পাড়াগাঁয়ের কাছারী-বাড়ি’র চাকরি নয়, এ একেবার কলকাতা শহরের অফিসের চাকরি। ভাত দিতে এক পলক এদিক ওদিক করলে চলবে না। সত্যকে শুনিয়ে শুনিয়ে এলোকেশীর এক বান্ধবী অবহিত করিয়ে দিয়েছিলেন, বুঝবেন ঠ্যালা! স্বাধীন সংসার করার মজা বুঝবেন! আপিসের ভাত যে কী বউ জানেন না তো! দেখে এসেছিলাম সেবার কালীঘাটে আমার পিসতুতো ভায়েদের বাড়ি গিয়ে। একটা মানুষের ভাত যোগাতে তিন-তিনটে বৌ হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে। তোমার বৌ অবিশ্যি করিকম্মা, তবে শাশুড়ী-ননদের তলায় তলায় কাজ, আর এক হাতে হরিদ্বার গঙ্গাসাগর’– অনেক তফাৎ!
এলোকেশী বলেছিলেন, পারবে। বুকের পাটার জোরেই পারবে। তবে খোয়ার হতে আমার ছেলেটারই হবে। বাছা আমার জগতের কিছু জানে না, তাকে গলায় গামছা বেঁধে নিয়ে গিয়ে গাড়িতে জুততে গেল। যাক–ভগবান দেখছেন!
বান্ধবী বলেছিলেন, তা তো সত্যি। যে অন্যায় পথে সুখ করতে যাবে, তার বিচার ভগবান অবিশ্যিই করবেন সংসার করা মানে তো আর মাছের ল্যাজা ভাত খাওয়া নয়, তার অনেক হ্যাঁপা। কথাতেই আছে–একলা ঘরে চতুর্ভুজে খেতে বড় সুখ, মারতে এলে ধরতে নেই ওইটাই যা দুখ।
এর পর আলোচনার মাধ্যমে ভবিষ্যৎবাণী করা হয়েছিল, ঠ্যালা বুঝলেই নবুর বৌ পালিয়ে আসতে পথ পাবেন না!
সত্য সেদিন মনে মনে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসেছিল। কিন্তু আজ সত্য একটু যেন ভয় পাচ্ছে। ভাবছে এই শহরকে আমি বুঝতে পারব তো? আপনার করতে পারব তো? এ শহর আমাকে “আয়” বলে কাছে টানবে তো? এখানে আমাকে নিষ্পরের মত, বেচারীর মত, থাকতে হবে না তো?
না আপিসের ভাত’কে ভয় সত্যর, ভয় করে না একা হাত’কে। সত্যর ভয় অপরিচয়ের ভয়।…
মা!
বড় থোকা তুড়ু এসে দাঁড়িয়েছে পিছনে। নীলাম্বর নাম দিয়েছিলেন তুড়ুক সোয়ার, সেই থেকে তুড়ু। ভাল নাম সাধন। প্রথম সন্তানটি নষ্ট হয়ে গেছে, তাই এটি সাধনার ধন। অতএব সেই ঘেঁষা নাম।
তুড়ুর ফোলা ফোলা চোখে অগাধ বিস্ময়।
সত্য তাড়াতাড়ি মুখ ফিরিয়ে বলে, উঠে পড়েছিস! ভাই ওঠে নি?
না।
আর তোদের বাবা?
না।
তা উঠবেন কেন? আয়েসটি যে নবাবী! কাল থেকে বুঝবেন মজা!
আলিস্যি ভেঙে উঠে দাঁড়ায় সত্য।
কী বোকার মত বসেছিল এতক্ষণ! কী ভাবছিল আবোলতাবোল! নতুন জায়গায় সব ব্যবস্থা করে নিতে কম তো দেরি হবে না!
গতকাল সন্ধ্যায় রান্না হয় নি।
ভবতোষ মাস্টার ঘর-দোর দেখিয়ে-শুনিয়ে ওদের সরিয়ে রেখে বলেছিলেন, তুমি তা হলে এদের সামলে-সুমলে নিয়ে বসো নবকুমার, বৌমাকে বলো বেলা থাকতে প্রদীপ জ্বালাবার ব্যবস্থা করে ফেলতে, নতুন জায়গা। আমি তোমাদের জন্যে কিছু খাবার নিয়ে আসছি। এখন আর রান্নাবান্নায় কাজ নেই
সত্য ঘরের ভিতর থেকে দরজার শিকল নেড়েছিল।
নবকুমার সেদিক থেকে ঘুরে এসে হাত কচলে বলেছিল, আপনি আবার বৃথা কষ্ট করবেন কেন? ইয়ে মানে–যাহোক করে দুটো ভাত ফুটিয়ে নেবে অখন।
ভবতোষ মাস্টার একবার সেই দরজার দিকে দৃষ্টিপাত করে সরাসরি অন্তরালবর্তিনীকেই উদ্দেশ করে বলে উঠেছিলেন, যাহোক করে করতেও অনেক ল্যাঠা বৌমা, কাল সকাল থেকেই একেবারে নতুন করে পত্তন করো। কাল আমি একটা বাসনমাজার ঠিকে-ঝি যোগাড় করে নিয়ে আসব। আজ বাজার থেকে পুরী-তরকারি মিষ্টি এনে….
নবকুমার হঠাৎ বলে উঠেছিল, বাজারের পুরী-তরকারি? কলকাতায় পা দিতে দিতেই ভাতটা খোয়াব?
হেসে উঠেছিলেন ভবতোষ মাস্টার।
বলেছিলেন, নাঃ, তুমি একেবারে মান্ধাতার আমলেই আছ নবকুমার! জাতটা খোয়াচ্ছ কিসে? আমি কি ম্লেচ্ছ হোটেলের খানা এনে খাওয়াতে চাইছি তোমায়? দেশে তোমরা ময়রার ঘরের জিলিপি মেঠাই ফুলুরি বেগুনি খাও না? এও সেই ময়রার দোকানের।
নবকুমার মাথা চুলকেছিল…।
ইয়ে মানে, ওই তরকারি-টরকারি বলছিলেন তাই বলছি। একটা দিনের জন্যে কেন আর…
ভবতোষ মাস্টার জোর দিয়ে বলেছিলেন, শুধু একটা দিন কেন, এমন অনেক দিনই হতে পারে নবকুমার। বৌমা একা মানুষ। শরীর-অশরীর আছে। কোনদিন যদি ভাতের হাঁড়ি নামাতে না পারলে! তা ছাড়া জলখাবার বলে কথা আছে। কলকাতায় এত হরেক খাবার, খাবে না ছেলেপুলে? তোমায় তো আমি দোকানের ভাত খেতে বলছি না। তবে যদি বৌমার তেমন আপত্তি থাকে…
আর একবার শেকল নড়ে উঠেছিল।
নবকুমার ঘুরে এসে বলেছিল, না, ইয়ে মানে ওদিকে আপত্তির কিছু নেই। বলছে, আপনি যা বলবেন তাই শিরোধার্য। আপনি হিতৈষী বন্ধু গুরু। আপনার…
হয়েছে হয়েছে। অত ভাল ভাল কথা বেশী খরচ করবার দরকার নেই নবকুমার। তোমরা খেয়েদেয়ে একটু সুস্থ হও, আমি দেখে বাসায় যাই।
নিজের পয়সায় একরাশ খাবার এনেছিলেন ভবতোষ মাস্টার। পুরী তরকারি চমচম রাবড়ি। সাজা পানও এনেছিলেন। বিহ্বল হয়ে গিয়েছিল ছোট ছেলে দুটো। কী সোনার দেশে এল তারা!
নিতাইয়ের সঙ্গে একসঙ্গে থাকবার ব্যবস্থা হয়েছে, কিন্তু এদের সঙ্গে একসঙ্গে এসে উঠতে পারে নি নিতাই। কদিন পরে আসবে। রাত্রে তাই একবার প্রস্তাব করেছিলেন ভবতোষ, একা ভয় পাবে না তো নবকুমার? নতুন জায়গা। বল তো যে কদিন না নিতাই আসে, রাতে আমি তোমাদের পাহারা দিই?
নবকুমার হাতে চাঁদ পাচ্ছিল।
কিন্তু সে চাঁদ মুঠোয় পেতে দিল না সত্য। শেকল নেড়ে জানাল, মাস্টার মশাইয়ের কষ্ট পাবার দরকার নেই, দরজার হুড়কো লাগিয়ে বেশ থাকবে তারা।
