এখানেও আজ চলছিল সেই পর্ব।
সত্য এসে দাঁড়াল সেই পর্বের পার্বণী যোগাতে।
সমস্ত দৃশ্যটার ওপর চোখ বুলিয়ে নিল সত্য।
দেখলে প্রকাণ্ড চারচৌকো ঘর, তার মেঝেটা শতরঞ্জ খেলার ছকের মত চৌকো সাদা-কালো পাথরে মোড়া। সমস্ত দেয়ালটায় একটা কালচে সবুজ রং আর নীচে থেকে হাততিনেক উঁচুতে টানা লম্বা একটা পাঁচরঙ্গা রঙের নকশার পাড় আঁকা। ঘরের মধ্যেও ছাতের নীচে ঝাড়লণ্ঠন। জানলাদরজাগুলো যৎপরোনাস্তি চওড়া আর উঁচু, তাতে পাখী-খড়খড়ির পাল্লা, আর তার পিঠ-পিঠ ফিকে নীল-রঙা কাঁচের শার্সি পাল্লা।
দেয়ালের ধারে ধারে সাজানো মেহগনী কাঠের আলমারি টেবিল, স্ট্যাণ্ড দেওয়া প্রকাণ্ড দাঁড়া আরশি, দাঁড়ানো ঘড়ি। আলমারির সামনে টেবিলে ওপর দেওয়ালের ব্র্যাকেটে নানাবিধ পুতুল খেলনা টাইমপিস ফুলদানি, উঁচুতে দেওয়ালের গায়ে অয়েল-পেন্টিং।
এত বড় ঘরটা আগাগোড়া জিনিসে বোঝাই। ঘরের ঠিক মাঝখানটায় একটা মস্ত চৌকো পালঙ্ক, পালঙ্কের গদিটা প্রায় হাতখানেক পুরু, একখানা ধপধপে সাদা চাঁদর তাতে টান টান করে পেতে গদির তলায় তলায় গোঁজা। সেই পালঙ্কের উপর চারিদিকে গির্দে তাকিয়া সাজিয়ে শ্বেত হস্তীর মত বিপুল বপুখানি নিয়ে বসে আছেন দত্তবাড়ির বড়গিন্নী।
বড়গিন্নী যে বিধবা সে কথা জানা ছিল না সত্যবতীর, কিন্তু এ কেমন বিধবা? সত্যর মনের মধ্যে প্রশ্নের প্রাবল্য। এ কি রকম সাজসজ্জা? বড়গিন্নীর পরনে দর্শকের দৃষ্টি-পীড়াকারী অতি মিহি চন্দ্রকোণার থানধুতি, আর আঁচলে বড় থোলোয় চাবি, সামনের চুল “আলবোট” ফ্যাশান, পিছনে একটি বড়ির মত খোঁপা।
বড়গিন্নীর নীচের হাত শূন্য ফাঁকা, কিন্তু উপর হাতে বোধ করি নিরেট সোনার মোটা মোটা প্লেন তাগা। গলায় গোছা করা গোট হার। কোলের কাছে রূপোর ডাবরভর্তি সাজা পান।
পালঙ্কের ধারে দাঁড়িয়ে বাজুর ওপর থেকে হাত বাড়িয়ে দাসী বা কোনও আশ্রিতা একখানি ঝালরদার পাখা দুলিয়ে দুলিয়ে বাতাস করছে। পালঙ্কের নীচে পায়ের কাছে একখানা জলচৌকির উপর সোনার মত ঝকঝকে একটা বড় পেতলের পিকদানি, আশেপাশে চাটুকারিণীর দল। অবস্থা সম্পর্কে এবং মর্যাদা হিসাবে কেউ পালঙ্কের উপরেই বড়গিন্নীর গা ঘেঁষে বসেছেন, কেউ আলগোছে একটুখানি বসেছেন পালঙ্কের কিনারায়, কেউ কেউ বা পালঙ্ক ঘিরে আশেপাশে দাঁড়িয়ে। তারে মধ্যে সধবা আছে, বিধবা আছে, বয়স্কা আছে, তরুণী আছে।
শূন্য প্রকোষ্ঠের উপরভাগে বাহুতে মোটা সোনার তাগা ভারী বিসদৃশ লাগল সত্যর, আর বিসদৃশ লাগল বিধবা মানুষের এরকম পানের ডাবর কোলে করে খাটগদিতে বসে থাকা। ইতিপূর্বে কোন বিধবাকে কখনো খাটগদিতে বসে থাকতে দেখেনি সত্য।
মনটা হঠাৎ কেমন বিমুখ হয়ে গেল। ভাবতে চেষ্টা করল বটে, মরুক গে, এই যদি কলকাতা শহরের চালচলন হয়, আমার কি? কিন্তু চেষ্টাটা ফলবতী হল না। মন সেই মোটা তাগা পরা হোট ছেলেদের পাশবালিশের মত মোটা মোটা ন্যাড়া হাত দুখানার দিকে তাকিয়ে সিঁটিয়ে রইল।
বড়গিন্নী চোখের কেমন একটা ইশারা করলেন, সঙ্গে সঙ্গে দ্রুতভঙ্গিতে একজন জলচৌকিতে বসানো সেই পিকদানিটা উঠিয়ে নিয়ে তার মুখের কাছে ধরল। বড়গিন্নী পিচ করে একটু পিক ফেলে বললেন, কে এসে দাঁড়াল র্যা? চিনতে পাচ্ছি না তো?
এগিয়ে এল পঞ্চুর মা, বলে উঠল, ওই যে আপনার সাত নম্বর বাড়ির
অ। তাই বলি চিনতে পারছি না কেন? আসে নি তো কখনো? তা এসো বাছা, একটু এগিয়ে এসো। পায়ের ধুলো দাও খানিকটা।
“পায়ের ধুলো” নামক জিনিসটা যে নিজে থেকে দেওয়া যায় এ হেন অভিনব কথা সত্য জীবনে এই প্রথম শুনল। তার জানার জগতে জানা আছে ওটা যার নেবার ইচ্ছে হয়, সে এসে মুণ্ডু হেঁট করে আহরণ করে নেয়।
কিংকর্তব্য বুঝতে না পেরে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।
কই গো দাও?
জনৈকা ধামাধারিণী তীব্রকণ্ঠে বলে ওঠেন, পার তলা থেকে এক ফোঁটা ধুলো নিয়ে এনার মাথায় দিয়ে দাও।
সত্য গম্ভীর ভাবে বলল, পায়ে ধুলো নেই।
পায়ে ধুলো নেই!
এইটা একটা কথা হল?
তা ছাড়া দত্তগিন্নীর প্রার্থিত বস্তু, তাও সোনা নয় দানা নয়, নেহাতই তুচ্ছ বস্তু! সেই বস্তুর প্রার্থনা যে এভাবে অগ্রাহ্য করা যায়, এ তো অভাবনীয় কথা!
দত্তগিন্নী গালে হাত দিয়ে কোনরকমে বিস্ময় এবং অবহেলার ভাব কমিয়ে ফেলে ব্যাঙ্গহাসি হেসে বললেন, সেই যে বলে না, অভাগা যদ্যপি চায়, সাগর শুকায়ে যায়, আমার ভাগ্যে যে দেখছি তাই হল! এক ফোঁটা পদরজও দুর্লভ হল!
সত্য অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখে সেই আকার-অবয়ব-বর্জিত মেদপিণ্ডের মুখের দিকে। এই মাংসের তালের মধ্যে থেকে বয়স উদ্ধার করা কঠিন, কিন্তু যিনি পৌত্রের অন্নপ্রাশন দিতে বসেছেন, নেহাৎ কিছু ছেলেমানুষ তিনি নন, কোন্ না সত্যর দিদিমার বয়সী! সত্যর সঙ্গে এ আবার কোন ধরনের রসিকতা তার?
ঝড়ের আগে এঁটো পাত সদৃশ একটি মহিলা বলে ওঠেন, মানুষ বুঝে কথা কইতে হয় বাছা! কইবার আগে তাকিয়ে দেখতে হয় কাকে কি বলছি!
বলা বাহুল্য সত্য নীরব।
শুধু তাঁর প্রকৃতি অনুযায়ী চোয়ালের পেশীগুলো দৃঢ় আর কঠিন হয়ে ওঠে।
সোনার হার দিয়ে নৌকতা করেছ, তুমিই না?
এবার সত্য মুখ খোলে।
নরম গলায় বলে, নৌকতা বলছেন কেন? খোকাকে যৎসামান্য কিছু আশীর্বাদ বৈ তো নয়।
