাত করে দিতে বলে, যাক গে বাপু, কচি ছেলেকে দেওয়া জিনিসের কথা নিয়ে কচকচানিতে কাজ নেই, ছাড়ান দাও ও কথায়। এবারে পুরুষ বেটাছেলের মতন একটা কাজ কর দিকি? একখানা বাসা খোঁজ।
বাসা? আবার বাসা খুঁজব? বদলাবে এ বাসা?
তাই তো স্থির করেছি।
মনে করেছি নয়, ইচ্ছে করেছি নয়, সংকল্প করেছিও নয়, একেবারে স্থির করেছি!
নবকুমার মনে মনে নিজের হার নিশ্চিত জেনেও লড়াইয়ে নামে, তা স্থির করবে বৈকি, মাথাটাই অস্থির যে! তাই নিত্যি নতুন স্থির করা! বলি এই ভাড়ায় এমন বাসা আর পাবে? দত্তদের নাকি নেহাৎ পয়সায় দৃকপাত নেই তাই বাসাগুলো এত সস্তায় ছেড়েছে! অপর কেউ হলে দেড়া দাম হাঁকত। ওসব কু-মতলব ছাড়।
