তা সে যাই হোক, দত্তগিন্নী অসন্তুষ্ট স্বরে বলেন, ও হার তোমাকে ফিরে নিয়ে যেতে হবে।
নিয়ে যেতে হবে!
সত্য অবাক হয়ে বলে, ছেলেকে দেওয়া জিনিস কী করব নিয়ে গিয়ে?
কী করবে সে তোমার বিবেচনা। তবে পেরজার দানের সোনা আমরা নিই না।
আবার সেই প্রজা!
সত্যর সমস্ত শরীরের মধ্যে যেন একটা বিদ্যুৎপ্রবাহ বয়ে যায়, তবু সে কষ্টে আত্মসংবরণ করে বলে, তাহলে দেখছি আপনাদের এই সব প্রজা-পাঠকদের নেমন্তন্ন করাটাই ভুল, নৌকতা না দিয়ে কে আর কোন কাজে যায় বলুন? তা ছাড়া ব্রাহ্মণে কি আশীর্বাদ ফিরিয়ে নিতে পারে?
ব্রাহ্মণ!
দত্তগিন্নী একটু মলিন হন।
ওমা! এ যে দেখছি কাঠ-কাঠ কথা! দত্তগিন্নী বলেন, পোড়ারমুখী মোক্ষদা তো তা হলে ঠিকই বলেছে! যাক্, তুমিই তো হলে জিতলে। অতিথি নারায়ণ, যা বলবে শুনতেই হবে। তবে কাজটা ভাল হয় নি তোমার। বামুনের মেয়ে তুমি, তোমাদের পায়ের ধুলো আমাদের শিরোভূষণ, বলব না তোমায় আমি কিছু, শুধু এইটুকু বলব, পুঁটিমাছও মাছ, রুইমাছও মাছ, তবু কে আর তাদের এক সমান বলবে বল? যা বলেছি তো অতিথি নারায়ণ! ওরে সুবাস, একে সঙ্গে করে বামুনের পাতার ঘরে বসিয়ে দিগে যা।
অর্থাৎ এখানেই বাক্য ইতি।
সত্য ধীরে ধীরে সরে আসে আর হঠাৎ মনে হয় তার কোথায় যেন তার একটা হার হল।
সত্য কি খাবে না?
চলে যাবে?
বলবে শরীর খারাপ?
কিন্তু কিছু বলার আগেই দত্তগিন্নী ফের কথা বলেন, তোমাদের ছেলেদের আনো নি?
না।
কেন? সগুষ্টি নেমন্তন্ন হয়েছিল না?
সত্যর জোড়া ভুরু চির অভ্যাসমত কুঁচকে ওঠে, আর গলায় ফিরে আসে মৃদু কঠিন স্বর। সেই স্বরে উত্তর দেয়, না, নেমন্তন্ন আপনার ত্রুটি কিছু হয় নি। তবে সগুষ্টির এসে মাথা মুড়োবার সময় হলে আর উপায় কি! যা আমি তো এসেছি, তাতেই হবে। কথাতেই আছে, শিরে জল ঢাললে সর্বাঙ্গে পড়ে।
ঘরে যারা উপস্থিত ছিল তারা সাত নম্বর বাড়ির ভাড়াটের এ হেন স্পর্ধাযুক্ত কথায় বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায় এবং ভাবলেশশূন্য মেদপিণ্ডেও কঠিন একটা ভাবের খেলা ফোটে। তা তিনিও দত্তবাড়ির বড়গিন্নী। তাই নিজেকে সামলে নিয়ে বলেন, বামুনদির কথার তো খুব বাঁধুনী! নেকাপড়া জানা বুঝি? ভাল ভাল। দেখি নি তো এর আগে, দেখে বড় আমোদ পেলুম। তা যাক, খেও ভাল করে। আর ছেলেদের ছাঁদাটা নিয়ে যেও।
সত্য চলে যাচ্ছিল সেই সুবাস না কে তার সঙ্গে, হঠাৎ মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে তীক্ষ্ণ একটু হাসির সঙ্গে বলে, আমি পাড়াগাঁয়ের মেয়ে শহুরে রীতির কিছু জানি নে। নেমন্তন্ন করে ডেকে এনে অপমান করাই বুঝি কলকেতার চাল?
ওমা, শোন কথা!
দত্তগিন্নীর দুধের মত সাদা মুখখানায়ও হঠাৎ কালি মেড়ে যায়, আমতা আমতা করে বলেন, তোমরা হলে গে কুলের কুলীন, সব বামুনের সেরা বামুন, যাকে বলে জাত সাপ। তোমাদের অপমান্যি করবে, এত সাধ্যি কার আছে বল ভাই বামুনদি? যদি দোষত্রুটি কিছু হয়ে থাকে নিজগুণে মার্জনা করে আমার খোকাকে একটু আশীর্বাদ করে যাও।
সত্য স্থির স্বরে বলে, আশীর্বাদ তো অবিরতই করব। কিন্তু আমাকে একটু শীগগীর ছেড়ে দিতে হবে, তাড়া আছে।
শূদ্দুর-বাড়ি বামুনের খাওয়া।
দিনদুপুরে মোটা মোটা খানকতক লুচি, আলুনি খানিকটা কুমড়োর ঘ্যাঁট আর আলুনি বেগুনভাজা। অবশ্য হরেকরকম মিষ্টি আছে, আছে দই ক্ষীর।
তা কোনটাই সত্যর কাছে আকর্ষণীয় নয়। তবু খেয়ে দায় সেরে নিয়ে তাড়াতাড়ি পঞ্চুর মার সন্ধান করে। কিন্তু কোথায় পণুর মা? সে তখন ঢপের আসরে গিয়ে বসেছে। তিনতলার ওপর প্রকাণ্ড হলে সে আসর বসেছে। নাতির ভাতে “ঢপ-কীত্তন” দিয়েছেন দত্তগিন্নী।
মানদা ঢপি এসেছে।
আর নাকীসুরে টেনে টেনে কী একটা গানের গোড়াবাঁধুনি শুরু করছে।
পঞ্চুর মার তল্লাস করতে এসে দাঁড়ায় তার বোনঝি শৈল।
ময়লা রং, কালো ফিতেপাড় শাড়ি পরনে, সাদা ধবধবে সরু সিথির দুপাশে পাতাকাটা চুল, সর্বাঙ্গ নিরাভরণ তবু মনে হয় মেয়েটা খুব সেজেছে তো! এটা মনে হয় হয়তো মাজাঘষা গড়নের জন্যে, হয়তো বা পানেরাঙ্গা ঠোঁটের জন্যে।
শৈল বার্তা শুনে অবাক হয়ে বলে, ওমা, চলে যাবে কী গো? ঢপ শুনবে না?
না।
কী আশ্চয্যি! শোনবার লেগে লোকে মরে যায়, আর তোমার এত অগেরাহ্যি? মনে ভাবছ বুঝি শুনলেই প্যালা দিতে হবে? তা তুমি দিলেও পার, না দিলেও পার, ওটা হচ্ছে ইচ্ছেসাপেক্ষ।
তুমি পঞ্চুর মাকে ডেকে দেবে?
ও বাবা! দিচ্ছি দিচ্ছি! মাসি তাই বলছিল বটে—
শোন তোমার মাসিকে বল একেবারে যেন একখানা পালকি ডেকে তবে আসে!
পালকি! ও বাবা!
শৈল পানেরাঙা ঠোঁটের একটা অপরূপ ভঙ্গি করে ওদিকে এগিয়ে যায়।
.
তীব্র তীক্ষ্ণ সরু গলায় গানের আওয়াজ এ বাড়ি থেকেও শোনা যাচ্ছে। শুধু এ বাড়ি কেন, দূরে অদূরে বোধ করি পাড়ার সব বাড়ি থেকেই শোনা যাচ্ছে। সুরের জন্যে যত না হোক, গলার জন্যই ‘মানদা ঢপি’ বিখ্যাত! তীক্ষ্ণ শানানো গলা, গলায় সেই সুর–গান থামবার পরেও বাতাসের গায়ে ঝনঝনিয়ে আছড়ায়।
সত্য কখনও ঢপকেত্তন শোনে নি।
ছেলেবেলায় সেজঠাকুর্দার সঙ্গে কখনো কখনো হরিসভায় কেত্তনগান শুনতে যেত, সে অন্যরকম। তার গানের থেকে অনেক জোরালো ছিল খোল করতালের জগঝম্প। আরও ছোটয় বাবার সঙ্গে একবার যেন হালিশহরে না কোথায় নৌকো করে গিয়েছিল কালীকীর্তন শুনতে, আবছা মনে পড়ে। আর কবে কোথায়?
