বইয়ের যোগানদার ভবতোষ, পাঠশিক্ষকও ভবতোষ। নিয়মিত নয়, মাঝে মাঝে দুরূহ জায়গাগুলো বুঝে নিত সত্য। ঘরের মধ্যে উঁচু চৌকিতে বসতেন মাস্টার, চৌকির সামনে মাটিতে সত্যর দুই ছেলে বসত মাদুরে নিজেদের বই খাতা নিয়ে, আর সত্য মাদুর থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে মেজেয় বসত মাথায় কাপড় টেনে।
কিন্তু কথা চিরদিনই স্পষ্ট সত্যর।
তাই দূরত্ব সত্ত্বেও তার প্রশ্ন বুঝতে অসুবিধে হত না ভবতোষের।
এই পড়াশোনার মাঝখানে হঠাৎ একদিন সত্য বলে বসল, আমাদের জন্যে অনেক তো করলেন আপনি, আর একটু কষ্ট করতে হবে।
ভবতোষ বিচলিত হয়ে বললেন, কষ্ট কিসের, কষ্ট মানে?
কষ্ট তো বটেই। এযাবৎ অনেক কষ্ট করলেন। সে যা হোক, আপনি পিতৃতুল্য, আমি আপনার মেয়ের মত, তাই কিন্তু আমি হচ্ছি না
সত্যর বড় ছেলে লক্ষ্য করল, হঠাৎ যেন মাস্টার মশাইয়ের মুখটা কেমন বদলে গেল। কি রকম যেন ভয়-পাওয়া ভয়-পাওয়া মুখ হয়ে গেল।
সত্যর অবশ্য মাথায় ঘোমটা, মুখী নীচু।
ভবতোষ অস্ফুটে কি যেন বললেন। সত্য পরিষ্কার গলায় উত্তর দিল, হ্যাঁ, সেই কথাই বলছি– কিন্তু আমি হচ্ছি না। আপনি কায়েত ঠাকুরপোর জন্যে অন্য একটা ব্যবস্থা করে দিন। এখেনে তো শুনছি মেস-ঘর না কি যেন আছে, মাথাপিছু খাই-খরচা দিয়ে বেটাছেলেরা এক জোট হয়ে থেকে আপিস-কাছারি করে।
কায়েত ঠাকুরপো অর্থে নিতাই।
সামনে শুধু “ঠাকুরপো” বললেও আড়ালে তার সম্পর্কে অপরকে বোঝাতে কায়েত ঠাকুরপো বলেই উল্লেখ করে সত্যবতী। কিন্তু সেটা কেবলমাত্র বোঝাতেই।
নবকুমারের সঙ্গে তা ঠিক ভাইয়ের মতই ছিল সে এ বাড়িতে, আর নেহাত ভাতের ছোঁয়াটা বাদে অত বামুন-কায়েতের ভেদাভেদও ছিল না সত্যর কাছে। খুব সৌহার্দ্যই তো ছিল।
হঠাৎ কি হল?
ভবতোষ তাই অন্যমনস্ক ভাবে বললেন, সে তো আছে।
হ্যাঁ, সেই কথাই বলছি। ওনার থাকার জন্যে ব্যবস্থা একটা আপনাকে নিয্যসই করতে হবে।
ভবতোষ মাথা চুলকে বলেন, তা না হয় দিলাম, কিন্তু হঠাৎ? মানে সে কিছু বলেছে? ইয়ে এখানে থাকবে না বলে–
না, তিনি কিছু বলেন নি, সত্য দৃঢ় গলায় বলে, আমিই বলছি। আর এটা আপনাকে করতেই হবে।
ভবতোষ মুহূর্ত কয়েক চুপ করে থেকে আস্তে বলেন, তুমি যখন বলছ বৌমা; অবশ্যই ন্যায্য কোন কারণ আছে। তবু মানে বুঝতে পারছি না বলে কেমন যেন চিন্তায় পড়ছি।
এবার আর উত্তর এল না সত্যর দিক থেকে।
ভবতোষ উঠে দাঁড়ালেন।
তারপর বললেন, নবকুমারেরও এই মত তো?
সত্য বলল, ঘর-সংসারের সুবিধে-অসুবিধেয় বেটাছেলের মতামত চলে না। ব্যবস্থা হয়ে গেলে বললেই হবে।
ভবতোষ বুঝলেন। বুঝলেন কোন একটা গোলমেলে ব্যাপার ঘটেছে। কিন্তু নিতাই ছেলেটা তো–হল কী!
আচ্ছা হঠাৎ বলা-কওয়া নেই, নিতাইকে তিনি বলবেন কি করে, ওহে তোমার জন্যে মেসের ঘর যোগাড় করেছি, কাল থেকে থাকো গে যাও সেখানে!
সে কথা বলেও ফেললেন।
নিতাইকে আগে একটু না জানালে–
হ্যাঁ, সে একটা চিন্তা বটে। কিন্তু কি আর হবে? বলতেই যখন হবে, সে ব্যবস্থা আমিই করব।
ভবতোষ অগত্যাই বিদায় নিলেন।
বড় ছেলে বলল, কাকাবাবু কেন এখানে থাকবেন না মা?
সত্য গম্ভীরভাবে বলল, ছেলেমানুষ সব কথায় থাকতে নেই খোকা। যখন যা হবে দেখতেই পাবে। কেন, কি বিত্তান্ত অত ভাবতে বসো না।
.
তা তারা শুধু দেখতেই পেল।
দেখল বাবা কোথায় যেন পালিয়ে থাকল, মা চুপচাপ দরজা ধরে দাঁড়িয়ে রইল আর নিতাইকাকা নিজের তোরঙ্গ আর বিছানা নিয়ে আস্তে আস্তে একটা ভাড়াটে ঘোড়ার গাড়িতে গিয়ে উঠল।
পরিস্থিতিটি এমন থমথমে যে, একটিও প্রশ্ন করতে সাহস হল না তাদের।
তা সাহস প্রথমটায় নবকুমারেরও হয় নি। তাই সে সকাল থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল। অনেক রাত্রে বাড়ি ফিরে প্রায় চোরের মত চুপি চুপি তাকিয়ে দেখল নিতাইয়ের ঘরটার দিকে। দেখল দরজায় শেকল তোলা।
বুকটা ধক করে উঠল।
মনে হল তার অন্তর নামক জায়গাটাতে যেন অমনি একটা শেকল তোলা দরজা দাঁড়িয়ে রয়েছে মুখ গম্ভীর করে। সে দরজা আর বুঝি কোনদিন খুলবে না। সেই বন্ধ ঘরের মধ্যে রয়ে গেল নবকুমারের অনেকখানিটা সুখ, অনেকখানিটা আনন্দ।
ঈশ্বর জানেন সত্যর হঠাৎ কেন এই খেয়াল!
নিতাইয়ের কোন ব্যবহারে যে সে রাগ করেছে তাও তো মনে হচ্ছে না। নিজের চক্ষে কাল দেখেছে নবকুমার, রান্নাঘরে নিতাইয়ের ভাত বাড়তে বসে টপটপ করে চোখের জল পড়ছে সত্যর। আর এও লক্ষ্য করেছে নিতাই যা যা খেতে ভালবাসে, সেই সবই আজ কদিন ধরে রাধছে সে।
তবে?
হিসেবটা মিলছে কোন্খানে?
তবে কি খরচপত্রের কথা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে সত্য?
কিন্তু তাতেই বা প্রশ্নের উত্তর কোথায়? নিতাই তো সংসার-খরচের ভাগ না দিয়ে ছাড়ে না।
গোলকধাঁধার মধ্যে কাটাতে হয়েছে নবকুমারকে।
সত্যকে প্রশ্ন করে সদুত্তর জোটে নি। সে বলেছে, এ তো ভাল ব্যবস্থাই হচ্ছে। দু’ বেলা বাড়া ভাতটা পেলে ঠাকুরপোর আর বৌ এনে বাসা করার চেষ্টা থাকবে না।
নবকুমার বেঁজে উঠে বলেছিল, ওর পরিবারের কথা ও বুঝবে। সে চেষ্টা যে করতেই হবে তার কোন মানে আছে? গা-সুদ্ধ বৌ কি তোমার মতন বাসায় আসার জন্যে পা তুলে বসে আছে?
সত্য অবশ্য এ কথায় মর্মাহত হয়ে নিথর হয়ে যায় নি। প্রথম প্রথম যেমন হত। কারণ যে কোন বিষয়ে সামান্যতম অসুবিধে বা অপছন্দ হলেই সত্যের “বাসায় আসার” বাসনা নিয়ে খোটা দেওয়ার অভ্যাস নবকুমারের গোড়া থেকেই। বহুবিধ স্বাচ্ছন্দ্য-সুখের আস্বাদ পেলেও এবং বহুবার মনে মনে সত্যকে তারিফ করলেও, ওটা যেন ওর একটা মুদ্রাদোষের মতই।
