পঞ্চার মা বলে তটস্থ ভাবে, এই খোকাবাবুর আশীৰ্বাদ মোক্ষদাদি! বৌদি বলে একটা টাকা নিয়ে গিয়ে আর কি হবে পঞ্চুর মা! বড়মানুষের বাড়ি, সমুদুরে পাদ্য-অর্ষি–তাই।
বাজে বাজে বকছিস কেন মিথ্যে? তীব্র স্বরে ধমকে ওঠে সত্যবতী। তীব্র তবে মৃদু।
মোক্ষদা একবার সত্যর আপাদমস্তক দেখে নেয়, একবার হারছড়া হাতে তুলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অনুভব করে। তারপর বিরস স্বরে বলে, এ হার তুমি উঠিয়ে নিয়ে যাও গো সাত নম্বরের গিন্নী। এদের ঘরের ছেলেপেলে গিল্টির গয়না পরে না।
গিল্টির গয়না!
পঞ্চুর মার বুকটা বসে যায়।
নিব্বোধ ছুঁড়ির নির্বুদ্ধি দেখে এ পর্যন্ত সে মনে মনে হাসছিল। ভাবছিল শহুরে বড়মানুষ তো দেখে নি কখনো, তাই তরাসে বেআন্দাজী একটা নৌকতা করে বসেছে। তা বসুক। পঞ্চুর মার মুখটা বড় হবে বোনঝির মনিববাড়িতে।
কিন্তু এ কী!
এ যে মুখে চুনকালি! ছি ছি, ই কি মুখ্যুমি। তুই এই দত্তবাড়িতে নিয়ে এলি গিল্টির গয়না!
প্রায় হতভম্ব হয়েই তাকিয়ে থাকে সে। কিন্তু ততক্ষণে উত্তর দিয়েছে সত্য। তীক্ষ্ণ তবে মৃদু।
তুমি বুঝি এখানে নতুন কাজে ঢুকেছ?
নতুন? আমি নতুন কাজে ঢুকেছি? মোক্ষদা আগুনের মতন গনগনিয়ে ওঠে, ওমা আমার কে গো! তুমি আজ নতুন পদান করেছ বলে মোক্ষদাও নতুন হয়ে গেল! এই বাড়িতে কাজ করতে করতে চুল পাকালাম। বলি এ প্রশ্ন যে?
প্রশ্ন তুমিই করালে বাছা! এতদিন এদের ঘরে কাজ করছ, সোনা চেনো না?
মোক্ষদা কালো মুখ আরও কালি করে বলে, তোমার কথাবাত্রা তো বড় চ্যাটাং চ্যাটাং! যা পঞ্চার মা, বড় রাণীমার কাছে নে যা। সেখেনে মুখটায় একটু লাগাম রেখে কথা কোয়ো গো ভালমানুষের মেয়ে। সে আর দাসীবাদীর এজলাশ নয়।
পঞ্চুর মা খানিক এগিয়ে ফিসফিস করে বলে, মোক্ষদার বড় দাপট মা! ওকে একটু তোয়াজ করে কথা কইতে হয়। যাই, দেখি আমার বুনঝিটা কোথায়। তাকে সঙ্গে পেলে বুকে একটু ভরসা পাই। খাস মালিনী তো সে। এই বিরাট বাড়ির যত মেয়েছেলে সব্বার খোঁপার জন্য রোজ বরাদ্দর ফুলের সাজ, রকমারি মালা, জরির ফুল, রাংতার চাঁদতারা, সব ওই আমার বুঝি…অ শৈল, কই, কই কোথায় লো–
পঞ্চুর মা ঝপ করে এগিয়ে যায়।
আর সত্যবতী দালানের একটা থামের কাছে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে তাকিয়ে তাকিয়ে বাড়ির বাহার, কারুকার্য, সাজসজ্জা!
দালানের ছাতটা কী উঁচু!
যেন কোথায় থামতে হবে ভুলে গিয়ে যথেচ্ছ উঠে গেছে উপর দিকে। সেই ছাদের নীচে ঝুলছে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড ঝাড়লণ্ঠন, সত্য গুনে ফেলল, চকমিলানো দালানের চার কোণায় চারটে, আর মাঝামাঝি একটা করে, সবসুদ্ধ আটটা ঝাড়।
আগাগোড়া দালান শ্বেতপাথরে মোড়া, শুধু কিনারায় কিনারায় কালো পাড়। থামের মাঝখানে প্রতিটি খিলেনের মাথা থেকে ঝুলছে নানা মাপের পাখীর খাঁচা, পাখীর দাঁড়। হরেক রকমের পাখী। আশ্চর্য! এত পাখী কেন? এত পাখী পুষে কি হয়?
দালানের কোণে কোণে একটা করে পাথরের নগ্ন নারীমূর্তি। সত্য তাদের দিকে তাকিয়ে চোখটা তাড়াতাড়ি ফিরিয়ে নিল। ভাবল, মাগো মেয়েগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে যেন জলজ্যান্ত! তার পর মনে মনে ফিক করে একটু হেসে ভাবল, বেচারীরা বোধ হয় রক্তমাংসেরই ছিল, হাজার লোকের চোখের সামনে অমন করে দাঁড়িয়ে থাকতে হওয়ায় লজ্জায় পাথর হয়ে গেছে।
বাইরে থেকে বাড়ির ভেতরের এতটা শোভা-সৌন্দর্য ঠিক বোঝা যায় না। ভিতরে ঢুকলে দেখে তাজ্জব বনতে হয়। ছেলেবেলায় বাবার কাছে নবাব-বাড়ির অনেক গল্প শুনেছে সত্য, আর অসীম কৌতূহলী চিত্তের অসংখ্য প্রশ্ন-শরাগাতে রামকালীকে বলতেই হত অনেক কিছু বিশদ করে। দত্তদের অন্তঃপুরে এসে সত্যর সেই ছেলেবেলায় শোনা নবাববাড়ির কথা মনে পড়ল। শোনা গল্পের সঙ্গে মনের রং আর কল্পনা মিশিয়ে নিয়ে এই ধরনের ছবিই একে রেখেছিল সত্য তার ধারণার জগতে।
তাই ভাবল, বাবা, এ যে দেখছি একেবারে নবাবী কাণ্ড!
এস গো বৌদিদি, উধ্বশ্বাসে ছুটে এল পঞ্চুর মা, এই সময় চল। এখন একটু ভিড় কম আছে।
সত্য আস্তে বলে, কাজের বাড়ি তো, কিন্তু এত বড় দালানের মানুষজনের চিহ্ন নেই কেন রে পঞ্চুর মা! বাড়ির গিন্নীটিন্নীই বা কোথায়?
ওমা শোন কথা! পঞ্চুর মা বিস্ময়ের চরম অভিব্যক্তি স্বরূপ গালে হাত দেয়।…
কি হল? মুচ্ছো গেলি যে!
তা মুচ্ছো যাওয়ার মতন কথাই যে বললে বৌদিদি। এ কী তোমার আমার মতন গরীবগুরবোর ধর যে নাতির অন্নপ্রাশনে ঠাকমা কোমর বেঁধে কাজ করে বেড়াবে? এ বাড়ির গিন্নীরা নীচের তলায় নাবে নাকি?
নীচের তলায় নামে না? সত্য হেসে ফেলে বলে, কেন, পায়ে বাত বুঝি?
বকো না বৌদিদি। হাসিও না। নীচের তলায় নাবার ওনাদের দরকার? বাহান্ন গণ্ডা দাসীবাদি মোতায়েন নেই? তা ছাড়া তোমার গে সংসারে কত অবীরে বেধবা প্রিতিপালিত হচ্ছে, তারাই সংসারের কন্না করছে। আর সরকার মশাই তো আছেনই। অবিশ্যি একেবারে নাবে না তা নয়, নাবে। পালপানে ঠাকুরদালানে আসে। তা তার জন্যে আলাদা সিঁড়ি আছে ভেতর ঘর দিয়ে। ইদিকটা হল গে, না সদর না অন্দর, দুইয়ের মাঝখান। মানুষজনের কথা বলছ? সে তোমার গিয়ে ইদিকে বড় নেই। ভিড় দেখতে চাও তো দেখ গে যাও ভেতরবাড়ির উঠোনে দালানে।… এ তো আর চালা বেঁধে ভিয়েন বসানো নয়, পেরকাণ্ড পেরকাণ্ড টানা লম্বা পাকা ভিয়েন-ঘর। তার ছেচতলায় মেছুনীরা বসেছে মাছ কুটতে। ভগবান জানেন কত মণ মাছ, তবে সে যা বঁটি, দেখে ভিরমি লেগে যায়। মদ্দ ছেলেরা পেরথমে ন্যাজা মুড়ো খণ্ড করে বাগিয়ে দিয়েছে, তারপর মেছুনীরা বসেছে ‘খামি’ করতে। দেখাব, সবই দেখাব তোমায় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে। আমি শৈলর মাসী বলে আমায় কেউ কিছু বলে না। আর বলবেই বা কেন? আমি বলব, আমার মনিব গো! গাঁ-ঘরের মানুষ, এত সব সাহেবী কেতা, শহুরে কাণ্ড তো কখনো দেখো নি, তাই
