বারুইপুরে পানের চাষ অনেক আছে বটে, গানের চাষ নেই।
আজ যদি মেজাজটা অমন না বিগড়ে যেত, দু দণ্ড বসে গান শুনে আসত সত্য, কিন্তু হল না। শোনা। যাচ্ছেতাই হয়ে গেল মন মাথা।
নিজের বাড়ির দাওয়ায় দাঁড়িয়ে একটু শোনবার চেষ্টা করল, তা সে ওই সুরের একটা রেশ ছাড়া কিছুই কানে এল না। একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস ফেলে সরে এল সত্য। এ নিঃশ্বাস গান শুনতে পাওয়ার জন্য অবশ্য নয়, কারণ অন্য।
জগতে পয়সার প্রাধান্য দেখে আর পয়সার গরম দেখে মনটা উদাস হয়ে যাচ্ছে তার। কী আশ্চর্য এই কলকাতা শহর! গুণের নয়, বিদ্যেবুদ্ধির নয়, মানুষ মনিষ্যত্বর নয়, শুধু মাত্র পয়সার জয়জয়কার। এই শহরকে সেই শৈশবকাল থেকে কত ভক্তি কত সমীহর চোখে দেখে এসেছে যে সত্য!
খানিকটা উদাস-উদাস হয়ে বসে থেকে সত্য আবার ভাবল, তা একটা মাত্র সংসার দেখে, একটা মানুষের আচার-আচরণ দেখেই বা আমি এমন আশা-ছাড়া হচ্ছি কেন? এত বড় বিরাট পুরীতে কত মানুষ কত হালচাল! এই শহরেই রাজা রামমোহন ছিলেন, বিদ্যেসাগর আছেন, বঙ্কিমচন্দ্র আছেন, পিরীলি ঠাকুরবাড়ির মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর আছেন, আরও কত সব আছেন। ভবতোষ মাস্টার তাঁদের সব জীবনকথা, মহিমার কথা কত শুনিয়েছেন সত্যকে, সে সব ভুলে গিয়ে সত্য কিনা ওই দত্তগিন্নীকে দিয়ে কলকাতার বিচার করছে?
মনটা ঝেড়ে ফেলে উঠল। আজ পঞ্চুর মা আসবে না, তার কাজগুলো সব করে নিতে হবে।
তা একটু না গুছিয়ে নিতেই তুড়ু, আর খোকা ইস্কুল থেকে ফিরল দুমদাম করে।
মা! ভীষণ নেমন্তন্ন খেলে তো?
সমস্বরে বলে উঠল দুজনে।
সত্য হেসে ফেলে বলে, হ্যাঁ! শুধু ভীষণ? একবা বিভীষণ! নে নে, ইস্কুলের জামাকাপড়ে সর্বজয় করিস নে। মুখ-হাত ধা।
খাবার আছে? খাবার? মণ্ডা-মেঠাই, খাজাগজা, ছানাবড়া, অমৃতি? ভাবতে ভাবতে আসছি আমরা
ওদের কণ্ঠে অসহিষ্ণুতা দেদীপ্যমান।
সত্যর মনটা একটু মায়া-মায়া হয়ে আসে, এই দেখ ছোট ছেলেদের কাণ্ড! সারাদিন পড়া লেখা ফেল করে মণ্ডা-মেঠাইয়ের চিন্তা করছে। কিন্তু মায়াকে প্রশ্রয় দিলে চলবে না এখন। তাই সবিস্ময়ে ভাব দেখিয়ে বলে, ওমা স্বপ্ন দেখছিস নাকি? ওসব আবার আমি কোথায় পাব?
ওরা কিন্তু এ বিস্ময়কে আমল দিল না, মার হাত ধরে ঝুলে পড়ে হৈ-হৈ করে উঠল, ইস তাই বৈকি! চালাকি হচ্ছে! ও বাড়ি থেকে ছাঁদা আনো নি বুঝি?
ছাঁদা!
সত্যর মায়া-মায়া মুখটা কঠিন হয়ে ওঠে, তীক্ষ্ণ প্রশ্ন করে, ছাঁদার কথা কে বলেছে?
বাঃ, বাবা তো আপিস যাবার সময় বলল, তোদের মা কত ছাঁদা আনবে দেখিস।
ভুলে বলেছেন। নয়তো ঠাট্টা করেছেন। সত্য বলে।
কিন্তু তুড়ুর মন এখন আক্ষেপ-উদ্বেল। সে বলে, তুমি শুধু শুধু আমাদের ইস্কুলে পাঠালে, কেউ বুঝি আর ইস্কুলে গেছে? পাড়ার ওরা দিব্বি পেট ঠেসে খেলো আবার জনাজনতি ছাঁদা আনল। আর আমরা হুউউ–যোল রকম নাকি মিষ্টি করেছে ওরা
সত্য গম্ভীর ভাবে বলে, সেটা আবার কি করে জানলি, আপিস যাবার সময় তাও বুঝি বলা হয়েছে?
না, সে কথা বাবা কি করে জানবে? বলেছে পঞ্চুর মা।
ও, তা আজ দেখছি তোদের মাথার মধ্যে শুধু ওই ছাঁদার গল্পই ঘুরছে। হ্যাংলার মতন আবার ছাঁদা আনব কি! যাঃ চল, বাড়িতে যা আছে তাই দিই গে।
তুড়ু বয়সে বড় হলে কি হয়, খোকার থেকে সে হাঁদা। তাই সে সহসা বলে ওঠে, চাই না আমি ও মুড়ি-মুড়কি আর নাড়ু খেতে! পঞ্চুর মা ঠিকই বলেছে।
হঠাৎ নিজের কথায় শিউরে উঠে চুপ করে যায় সে।
কিন্তু চুপ করিয়ে রাখবার মেয়ে সত্য নয়। সে তীব্র জেরায় কী বলেছে পঞ্চুর মা তা আদায় করতে চেষ্টা করে। আর তুড়ু কাঠ হয়ে গেলেও খোকা বলে বসে, পঞ্চুর মা বলেছে একদিন ইস্কুল কামাই হলে কী এত রাজ্যি লোপাট হয়? অমন ভোজটা থেকে ছেলে দুটোকে বঞ্চিত করল! মা না রাক্ষুসী।
কী! কী বললি? বল বল আর একবার!
সত্য যেন দিশেহারা হয়ে গেছে। সত্য নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। এই হল শেষটা! এই রকম হচ্ছে তার ছেলেরা? এর জন্যে এত কাণ্ড করে দেশ থেকে চলে এসেছে সত্য?
তার যে একান্ত বাসনা ছিল তার ছেলেরা সভ্য হবে মার্জিত হবে।
সত্যই কি তবে অসভ্য হবে, অমার্জিত হবে? মারবে ছেলেদের?
না, সত্য ছেলেদের মারে নি।
শুধু একবার সেই তীব্র প্রশ্ন করে চুপ করে গেছে। চুপ করে বসে আছে। ছেলেরা যে মুড়ি মুড়কিও খায় নি, তা আর তার মনেও নেই। ও শুধু ভাবছে। ঘরে পরে বিপদ, কার আওতা থেকে তবে রক্ষে করবে ছেলেদের?
খানিক পরে নবকুমার এল।
আড়চোখে একবার দেখে নিল সত্যর জলদগম্ভীর মুখটা, তারপর ইশারায় খোকাকে ডেকে বাইরে নিয়ে গিয়ে প্রশ্ন করল, কী হয়েছে সত্যর।
হ্যাঁ, বেগতিক দেখলে এই রকমই ওদের প্রশ্ন করে জেনে নেয় নবকুমার। নেয় খোকার কাছে বেশী, জানে তুড়ুটা বোকা, গুছিয়ে বিশদ বলতে সে পারেও না।
কারণ শুনে নবকুমার বুঝতে পারে না, এই তুচ্ছ ব্যাপারে এত বিচলিত হবার কি হল সত্যর!
ছেলেরা তো আর মাকে রাক্ষুসী বলে নি? বলেছে পঞ্চুর মা!
তাই ঘরে ঢুকে কাষ্ঠহাসি হেসে বলে, কি, আবার কি হল?
সত্য সেই ভাবেই বসে থাকে, কথা বলে না।
নবকুমার বলে, বাবা রে, চিরটা দিন এক রকমে গেল! তোমার কাষ্ঠ-কঠিন স্বভাবের গুণেই পঞ্চুর মা ও কথা বলেছে। তা সেইটুকু বলেছে বলে এত শাস্তিও করতে হয় ছেলে দুটোকে? ইস্কুল থেকে নাচতে নাচতে আসছে বড়মানুষের বাড়ির ভালমন্দ দুটো খাবে বলে, তার বদলে কিনা উপোসের সাজা! ধন্যি বটে!
