সত্য বলেছিল, এখন তুমি নানা কারণেই অন্ধ ঠাকুরপো, তাই জ্ঞানগম্যি নেই। পরে বুঝবে। তবে এ সম্পর্কে অধিক কথায় আর কাজ নেই। কুকথা হচ্ছে ছারপোকার বংশ, একটা থেকে একশোটা ছানা জন্মায়। ওকে মূলেই ধ্বংস করে দেওয়া বুদ্ধির কাজ।
তারপর সেই ভবতোষ মাস্টারের কাছে মেস খুঁজে দেওয়ার প্রস্তাব।
কিন্তু নিতাইয়ের অনুযোগ কি বাস্তবিকই অমূলক?
নিছক অমূলক বললে ভুল বলা হবে।
ভবতোষ মাস্টারের চোখের শ্রদ্ধা সমীহ আর স্নেহভরা মুগ্ধ বিহ্বল দৃষ্টি যে আত্মহারা হয়ে সত্যবতীর আনত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, এ কি সত্যবতীর অনুভবের মধ্যে ধরা পড়ে না?
পড়ে। পাথরের দেবতাও ভক্তের নিবেদন বোঝে।
তবু সত্যবতী গ্রাহ্য করে না। সত্যবতী বোঝে এ দৃষ্টির মধ্যে অনিষ্টের আশঙ্কা নেই। সত্যবতী জানে এ দৃষ্টি সত্যবতীর কেশাগ্রেরও ক্ষতি করতে পারবে না। যেমন পারবে না নিতাইয়ের ঈর্ষাকাতর জ্বালাভরা দৃষ্টি। দুটোকেই সমান অগ্রাহ্য করেছিল সত্যবতী। কিন্তু নিতাইয়ের এই স্পষ্টাস্পষ্টি জ্বালা প্রকাশে বিবেচনার পথ নিল সে। কে জানে কোনদিন যদি নির্বোধ নবকুমারের কানে তুলে বসে নিতাই এই নীচ সন্দেহের কথাটা!
যদি মাস্টারমশাইয়ের কানে ওঠে?
ছি ছি!
উনি স্নেহ করেন।
উনি শুরু।
উনি নিজেও জানেন না, এর মধ্যে কোন দোষ আছে। তাই ওঁর নিজেরও ক্ষতি হচ্ছে না।
কিন্তু নিতাইয়ের কথা স্বতন্ত্র। নিতাইয়ের মধ্যে যা আছে, সেটা নির্ভেজাল শ্রদ্ধা নয়।
সে আপনি আপনার ক্ষতি করতে পারে।
তার জন্যে ব্যবস্থার দরকার।
তাই নবকুমারের কাছে দৃঢ়স্বরে বলতে পারে সত্যবতী, আমার দ্বারা কোন অবিবেচনার কাজ হবে না, কোন ছোট কাজ হবে না, এ বিশ্বাস রেখো।
.
নিতাই চলে যেতেই নবকুমার বলতে শুরু করল, বাড়িটা যেন গিলে খেতে আসছে! বলতে লাগল, চার-চারখানা ঘরে দরকার কি?
ওই শেকল-বন্ধ ঘরটা যে ওর বুকে শেলের মত বিধছে সেটা বুঝতে পারে সত্য। তাই একদিন নরম গলায় বলে, আর একটা বাসা দেখলে হয় না?
কেন, আর একটা বাসার কি দরকার?
নবকুমার খাপপা হয়ে ওঠে।
দরকার আর কি, একটু হাওয়া বদল! তা ছাড়া এ বাসার ভাড়াটাও তো কম নয়। এদিকে বাজার দিন দিন অগ্নিমূল্য হচ্ছে। ওদিকে ছেলেদের বইখাতা ইস্কুলের মাইনে বাড়ছে।
তা সে তো তোমার পক্ষে ভালই। একটা মানুষ দু বেলা দু মুঠো ভাতের বদলে একমুঠো করে টাকা ধরে দিচ্ছিল–
সত্য বিনাবাক্যে উঠে গিয়ে গিয়েছিল। আর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিল, ঠিক আছে, আর নবকুমারকেও বলা নয়, ভবতোষ মাস্টারকে অনুরোধ জানানো নয়, নিজেই হাল ধরবে সে। ঝিকে দিয়ে বাসা যোগাড় করবে। ঝি পাঁচবাড়ি ঘোরে, অনেক সন্ধান রাখে।
তা সত্যর হিসেব ভুল হয় নি।
মুক্তারামবাবু স্ট্রীটের এ বাসা ঝি পঞ্চুর মা-ই যোগাড় করে দিয়েছে। বাড়িওয়ালা মস্ত বড়লোক, বনেদী ঘর। আগে যখন আরো বোলবোলাও ছিল, তখন আমলা-গোমস্তাদের জন্যেই ছোট ছোট অনেক বাসা বানিয়ে দিয়েছিল। এখন কর্মচারীর সংখ্যা কম, তাই দু-পাঁচখানা বাসায় ভাড়া বসিয়েছে।
তারই একখানার সন্ধান এনে দিল পঞ্চুর মা। নবকুমার বাসা দেখে এসে সন্তোষ প্রকাশ না করে পারল না। কারণ ছোট হলেও বাসাটা ভাল। রাস্তার ধার। ভবতোষ মাস্টার ক্ষুণস্বরে বললেন, বাসা বদলের দরকার ছিল, আমায় জানাও নি তো নবকুমার?
নবকুমার বাড়ির মধ্যে’র শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বলল, আজ্ঞে আপনার ওপর আর কত বোঝা চাপাব? আমাদের জন্যে তো আপনার কাজের অন্ত নেই। এটা যখন ঝি’র দ্বারা হয়ে গেল–
আমার বাসা থেকে একটু দূর হয় গেল, এই আর কি! ভবতোষ নিঃশ্বাস ফেললেন।
তবু বাসা বদল হল।
আর সত্য আর একটু স্বাবলম্বী হয়ে উঠল। ফি-হাত মাস্টারমশাইয়ের মুখাপেক্ষিতার অভ্যাসটা কাটাতে শুরু করল।
তবে এ বাড়ির একটা অসুবিধে, বাড়িওলারা ধনী হলেও জাতে ছোট। কাজেই বামুন-ভক্তিটা প্রবল। যখন তখন পালাপার্বণ হলেই বামুনবাড়ি সিধে পাঠায় তারা, বামুনের মেয়ের জন্যে পান সুপুরি মিষ্টি, লালপাড় শাড়ীর উপটৌকন পাঠায়।
ফেরত দেওয়াও চলে না, কেবল নেওয়াও লজ্জার।
নবকুমার অবশ্য লজ্জায় বলে না। বলে, এতে তোমার এত কিন্তু কিসের? কথায় আছে লাখ টাকায় মুন ভিখিরি! তা ছাড়া ওরা হল গে সোনার বেনে, বামুনকে দান করে পুণ্যি সঞ্চয় করছে।
তা হোক। সত্য ঝঙ্কার দেয়, আমরা তো আর পরিবর্তে কিছু দিতে পারছি না? নিতে আমার মাথা কাটা যায়।
তোমার সবই উল্টো। বলি পরিবর্তে তো তুমি আশীর্বাদ দিচ্ছ?
আশীর্বাদ!
হি হি করে হেসে ওঠে সত্য, আমার আশীর্বাদের অপেক্ষাতেই যে ছিল এত দিন! আর ওদের ওই রাজ্যিপাট আমার আশীর্বাদেই হয়েছে! যাই বল, এ একটা বিপদ হয়েছে।
লোকের যা প্রার্থনার, তোমার তাতেই বিপদ, আর লোকের যাতে ভয়, তোমার তাতেই আহাদ, এই তো দেখলাম চিরটাকাল। কোন বিধাতা যে গড়েছিল তোমায় তাই ভাবি।
এই ধরনের কথা প্রায়ই হয়।
আবার মাঝে মাঝে পঞ্চুর মা বলে, বড় বাড়ির গিন্নী পেরায় আমাকে বলে, হ্যাঁলা, সবাই আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে, কই সাত নম্বর বাসার গিন্নী তো কই আসে না একদিনও? আমি বলি, ও রাণীমা, গিন্নী কোথায়? সে নেহাৎ ছেলেমানুষ বৌটি। তা যাই বল বাপু, তোমার এক আধদিন যাওয়া কোত্তব্য। সকল প্রেজারাই যখন যায়–
