কথা হচ্ছিল এ-হদ্দ ও-হদ্দ দালানটা পার হতে হতে। তিন মুড়ো পার হলে তবে একেবারে শেষ মুড়োয় সিঁড়ি, সিঁড়ির কাছবরাবর এসে পৌঁছেও ছিল, হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে তীব্র তীক্ষ্ণ অথচ চাপা গলায় বলে ওঠে সত্য, পঞ্চুর মা!
কী হল গো? পঞ্চুর মা থতমত।
দেখ, কথা যখন কইতে জানিস না, হম্বি-দীর্ঘি জ্ঞান যখন নেই, তখন মেলা কতকগুলো কথা কইতে আসিস নে।
ওমা! কথার ভুল আবার কখন হল?
সে জ্ঞান থাকলে তো বুঝবি। তা তোকে এই পষ্ট কথায় সাবধান করে দিচ্ছি, আমাকে নিয়ে মিছে কতকগুলো বকবক করবি না। যা করতে এসেছিস তাই কর।
বাববাঃ! ধন্যি মেজাজ! মেজাজে তুমিও তো দেখছি রাজরাজড়ার থেকে কিছু কম যাও না। এদের এসব ঘরবাড়ি, বোটকখানা আর বাবুদের ঐশ্বয্যির দবৃদবা এই কলকাতা শহরে একদিন এমন রাষ্ট্র ছিল যে শুনতে পাই নাকি খাস বিলিতী সাহেবরা সুদ্ধ দেখতে আসত। আর তুমি কিনা-
হ্যাঁ, আমি ওই রকমই! ও বাবা, এ কে?
ও বাবা, এ কে? বলেই হঠাৎ থেমে দাঁড়ায় সত্য, তারপরই ঈষৎ এগিয়ে গিয়ে নিরীক্ষণ করে দেখে অনুচ্চস্বরে হেসে উঠে বলে, দেখ কাণ্ড! কে বলবে সত্যি সেপাই নয়!
পঞ্চুর মা এবার একটু গৌরব অনুভব করে, অঙ্খরি মানুষটা হয়েছে তা হলে জব্দ! স্বীকার পেয়েছে যে অবাক হয়েছে!
সিঁড়িতে উঠতে যেতেই ঠিক পাশে বন্দুক কাঁধে যে সেপাইটা খাড়া দাঁড়িয়ে আছে বীরের ভঙ্গীতে, প্রথম দিন সেটাকে দেখে পঞ্চুর মাও ঘাবড়ে গিয়ে দশ পা পিছিয়ে এসে দুগগা নাম জপ করতে শুরু করেছিল। দেখে শৈলের কি হাসি! সে রকম হাসি পঞ্চুর মার হাসতে ইচ্ছে করছে, তবে নেহাৎ নাকি মানুষটা বেখাপ্পা মেজাজী, তাই সাহস হয় না। শুধু একটু মুচকি হেসেই ক্ষান্ত হয়ে বলে, ওই দেখ, যত দেখবে তত আশ্চয্যি হবে। এখানেএক কুটুমবাড়ি তত্ত্ব নে গেছিলুম, তা সে বললে বিশ্বেস করবে না, তাদের বাগানে ফোয়ারার ধারে এমন একটা মেয়েছেলের মূর্তি বসানো আছে যে, দেখে লজ্জায় জিভ কেটে ছুটে পালাতে হয়। আমি বলে উঠেছিলুম পয্যন্ত মরণ মাগীর! এই বারবাড়িতে এমন বে-বস্তর হয়ে নাইতে এসেছে কেন? শ্বেতপাথরে গড়া তো, আমি ইনতাম করেছিলুম, বোধ হয় তোমার গে মেম-বাইজীটাইজী হবে। তা আমার কথা শুনে এ বাড়ির এক দাসী হাসতে হাসতে হাতের বারকোশখানাই ফেলে দিল। পথের ওপর মেঠাই গড়াগড়ি!
সত্য এই হাসির নাটকে অংশগ্রহণ করে না, ঈষৎ কঠিন গলায় বলে, তা সেরকম মূর্তির অভাব তো এখানেও নেই। দেখে লজ্জায় জিভ কাটতে হয়েছে তো আমাকেও। তা এই বুঝি শহুরে বড়মানুষদের বাড়ির বাহার? রুচি-পছন্দকে বলিহারি যাই! পয়সা থাকে দেবদেবীর মূর্তি গড়িয়ে প্রিতিষ্ঠি কর না! তা নয় যত অসভ্যতা! বাপ-বেটায় মায়ে-পোয়ে একসঙ্গে আনাগোনা করতে হয় না এনে দিয়ে? দেখে লজ্জা লাগে না!
পঞ্চুর মা সত্যবতীর এই অবোধ নীতিজ্ঞানের মন্তব্যে একটি অবহেলা-মিশ্রিত পরিতৃপ্তির হাসি হেসে বলে, তা এসব তো আর হেঁজিপেঁজির ঘরের কাণ্ড নয়! এ তোমার গিয়ে বিলেত থেকে সায়েব কারিগর এসে পড়েছে। এর মান ময্যেদা আলাদা।
তাই বুঝি? তা বেশ। মানময্যেদার নিদর্শনটা দেখলাম ভাল। এখন চ দিকি, দায় সেরে ফিরতে পারলে বাঁচি।
সিঁড়িতে উঠতে উঠতে পঞ্চুর মা ফিস ফিস করে বলে, বললে তুমি শুনবে না বোধ হয়, তবু আমার কত্তব্য আমি করি, বলে রাখি তোমায়, যতই তুমি বামুনের মেয়ে হও, গিন্নীকে একটু মান সম্মান দিও। জোড়হস্ত দেখাই অব্যেস তো ওনাদের, বেতিকেরম দেখলে চটে যাবে।
সত্য আর একবার থমকে দাঁড়ায়, তেমনি তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে, তবে দেখিয়ে দে জোড়হস্তটা কেমন ভাবে করতে হবে। শুধু জোড়হস্ত? না গলবস্তুর চাই? ধন্যি বটে পয়সার মহিমা! বলি এত যে ওদের স্তোত্তরপাঠ করিস, নিজের অবস্থা কিছু ফিরেছে তাতে? বাসন মেজে তো খাস। জোরহস্ত করবি ভগবানের কাছে, করবি মানুষের মতন মানুষের কাছে, পয়সার কাছে করতে যাস কেন মরতে?
সত্য বুদ্ধিমতী, তবু সত্য নেহাতই নির্বোধ। যে মরার কথা সে বলেছে, সে মরা কি একা পঞ্চুর মার? কে না যায় সে মরণে মরতে? কে না চায় সেই মৃত্যুসাগরে ডুবতে?
নইলে চক্রবর্তী-গিন্নী কেন দত্ত-গিন্নীকে অবিরত তেল দেয়? দত্তরা যে সোনার বেনে, আর সোনার বেনেরা যে জল অচল এ কথা কি জানে না চক্রবর্তী-গিন্নী?
সত্য যখন সিঁড়ি ভেঙে উঠে গিয়ে বড়গিন্নির ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল তখন চক্রবতী-গিন্নী বিগলিত বিনয়ে, মুখের চেহারায় জোড়হাতের ভঙ্গী ফুটিয়ে বলছিলেন, তাই তো বলছি মা, তোমার মতন এমন উঁচু নজর কটা লোকের আছে? ঘরে তাই বলাবলি করি, হ্যাঁ, দরাজ প্রাণটা এনেছিল বটে দত্তদের গিন্নী!
সত্য এসে দাঁড়াতেই কথা ছেদ পড়ল। ঘরের মধ্যে যারা ছিলেন তাঁদের সকলেই চোখ পড়ল তার উপর। মোসাহেবের স্ত্রীলিঙ্গ কি আমার জানা নেই, যদি কিছু থাকে তো এঁরা দত্ত-গিন্নীর তাই। সেই সক্কাল বেলা থেকে অর্থাৎ যখন থেকে দত্ত-গিন্নী সভা করে আঁকিয়ে বসেছেন, তখন থেকে এঁরা তাকে ঘিরে বসে আছেন এবং চাটুবাক্যের প্রতিযোগিতা চালাচ্ছেন।
কাজ-কর্মের দিনে এইভাবেই গুছিয়ে বসেন দত্ত-গিন্নী, অথবা বসেন আরও সব বড়লোকের গিন্নীরা, এই ধরনের চাটুকারিণী পরিবৃতা হয়ে। নিমন্ত্রিত যাঁরা আসেন, তাঁরা পাতে বসবার আগে একে একে দুইয়ে দুইয়ে এসে দেখা করে যান। ওঁরা মানুষ বুঝে ওজন করে কথা বলেন।
