ভবতোষ চলে গিয়েছিলেন।
আর চলে যাবার পর সত্যকে এক হাত নিয়েছিল নবকুমার। চিরকাল যেটা বলে সেটা বলেই বসেছিল।
সব তাতেই দুঃসাহস প্রকাশ! ভগবান যে কেন তোমাকে বেটাছেলে না করে মেয়েছেলে গড়েছিল তাই ভাবি!
সত্যর মুখ কঠিন হয়ে ওঠে নি। সত্য হেসে ফেলেছিল। গলা খুলে। নিজের এই খোলা হাসির শব্দ নিজের কানেই অপরিচিত ঠেকেছিল সত্যর।
তবু খোলা গলাতেই বলেছিল, ভাববার কি আছে? তোমাকে ভগবান বেটাছেলে করে গড়েছে। অপরের পিত্যেশ করলে চলবে কেন? বারো মাস তো অপরে করবে না? তবে? গোড়া থেকেই মনের জোর করে পায়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করা উচিত।
সন্ধ্যার অন্ধকারে মিটমিটে প্রদীপের ছায়ায় এ বল খুঁজে পেয়েছিল সত্য, আর সকালের হীরে ঝকঝকে আলোয় দুর্বল হয়ে পড়বে?
না, পড়বে না। সত্য আঁচল কোমরে জড়িয়ে নেমে পড়েছে কাজে। নেমে পড়ল নতুন জীবনসংগ্রামে।
এ সংসার সত্যর নিজের। নিজের ছাঁচে, নিজের ভাবে, নিজের স্বপ্নে একে গড়ে তুলবে সত্য।
.
ভবতোষ বাসার ঘরদোর সব ধুইয়ে মুছিয়ে রান্নাঘরে উনুন পাতিয়ে রেখেছিলেন। আনিয়ে রেখেছিলেন ঘুঁটে কয়লা। কাল নবকুমারের মাধ্যমে কয়লার উনুন জ্বালার পদ্ধতিটাও শিখিয়ে দিয়ে গেছেন সত্যকে। সেই পদ্ধতিতে উনুনে আগুন দিতে দিতে হঠাৎ ভারি অবাক লাগল সত্যর। যেভাবে ইচ্ছে কাজ করতে পারে সত্য, কেউ কোথাও চোখ দেবার নেই, ছল ধরবার কি খুঁত ধরবার নেই। এ কী অদ্ভুত অনুভূতি।
এ কী অপূর্ব সুখ!
এই সুখটার ধারণা নিয়েই তো মুক্তির লড়াই করে নি সত্য। ও শুধু চেয়েছিল তেমন দেশে চলে আসতে, যেখানে রোগে ডাক্তার আছে, ছেলেদের জন্য ভাল ইস্কুল আছে, পুরুষদের জন্যে কাজ আছে।
নিজের জন্যে ভাল কি আছে, সে কথা ভেবে দেখে নি সত্য। শুধু জেনেছিল নিন্দে আছে, ধিক্কার আছে। এখন দেখছে আরো অনেক আছে। স্বাধীনতার সুখ মানে তা হলে এই? মাথার ওপর সর্বদা উদ্যত খাড়ার বদলে অনেক উঁচুতে আলো-ঝকঝক আকাশ থাকা?
শহরের মেয়েরা যে কেন বিদ্যেয়-বুদ্ধিতে অনেক উঁচু, তার মানে বুঝতে পারে সত্য। যারা এত পাচ্ছে, তারা তার প্রতিদান দেবে বৈকি!
হঠাৎ একটু স্তব্ধ হয়ে গেল সত্য।
সেও তো অনেক পাবে, তার বদলে দিতে পারবে তো কিছু!
রান্নাঘর থেকে বেরোতে গিয়ে থতমত খেয়ে ফের ঘরে ঢুকে পড়তে হল সত্যকে! ভবতোষ উঠোনে দাঁড়িয়ে। উঠোন বলতে সত্যর পরিচিত জিনিস নয়। শানবাঁধানো চারচৌকো খানিকটা জায়গা মাত্র। পাড়াগাঁয়ে একে চাতাল বলে।
সে যাই হোক, ভবতোষ সেখানে দাঁড়িয়ে গলাখাকারি দিলেন, তারপর বললেন, নবকুমার আছ নাকি?
বাবা ঘুমুচ্ছে।
সাড়া দিল খোকা।
ভবতোষ গলা চড়ালেন, এখনো ঘুমুচ্ছে? কাল থেকে যে দশটায় অফিস যেতে হবে। আমি এই একজন লোক ঠিক করে আনলাম, মেয়েলোক। খোকা, তোমার মাকে তা হলে বল, কথাবার্তা কয়ে নিতে। আমি অবশ্য মোটামুটি বলে নিয়ে এসেছি। বাসন মাজা, ঘর মোছা, ছাড়া কাপড় কাঁচা, কয়লা ভাঙা, উনুন ধরানো, মশলা পেষা এইসব করতে হবে। মাইনে মাসে বারো আনা, জলপানি চার আনা। তবে মাথায় মাখতে তেল একটু দিতে হবে। চান না করলে তো আর মশলা পেশা চলবে !
নবকুমারের সাড়া পাওয়া যায় না। ঘরের মধ্যে বিঘল সত্য এই সকালেও ঘামতে থাকে।
সব কাজই যদি ঝি করবে, সত্য তা হলে কী করবে?
শুধু বাসন মাজার জন্যেই হলে তো হত।
ভবতোষ সঙ্গের স্ত্রীলোকটিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, কই গো বাছা, এগিয়ে এস। ওই ওদিকে মা রয়েছেন, তার সঙ্গেই বলা-কওয়া করে নাও। এখন থেকেই লেগে যাও তা হলে। এই তো রাতের শকড়ি ঘটিবাটি পড়ে রয়েছে।
আর বেশীক্ষণ লজ্জাবতীর ভূমিকার মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখা সম্ভব হল না সত্যর। মাথায় কাপড়টা টেনে দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়ে নম্র গলায় বলে ফেলল, এত সবের জন্যে বলার দরকার ছিল না। ঘরের কাজ নিজেই চালিয়ে নিতে পারব–
ভবতোষ প্রথমটা একটু থতমত খেলেন, কারণ সত্য এসে কথা বলবে, আশা করেন নি। তারপর সামলে উঠে বললেন, কেন? লোক যেক্ষেত্রে রাখাই হচ্ছে, সবই করবে। এমনিতে শুধু বাসন মাজলেও তো আট আনার কম রাজী হচ্ছে না। আর গণ্ডা চারেক পয়সা দিলেই
পয়সার জন্যে না– সত্য এবার প্রায় স্পষ্ট গলায় বলে ওঠে, নিজের অব্যেস খারাপের জন্যে বলছি। সব কাজ লোক দিয়ে করালে আয়েস এসে যাবে। সময়ই বা কাটবে কিসে?
ভবতোষ মিনিটখানেক হাঁ করে তাকিয়ে থাকেন। কথাটা হৃদয়ঙ্গম করতে এ সময়টুকু লেগে যায় তার।
শ্বশুরবাড়িতে খেটে খেটে হাড়কালিকরা কোন মেয়ে যে বাসায় এসে “আয়েস” করতে চায় না, এ তাঁর অভিনব মনে হল। ছাত্র নবকুমারের স্ত্রীটি সম্পর্কে অবশ্য তিনি বরাবরই একটু সমীহ ভাবাপন্ন, তবু আজ যেন তার সম্পর্কে আরও বেশি অবহিত হলেন।
হয়তো বা কিঞ্চিৎ অভিভূতও।
তার পর ধীরস্বরে বললেন, মেয়েছেলেদের জন্যে আরো অনেক ভাল ভাল কাজ আছে বৌমা, তাতেও সময় কাটবে। তা ছাড়া অবকাশকাল ঘরে বসে বসে লেখাপড়ার চর্চা করলেও
কথা শেষ হল না, নবকুমার বেরিয়ে এল ঘর থেকে চোখ রগড়াতে রগড়াতে। তটস্থ হয়ে বলল, মাস্টার মশাই আবার সক্কালবেলাই কষ্ট করে
না, কষ্ট আর কি! এই কাজের লোক ঠিক করে আনলাম। দেখিয়ে শুনিয়ে দাও একে। এবার একটা গোয়ালা ঠিক করে দিতে পারলেই সব ব্যবস্থা হয়ে যায়।
