সত্য ঈষৎ কঠিন সুরে বলে, তা বারো মাস যখন দেখতে পায় না, একদিন পেয়েই বা কি রাজ্যলাভ হবে? তুই বাসা থেকে ঘুরে আয়, আমি একাই যাব।
জানিনে বাবা! তোমার মতিগতি কেমন! বলি ছেলেরা না গেলে মাথা পিছু ছাঁদাটাও তো বেবাক লোকসান।
লাভ-লোকসানের হিসেব তোর সঙ্গে করতে বসতে পারছি না পঞ্চুর মা, কাজ সেরে বাসা থেকে ঘুরে আয়।
পঞ্চুর মা তথাপি হাল ছাড়ে না।
বলে, তা বৌদিদি, খোকারা ইস্কুল থেকে ফিরেও যেতে পারে। খ্যাঁট তো তোমার গে এই দুপুর থেকে সাঁজ সনধে অবধি চলবে?
তুই থামবি? বলে ধমক দিয়ে সরে যায় সত্য।
নবকুমার কোটের পকেটে পানের কৌটোটা ভরে নিতে নিতে বলে, ছেলেদের নিয়ে গেলেই পারতে!
কেন?
কেন আবার কি! নেমন্তন্ন–
নাঃ, বড়লোকের বাড়ি না যাওয়াই ভাল। ছেলেবুদ্ধি ছেলেমন, অত জাঁকজমক দেখে এসে শেষে নিজেদের তুচ্ছ মনে করতে শিখবে।
তোমার যত সব উদ্ভট কথা! মাথাতে আসেই যে কি করে! যাক, যাবে একটা টাকা নিয়ে যেও। সামাজিক আশীর্বাদটা দিতে হবে তো?
সত্যর জোড়া ভুরু নেচে ওঠে।
কৌতুকের হাসিতে মুখ উজ্জ্বল দেখায়।
একটা টাকা! ধুৎ! এতদিন ধরে এত সিধে শাড়ি কাপড়চোপড় পেয়ে আসছি, যদি তার শোধ দেবার সুযোগ পাচ্ছি, টাকা দিয়ে সারব কেন?
তবে কী দেবে? গিনির মালা?
নবকুমারও রহস্য করে।
গিনীর মালা? না। বেআন্দাজী কিছু করতে যাব না। এইটে দেব।
সত্য তোরঙ্গ খুলে একটা জিনিস বার করে। মুঠোয় চেপে রহস্যভরে বলে, হাত গুনে বল, কি এটা?
হাত গুনতে জানি না। আপিসের বেলা হয়ে যাচ্ছে। দেখাবে তো দেখাও।
সত্য মুঠো খুলে ধরে।
আর ঝকমক করে ওঠে সোনার জলুস।
কড়িহার একগাছা। ভরি পাঁচেকের কম নয়।
নবকুমার হেসে ফেলে বলে, ইস, তা আর নয়! প্রাণ ধরে পারবে?
নিশ্চয়। আমার প্রাণ অত হালকা নয়।
পাগলামি করো না।
পাগলামি নয়, সত্যিই দেব।
ওই অতবড় সোনার হারছড়া দিয়ে দেবে? বড়মানুষের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার সাধ!
পাল্লা নয়। সত্য গম্ভীর ভাবে বলে, মান-সম্মান রক্ষে। বলে কিনা প্রজা!
ওদের কাছে তোমার মান? ওরা হল গে লাখপতি।
তাতে আমার কি? এবার নবকুমার বোঝে, রহস্য নয়, সত্যি। ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে।
বলে, সর্বনাশা বুদ্ধি না হলে এমন কাণ্ড কেউ করতে যায় না। বলে, একটা টাকায় যেখানে মেটে, সেখানে এতবড় একগাছা সোনার হার! এ শুধু বদ্ধ পাগলেই করে। তা ছাড়া উড়নচণ্ডে হয়ে সোনাদানা নষ্ট করবার অধিকারই বা দিয়েছে কে সত্যকে? এলোকেশী যদি টের পান, রক্ষে রাখবেন?
সত্য গম্ভীর ভাবে বলে, এ তোমার মায়ের জিনিস নয়।
নয় মানে! তোমার বাবা যে কালে সালঙ্কারা কন্যে দান করেছে–
এ আমার বিয়ের সময়ের জিনিস নয়। সেসব তোমার মা সঙ্গে দেনও নি। এবারে নিত্যনন্দপুরে যেতে ছোট খোকার নাম করে পিস্ঠাকুমা দিয়েছেন।
দিয়েছেন বলেই বিলোতে হবে? না না, ওসব বদখেয়াল ছাড়।
তা হলে আমার যাওয়া হয় না।
যাওয়া হয় না! চমৎকার! বলি এত যদি টেক্কা দেওয়ার শখ, নিজের জন্যেও তাহলে হীরে মুক্তো জরি বেনারসী যোগাড় করো?
তা কেন? সত্য দৃঢ়ভাবে বলে, বামুনের মেয়ের শাখা আর লালপাড় শাড়ীই মস্ত আভরণ!
তা শেষ পর্যন্ত সেই মস্ত আভরণেই সজ্জিত হয়ে ও বাড়িতে গিয়ে হাজির হল সত্য পঞ্চুর মার সঙ্গে। একখানা নতুন কাঁসার রেকাবিতে সেই কড়িহারছড়া আর একটু ধানদুর্বো নিয়ে।
নৌকতার বহর দেখে পঞ্চুর মাও তাজ্জব হয়ে গেছল। গালে হাত দিয়ে বলেছিল, হ্যাঁগো বৌদিদি, বড় বড় কুটুমবাড়ি থেকেও তো দুটো একটা টাকাই দেয়। আর তোমার মতন এই পাড়াপড়শী প্রেজারা চারগণ্ডা কি জোর আটগণ্ডা পয়সা। একটা টাকা হল তো খুব বেশী হল। আর তুমি।
হোক হোক, চল তুই।
.
ছেলে কোন্ ঘরে? সত্য শুধোল একজনকে।
সম্ভবত সে দাসী। কারণ পঞ্চুর মা তাড়াতাড়ি আগবাড়িয়ে এসে একগাল হেসে বলে, এই যে সুখদার পিসি! নিয়ে এলাম আমাদের বৌদিদিকে। সাত নম্বরের বাড়ির
ও!
সুখদার পিসি ভুরুর ইশারায় দিকনির্দেশ করে বলে, ওই উদিককার দালানে বসাও গে!
বসবে বসবে! তা অগ্রে খোকাবাবুকে আশীর্বাদ করে
সুখদার পিসীর এতক্ষণে বোধ করি হাতের জিনিসটার প্রতি নজর পড়ে। ঈষৎ বিস্ময় এবং সমীহ মিশ্রিত স্বরে বলে, তা তবে ওপরতলায় নে যাও। মোক্ষদার কাছে আছে ছেলে।
মোক্ষদা এ বাড়ির খোদ ঝি।
গিন্নীর পরের পদটাই তার।
বাড়ির বৌ-ঝিরা পর্যন্ত তার ভয়ে তটস্থ। আর অন্য ঝিদের তো সে দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। মোক্ষদার জিম্মাতেই আছে ছেলে। কারণ ছেলের সর্বাঙ্গে আজ গয়না।
ন্যাড়া মাথা, সর্বাঙ্গে অষ্ট অলঙ্কার, আর সলমা-চুমকির-কাজ-করা ভেলভেটের পোশাকের জ্বালা, হাঁ হাঁ করে কাঁদছিল ছেলেটা।
“মুখ-দেখানি”র থালা সামনে নিয়ে ক্রন্দনরত ছেলেটাকে কোলে চেপে ধরে বসেছিল মোক্ষদা কালো মোষের মত চেহারাখানি নিয়ে।
পঞ্চুর মার সঙ্গে সত্যকে দেখেই বাজখাই গলায় বলে ওঠে, এই বুঝি তোর মনিব পঞ্চার মা? যাক পা’র ধুলো পড়ল তা হলে?
সত্যর ভুরু কুঁচকে ওঠে।
তবু সে ধীরভাবে এগিয়ে গিয়ে ধানদুর্বো নিয়ে ছেলের মাথায় দিয়ে হারসমেত রেকাবিটা নামিয়ে দেয় মুখ-দেখানির থালার কাছে। যে থালায় টাকার চাইতে আধুলি, ও আধুলির চাইতে সিকির সংখ্যাই বেশি।
সঙ্গে সঙ্গে ভুরু কুঁচকে ওঠে মোক্ষদারও। এটা কি পঞ্চার মা?
