আপনি আর কত কষ্ট করবেন? সত্য বলে ওঠে।
আর সঙ্গে সঙ্গে চমকে ওঠে নবকুমার।
দরজার শেকল নাড়া পর্যায়টা কখন পার হল? এভাবে স্পষ্টাস্পষ্টি কথা! অবাক কাণ্ড!
ভবতোষ বলেন, আমাকে যদি তোমরা পর ভাবো নবকুমার, তবেই কুণ্ঠা বোধ করবে। আমি কিন্তু তোমাদের পর ভাবছি না।
না না, সে কি? পর মানে?
নবকুমার কথার খেই হারায়। এবং বোধ করি আপনি ভাবার প্রমাণ দেখাতেই তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, আমি তো এই ভাবছিলাম আপনার সঙ্গে হাটটা ঘুরে আসি। কোন্ কোন্ বারে হাট বসে এখানে?
ভবতোষ হাসেন।
বলেন, কলকাতায় রোজই হাট।
ও! প্রত্যেক দিন বাজার বসে?
তা বসে। একটা নয়, অনেক বাজার। তা আজ আর তোমাকে যেতে হবে না, আমিই ব্যবস্থা করছি। তুমি বরং বাড়ির কাজে, মানে কি সুবিধে অসুবিধে–
বাড়ির কাজে কিছু আটকাবে না–, সত্যর ধীর গম্ভীর কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হয়। তার পর ঘরের মধ্যে থেকে একটা ধামা বার করে এনে নবকুমারের সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে যায় সত্য।
.
এমনি করেই আরম্ভ হয় সত্যর শহরে সংসার।
নিজের সংসার।
কদিন পরে নিতাই আসে।
নবকুমার বলে, ওকে আর তোমার লজ্জা করলে চলবে না। একসঙ্গে থাকা, ভাইয়ের মত, বাড়িতে আর দ্বিতীয় মেয়েছেলে নেই, ভাত বেড়ে দেবে তুমি
সত্য মৃদ্যু হেসে বলে, অত বলবার কি আছে? আমাকে কি তোমার খুব লজ্জাবতী মনে হয়?
আহাহা, ইয়ে তা নয়। মানে লজ্জা আর কোথা? মাস্টার মশাইয়ের সঙ্গেই তো তুমি দিব্যি কথা চালাচ্ছ… বুঝলি নিতাই, প্রথম দিন আমি তো তাজ্জব! যদি ভাগ্যিস মা নেই সামনে। খুব সাহসী, বুঝলি? মাস্টার মশাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে আমারই তো–
নিতাই এক নজর সত্যর দিকে দৃষ্টিপাত করে বলে, বৌঠানকে এতদিন দেখেও চিনতে পারলে না নব? তোমার আমার মাটি দিয়ে গড়া উনি নন। তোমার অনেক ভাগ্য তাই..
হঠাৎ ওদের চমকে দিয়ে হেসে ওঠে সত্য, নাও, নাওয়া-খাওয়া শিকেয় তুলে এখন দুই বন্ধুতে ভাগ্যবিচার শুরু হয়ে গেল! আচ্ছা ঠাকুরপো, তুমিই বল, মাস্টার মানে হল গিয়ে গুরু, কেমন কিনা? তা গুরুকে লজ্জা করলে চলবে কেন? ভক্তি করব, ছেদ্দা করব, মান্য করব, ভয়-লজ্জা করব কেন? আমি তো ওনার কাছে ইংরিজি পড়ব ঠিক করেছি।
কী বললে?
নবকুমার জ্যা-মুক্ত ধনুকের মত ছিটকে ওঠে, কি শিখবে?
বললাম তো।
পাগলামি করো না। বেশী বাড়াবাড়ি ঠিক নয়। যা রয় সয় তাই ভাল। কলকেতায় এসেছ, বাসার সংসার করছ, এ পর্যন্ত একরকম, তা বলে
তা ইংরিজি শিখব বলেছি বৈ তো গাউন পরে হোটেলে খানা খেতে যাব বলি নি? কৌতুকের হাসিতে জোড়া ভুরু নেচে ওঠে সত্যর, উফুল মুখ লাল হয়ে ওঠে, নিতাইয়ের দিকে সরাসরি তাকিয়েই বলে, তোমার বন্ধুর সবতাতেই ভয়! ঘরে বসে বসে বই পড়ে যদি একটু জ্ঞান-বিদ্যে অর্জন করা যায়, তাতে দোষটা কি বল তো? নাকি মেলেচ্ছ অক্ষর ছুঁলেও জাত যাবে?
নবকুমার গম্ভীরভাবে বলে, তা একরকম তাই বৈকি। যতই হোক হিন্দুর মেয়ে!
আর নিজে হিন্দুর ছেলে নও?
বেটাছেলের কথা আলাদা।
আলাদার কিছু নেই। ধর্মের কাছে সব সমান। আর যদি জাত যাওয়ার কথাই বল– আর একবার কৌতুকের আলো ফুটে ওঠে সত্যর মুখে, সে তা হলে অনেক দিনই গেছে।
অ্যাঁ!
অ্যাঁ!
যুগপৎ দুই বন্ধুরই মুখবিবর হাঁ হয়েই থেকে যায় বুজতে ভুলে।
সত্য মৃদু মৃদু হাসতেই থাকে।
একটু চৈতন্য লাভ করে নবকুমার বলে, ইংরিজি পড়েছ তুমি?
সামান্য সামান্য। নিজের চেষ্টায় যা হয়। তোমার বই দুটো তো ছিল ঘরে।
তাজ্জব!
নিতাইয়ের কণ্ঠ থেকে শুধু এইটুকু স্বর নির্গত হয়।
কিগো ঠাকুরপো, আমার হাতে চলবে তো? নাকি জাত যাওয়ার হাতে খাবে না?
কথা নেই বার্তা নেই সহসা নিতাই এক হাস্যকর কাজ করে বসে। প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে সত্যর পায়ের কাছে সাষ্টাঙ্গে এক প্রণাম করে।
সত্য অবশ্য এর জন্যে প্রস্তুত ছিল না। দু পা পিছিয়ে যায়। তারপর ধীরস্বরে বলে, যাক ঠাকুরপো, গুরুজন বলে মানলে তাহলে? বেশ। নাও এবার বাধ্যতা কর। তোমার তো এখনো দুদিন ছুটি, চান করে খেয়ে ভাইপোদের নিয়ে ইস্কুলে ভর্তি করতে যাও দিকিন। কদিন এসেছে, কেবল খেয়ে খেলিয়ে বেড়াচ্ছে। যার জন্যে এত কাণ্ড করে কলকাতায় আসা।
৩৩. কালের খাতায় কয়েকখানা পাতা
কালের খাতায় কয়েকখানা পাতা ডান দিক থেকে বাঁ দিকে চলে আসে, গড়িয়ে যায় অনেকগুলো দিন।
অনভ্যস্ত জীবন প্রায়-ধাতস্থ হয়ে এসেছে নবকুমারের। গতিতে বেশ খানিকটা ক্ষিপ্রতার সঞ্চার হয়েছে, বাড়িতে অফিসের গল্প করতে শিখেছে, অফিস যাওয়ার সময় কৌটো ভর্তি পান, আর পানের সঙ্গে দোক্তা নিতে শিখেছে।
ইতিমধ্যে ছেলেরা স্কুলে কয়েকবার ক্লাস বদলেছে, আর সত্যবতীরা একবার বাসা বদলেছে।
বাসা বদলাবার অবশ্য অতি সূক্ষ্ম গোপন একটা ইতিহাস আছে, সে ইতিহাসে শুধু সত্যবতীর আর ভবতোষ মাস্টারের মধ্যেই নিবদ্ধ।
বেশ চলছিল সংসার।
তাড়াহুড়ো করে স্বামীর আর স্বামীর বন্ধুর অফিসের ভাত রাঁধছিল সত্য। পান সাজছিল দু কৌটো করে। তারা বেরোতে না বেরোতে ছেলেদের নাওয়া-খাওয়া নিয়ে ব্যস্ত হচ্ছিল, “দুর্গা দুর্গা” উচ্চারণ করে ছেলেদের স্কুলে পাঠাচ্ছিল, তারপর সারাদিনের অবসরে সংসারের বাকী কাজগুলো সেরে তুলে মন দিয়ে শিখছিল লেখাপড়া। বাংলা ইংরাজী দুই-ই।
