সকল প্রেজারাই যখন যায়!
সত্য দপ্ করে জ্বলে উঠে বলে, তা আমি তো আর ওনাদের প্রজা নই পঞ্চুর মা! ভাড়া দিই, থাকি!
তা সে একই কথা! পঞ্চুর মা বিগলিত স্বরে বলে,খাজনা দিলে প্রজা, ভাড়া দিলে ভাড়াটে। গিন্নীর যেন একটু গোসা-গোসা ভাব দেখলাম, তাই বলছি। মানে বড়মানুষ তো? রাতদিন তোয়াজ পাচ্ছে, তাতেই অঙ্খর ভাব। মনে করে, সাত নম্বর কেন তোয়াজ করে গেল না? একদিন গেলেই ও গোসাটা কাটে।
আমার সময় কোথা? সত্য গম্ভীর ভাবে বলে।
ওমা শোন কথা! পঞ্চুর মা বিস্ময় রাখবার জায়গা পায় না, এই গলির এপার ওপার, একটু একবার যেতে তোমার সময় হবে না? তা হলে বলি বৌদিদি, অঙ্খার তোমারও কম নয়।
তা হলে বুঝেছিস? হেসে ফেলে সত্য।
বুঝেছি। বুঝেই আছি। তবে কিনা তোমার হিতের জন্যই বলছি। জলে যখন বাস, কুমীরের সঙ্গে ভাব রাখাই ভাল।
দেখ পঞ্চুর মা, ওসব তোয়াজ করা-টরা আমাকে দিয়ে হবে না। তা সে কুমীরের কামড় খেতে হয় তাও ভাল।
আহা-হা, তা কেন! কামড়ের কথা হচ্ছে না। তোমরা হলে গে জগতের সেরা, উঁচু বামুন। তোমাদের মান্যির কাছে কি আর পয়সার মান্যি? তবে কিনা কালটা কলি, এই আর কি। কলি কালে পয়সাই মোক্ষ। নইলে এই এগারো নম্বর বাসার চক্কোত্তি-গিন্নী অমন করে দত্ত-গিন্নীর পায়ে তেল দেয়?
যাক পঞ্চুর মা, ওসব কথা তুলিস নে। আমার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। বড়মানুষের বাড়ি যাওয়া আমার পোষাবে না, এই হচ্ছে সাদা বাংলা। তা তাতে এখানের বাস ওঠাতে হয় তাও ভাল।
পঞ্চুর মা মানুষটা ভাল। লাগানে-ভাঙানে নয়। আর বোধ করি সত্যর এই তেজস্বিতাকে সে সমীহ করে। তাই গিয়ে বড় বাড়ির গিন্নীর কানে তোলে না কথাটা। নইলে ও-বাড়িতে তো আর নিত্য গতায়াত।
কারণ ঝি-খেটে খেলেও পঞ্চুর মা মালির মেয়ে। তার বোনঝি ওই বড় বাড়িতে ফুলের যোগানদার, বোনঝির সেখানে অশেষ প্রতিপত্তি। পঞ্চুর মা সেই সুবাদে দৈনিক জলপানিটি বরাদ্দ করে নিয়েছে ও বাড়িতে
আর রাজ্যের ঝি আর মালিনী তাতিনী নিয়েই তো আসর গিন্নীর।
তাই সে ভাবে, একটা দিন গেলে যদি বড় বাড়ির গিন্নীর মনটা প্রসন্ন হয়, গেলেই বা। কিন্তু সত্য উড়িয়ে দেয়।
বলে, বড়মানুষের বাড়ির চৌকাঠ ডিঙোতে আছে? বাপ!
তবু সত্যকে একদিন বড় বাড়ির চৌকাঠ ডিঙোতে হল।
ওদের রাঁধুনী বামনী আর গিন্নীর খাস ঝি এসে কর্তার নাতির মুখে-ভাতে’র নিমন্ত্রণ করে গেল। নতুন কাঁসার রেকাবিতে চারজোড়া সন্দেশ, আর নতুন পেতলের ঘটিতে সেরটাক তেল দাওয়ায় নামিয়ে দিয়ে বলল, নাতির মুখের পেসাদ নেমন্তন্ন করে গেলাম। বাড়িসুদ্ধ সব যাওয়া চাই। বাড়ির যেন উনুন না জ্বলে।
সত্য মৃদু গম্ভীর ভাবে বলে, কবে অন্নপ্রাশন?
এই তোমার গে পরশু।
সত্য আরও গম্ভীর ভাবে বলে, তবে? ছুটির দিন তো না? বাবুকে দশটায় আপিস যেতে হয়। উনুন না জ্বললে চলবে কেন? অত সকাল সকাল তো আর যজ্ঞিবাড়িতে ভাত মিলবে না?
তা জানি না। রাধুনী খরখরে গলায় বলে ওঠে, পাড়ার কারুর ঘরে উনুনের ধোয়া উঠতে দেখলে গিন্নী আর রক্ষে রাখবে না, এই হচ্ছে সংবাদ।
তা হলে বাবুকে সেদিন পান্তা খেতে হবে! সত্য নিশ্চল দাঁড়িয়ে বলে।
আর রাঁধুনী বামনী গালে হাত দিয়ে থ’ হয়ে যায়। তারপর খরখরিয়ে ওঠে, ওমা এ যে সব্বনেশে মেয়ে গো! রাণীমা তো ঠিকই বলেছে, আর সকল বাড়ি শুধু ঝি গেলেই বোধ হয় হত, সাত নম্বরে বামুনদি তুমি সঙ্গে যেও। ওনার বড় দেমাক, কি জানি যদি শুদ্দ্ররের মুখের নেমন্তন্ন না নেন।
তা ভাল! চোখে না দেখেও মানুষ চিনতে পারেন! তোমাদের রাণীমা তো খুব গুণী!
রাঁধুনী বোধ করি কথাটার নিহিতার্থ হৃদয়ঙ্গম করতে না পেরেই বলে, গুণী, সে কথা আর বলতে! একবার কেন একশোবার! গেলেই জানতে পারবে কি দয়া-দাক্ষিণ্যে! আর রূপও তেমনি। যেন জগদ্ধাত্রী প্রিতিমা!
গিন্নীর খাসদাসী সঙ্গে।
কাজেই জানা কথা এই যে স্ততিগান একেবারে ব্যর্থ হবে না।
সত্য বলে, তা দাঁড়াও। ঘটিটা রেকাবটা নিয়ে যাও।
শুনে ঝি বামনী দুজনেই হেসে ওঠে, ওমা! বলে কি গো? নিয়ে যাব কি গো! ও তো সামাজিক বিলোনোর জন্যে। একেবারে ব্যাপারীদের কাছে বায়না দিয়ে এক মাপের এক গড়নের অমন হাজারখানেক আনানো হয়েছে। এসব বুঝি দেখনি কখনো?
সত্য আর দ্বিরুক্তি না করে জিনিস দুটো ঘরে উঠিয়ে রাখে। এই হাসির শব্দ যেন ছুরির মত বিধতে থাকে।
দেখবে না কেন?
রামকালী চাটুয্যের মেয়ে সত্য অনেক কিছুই দেখেছে। বাসন বিলোনোও দেখেছে বৈকি। কিন্তু সেটা কখন কিভাবে বিলানো হয় তা তার জানা ছিল না।
ভাবল, কি জ্বালা! যদি বা পাঁচ টাকায় এমন মনের মত বাসাটি পাওয়া গেল, তার সঙ্গে জুটল এই পিঁপড়ের কামড়!
এতদিন ওদের বাড়িতে না গিয়ে চলেছে, আর চলল না দেখা যাচ্ছে। সামাজিক নেমন্তন্ন বলে কথা।
.
গাড়ি-পালকির পথ নয়, তবু এসব কাজে পালকিতে চেপে যাওয়াই রেওয়াজ। পঞ্চুর মা বলে, আমি এই বাসন কখানা মেজে ফেলে বাসা থেকে কাঁচা কাপড় পরে আসছি বৌদিদি, তুমি সাজগোজ করে নাও ততক্ষণ, আর খোকাঁদেরও পোশাক-আশাক পরিয়ে–
খোকারা তো এখন ইস্কুলে চলল। বলল সত্যবতী।
ওমা, সে কি কথা! নেমন্তন্ন খাবে না ওরা?
ইস্কুল কামাই করে?
পঞ্চুর মা অবাক হয়ে বলে একদিন তোমার ইস্কুল কামাইটা এমন মারাত্মক হল বৌদিদি? পাড়াসুদ্ধ ছেলে কেউ আজ ইস্কুলে যাবে নাকি? বলে বিশ দিন থেকে দিন গুনছে সবাই। বড়মানুষের বাড়ির নেমন্তন্ন, কত ভালমন্দ সামগ্রীর আয়োজন, বারো মেসে সংসারে তোমার গে সেসব চোখেও দেখতে পায় না কেউ_
