প্রথম প্রথম সত্য অভিমানে পাথর হয়ে যেত। আর সেই পাথর-মূর্তি অসহ হওয়ায় শেষ অবধি নবকুমারকেই মিটমাট করতে হত। বলতে হত, ঘাট হয়েছে বাবা, শতেকবার ঘাট হয়েছে। এই নাক মলছি, কান মলছি, আর যদি ও কথা মুখে আনি। ঠাট্টার কথা বুঝতে পার না, এই এক আশ্চর্য!
তা ঠাট্টা বলেই বুঝিয়ে বুঝিয়ে ক্রমশ জিনিসটাকে গা-সহা করে এনেছিল নবকুমার। এখন এমন হয়েছে যে ওই খোঁটাটাকে আর গ্রাহ্যের মধ্যেই আনে না সত্য। সেদিনও তাই আনে নি।
শুধু ভ্রুকুটি করে বলেছিল, পা তুলে আছে কি নেই, সেটা তো যতক্ষণ না অন্তর্যামী হচ্ছ টের পাবে না। তবে মানুষের সংসারেও নেয্য হিসেব একটা আছে। বিয়েটা করে লোকে ঘরকন্না করবার জন্যেই।
আরো খানিক বাক্যব্যয় করেছিল নবকুমার। অনেকটা একতরফা। তবু তার মনে আশা ছিল শেষ পর্যন্ত নিতাইয়ের যাওয়ার কথাটা হাওয়ায় ভাসবে। কিন্তু দেখল ক্রমশই সেটা পাকতে থাকল।
কেউই কিছু বলে না, তবু যেন কোথায় কি হতে থাকে। খেতে বসে দু বন্ধুতে কথাও হয় না তা নয়। কিন্তু সে যেন শুকনো-শুকনো আঠা ছাড়া। অথচ নিতাইকে স্পষ্টাস্পষ্টি জিজ্ঞেস করতেও সাহসে কুলোয় না।
সত্যকেও না।
কিন্তু আজ এই দুঃখের আবেগে ওর সাহস জেগে উঠল। ওখান থেকে তাড়াতাড়ি সরে এসে তীব্রস্বরে বলে ফেলল, বিনি দোষে নিরপরাধ মানুষটাকে বাড়ি থেকে বিদেয় করে দিতে মনটা একবার কাঁদলও না? ধন্যি মেয়েমানুষ বটে!
সত্য তখন প্রদীপের সামনে হেঁটমুণ্ডে বসে একখানা বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছিল, স্বামীর এই মন্তব্যে একবার মাত্র মাথাটা তুলল, তার পর নীরবেই আবার মাথা নীচু করল।
নবকুমারের তখন ভিতরে আলোড়ন চলেছে, তাই সবই খারাপ লাগছে। অতএব ওই বইয়ের পাতা ওল্টানোতেও গা জ্বলে গেল তার। বলল, মা যা বলে ঠিকই বলে। মেয়েছেলের অধিক বিদ্যে সর্বনাশের মূল!
সত্য চট করে বইটা মুড়ে ফেলে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, মাতৃবাক্য অবিশ্যিই বেদবাক্য। অতএব আমিই বসে বসে তোমার সর্বনাশ সাধন করছি। তা তার তো আর চারা নেই। বিদ্যেটা তো আর ঘটিবাটি নয় যে, অসুবিধে ঘটাচ্ছে বলে সরিয়ে রাখব। কিন্তু বিনাদোষে কিনা, আর মনটা কাঁদছে কিনা, সে সংবাদ তুমি সঠিক পেয়েছ?
মন! হু! পাষাণেও বরং প্রাণ আছে, তোমার মধ্যে নেই।
বন্ধুকে যে নবকুমার কতখানিটা ভালবাসে তা সত্যর অজানা নয়, তাই এত বড় দোষারোপেও বিচলিত হয় না সে। বোঝে, রাগে দুঃখে বলে ফেলেছে। আর সেটাই তো স্বভাব নবকুমারের। রাগের মাথায় কড়া কথা বলে বসে, আর রাগ ভাঙলে খোশামোদ করতে বসে।
তাই সত্য অবিচলিত ভাবে বলে, তা পাষাণীই যখন, তখন মন কাঁদার কথা উঠছে কেন? তবে বিনাদোষে, এ কথা ভাববার হেতু? যে মানুষ গুরুর নামে কলঙ্ক দিতে পারে, তাকে আমি অন্তত নিরপরাধী বলতে পারব না।
গুরুর নামে!
নবকুমার স্তম্ভিত ভাবে বলে, তার মানে?
মানে তোমায় বোঝাতে পারব না। মেয়েমানুষের বাড়া পেট-আলগা মানুষ তুমি, এখুনি জগৎসংসার সকল বাত্রা জেনে ফেলবে। তবে এই বিশ্বাসটুকু রেখো আমার ওপর, অন্যায় কাজ আমাকে দিয়ে হবে না। অবিবেচনার কাজও না।
.
না, এর বেশী নবকুমার জানতে পারে নি।
পারবার কথাও নয়।
বুদ্ধি দিয়ে বুঝে ফেলবে এত ক্ষমতা তার নেই। আর সত্য তো হাত জোড় করে বলেছে, আমায় আর কিছু জিজ্ঞেস করো না। আমি সে কথা মুখে আনতে পারব না।
না, সত্যিই পারবে না।
মুখে আনবার কথা নয়।
তবু নিতাই একদিন মুখে এনেছিল। ভবতোষ মাস্টার সত্যকে পড়া দিয়ে চলে যাওয়া মাত্র বলে উঠেছিল, সম্পৰ্কটা মাস্টার বানিয়েছে ভাল! গুরু-শিষ্য! কিন্তু যতক্ষণ পড়া বুঝোয় ততক্ষণ তো গুরু বসে বসে শিষ্যকে চোখ দিয়ে গিলতে থাকে।
সত্য তীব্র স্বরে বলেছিল, ঠাকুরপো!
তা রাগ করলে আর কি হবে? যা হক কথা তাই বলছি। মাস্টার মশাইয়ের রীত-চরিত্তির আমার আর আজকাল ভাল মনে হয় না। ছুতোয়-নাতায় হরঘড়ি এ বাসায় আসার বহর দেখে বুঝতে পারেন না? নিছক হিত করতে আসা নয়, কারণটা অন্য। আমি এই ভবিষ্যদ্বাণী করছি, সময়ে সাবধান না হলে ওই মাস্টার হতে একদিন বিপদ আসবে।
সত্য কঠিন গলায় প্রশ্ন করেছিল, কথাই যদি তুললে ঠাকুরপো তো বলি–সে বিপদ যে তোমার দ্বারাই আসবে না, তার নিশ্চয়তা কি?
আমার দ্বারা! আমার দ্বারা মানে?
নিতাই সিদুরে-আমের মত লালচে হয়ে ওঠে।
কিন্তু সত্য কঠোরা।
মানে ঘরে গিয়ে বোঝ গে। জিজ্ঞেস করো গে আপনার মনকে। কে কাকে চোখ দিয়ে গিলছে, সে খবর তোমার চোখে পড়ে কেমন করে তাই তোমায় শুধুই আমি!
পড়বে না? নিতাই উত্তেজিত হয়, নবর মতন কানা মানুষ ছাড়া সবাইয়ের চোখেই পড়ে।
নিজে চোখ না ফেললে পড়ে না, এই আমারও সাদা বাংলা। কিন্তু এমন মন্দ কথা যখন তোমার মনে উঠতে পারে ঠাকুরপো, তখন আমার মনে হয় আর একত্র থাকা ঠিক নয়।
ঠিক নয়! নিতাই অবাক হয়ে বলে, একত্র থাকা ঠিক নয়?
না।
নিতাই ফুঁসে উঠে বলেছিল, আমাকে সরালেই তোমাদের বিপদ সরবে?
বিপদ!
সত্য সহসা হেসে উঠেছিল, আমার আবার বিপদ কিসের? আগুনে যদি হাত দিতে আসে ঠাকুরপো, বিপদটা আগুনের হয়, না হাতের হয়? রামায়ণ মহাভারতের কাহিনীও কি কখনো শোন নি? সতীনারীর উপাখ্যান? তোমায় যে সরে যেতে বলছি, সে তোমারই ভালর জন্যে।
নিতাই আর কোনও কথা খুঁজে না পেয়ে বলেছিল, চমৎকার! বিচারটা ভাল!
