রামকালী তো চিরদিন সকলেই দূরের মানুষ, শুধু দুঃসাহসী সত্যই পারত সেই দূরত্বের বর্ম ভাঙতে। কিন্তু সে দুঃসাহসিক আবদার সত্য নিজেই আর করতে পারে নি। সময়ও পায় নি। সর্বদা নবকুমারকেই কাছে কাছে রেখেছেন রামকালী। আর সত্যকে টেনেছে মেয়েমহলে। তবে নবকুমারকে যে রামকালী ভালোবেসেছেন ওইটাই পরম তৃপ্তি।
আসার সময় বাপকে প্রণাম করে স্বামীর উপস্থিতি ভুলে রুদ্ধকণ্ঠে বলে উঠেছিল, তুমি তোমার এই দুঃসাহসী আস্পদ্দাওলা মেয়েকে ক্ষমা করেছ বাবা, সেই সাহসেই বলছি, আমি তোমার এক সন্তান, যেন সময়কালে সেবাযত্বের অধিকার পাই।
রামকালীর গলাটা কি একটু কেঁপে উঠেছিল?
চারিদিকের হা-হুতাশের শব্দে সেটা ধরতে পারে নি সত্য। শুধু কথাটাই শুনতে পেয়েছিল। মেয়ের মাথাটা ধরে একটু নাড়া দিয়ে বলে উঠেছিল রামকালী, চিরকালের পাকা বুড়ী! বাবার জন্যে তো খুব সুব্যবস্থা দিচ্ছিস! সেবার পাত্র হবই বা কেন রে?
এ কথার আর উত্তর দিতে পারেনি সত্য, সেই গভীর একটু স্নেহস্পর্শে ভেতর থেকে উথলে কান্না এসেছিল তার। কাঁদতে কাঁদতে আর কান্না চাপতে চাপতে পালকিতে উঠেছিল।
পালকিতে উঠেও তাই কথা কইতে পারে নি অনেকক্ষণ।
হঠাৎ একসময় নবকুমার বলে উঠল, তোমার বাবা আমাদের এই তুচ্ছ জগতের মানুষ নয়।
চকিত হয়ে স্বামীর দিকে তাকাল সত্য।
বাতাস লেগে লেগে ততক্ষণে গালের জলের ধারাটা শুকিয়ে উঠেছে, চোখটা জল শুকিয়ে ভারী থমথমে হয়ে রয়েছে।
নবকুমার আবার বলল, সেকালের রাজা-রাজড়াদের সব যেমন ভাব ছিল তেমনি ভাব। ভয়ও যত করে ভক্তিও তত আসে। এমন বাপ পাওয়া পরম পুণ্যি।
সত্যর মুখের কাছে একবার আসে, তবু তুমি দেখছ ভাঙা রাসের ঠাকুর! আগের মানুষকে যদি দেখতে! এমন মন ভেঙেছে, শরীর ভেঙেছে! কিন্তু বেদনাবিধুর চিত্তে অত কথা বলতে ইচ্ছে হয়। শুধু আস্তে বলে, মা থাকতে তো দেখলে না! মাকেও দেখলে না! এই আক্ষেপটা রয়ে গেল।
মনে মনে বলে, দেখ কেন আমি বাপের গরবে গরবিনী!
কিন্তু তবু মেয়েসন্তান।
বাপের সে গরব শুধু মনের মধ্যে তুলে রাখবার। সে গৌরবে অধিকার নেই ভোগের দাবী নেই। ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে, ছেড়ে থাকতে হবে। সেই গৌরবের ছায়ায় বসে জীবনকে ধন্য করবার উপায় নেই; জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করবার পথ নেই। ভগবান, কেন এই পোড়া সমাজ গড়েছিলে?
সমাজের ব্যাপারে ভগবানকেই দোষ দেয় সত্য। তারপর বাইরের মৌন প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলে, বিদেয় নিচ্ছি তোমাদের কাছে। হয়তো বা জন্মের শোধ। পা বাড়াচ্ছি অকূলের দিকে। এখন দেখি জিতি কি হারি! রামকালী চাটুয্যের মেয়ে, যদি হারেও, তবু হার মানবে না।
.
বারুইপুর ফিরে এসেই কলকাতায় যাওয়ার তোড়জোড়। যাত্রাকালে মা বাপ কেউই কথা বললেন না, ঠিক যাত্রাকালে তো বাড়ি থেকে বেরিয়েই গেলেন, যা কিছু করলো সদু।
কিন্তু আশ্চর্য, নবকুমার যেন এই বিরাট লোকসানটাকে আর লোকসান বলে মনে করছে না। রামকালীকে দেখে এসে পর্যন্ত ‘বাপ’ সম্পর্কে যে একটা উঁচু ধারণা তার জন্মেছে, তার সঙ্গে নীলাম্বরের এই মেয়ে-সংকীর্ণতা যেন বড় বেশী দৃষ্টিকটু লাগলো তার। ইচ্ছে হচ্ছিল মা-বাপের এই দুর্ব্যবহারের প্রসঙ্গ নিয়ে সত্যর সঙ্গে কিছু আলোচনা অর্থাৎ নিন্দাবাদ করে, কিন্তু সত্যর ভয়েই সাহস করল না। এগিয়ে চলল নতুন জীবনের দিকে।
৩২. এ এক আশ্চর্য সকাল
এ এক আশ্চর্য সকাল!
যেন এই সকালের আকাশের কোন লুকনো পৃষ্ঠপটে নিথর হয়ে আছে অনেক রহস্য, অনেক আনন্দ, অনেক ভয়। সেই রহস্য আস্তে আস্তে উন্মোচিত হবে, সেই আনন্দ ধীরে ধীরে প্রসন্ন হাসি হাসবে, অথচ সেই ভয়মুঠোয় চেপে রাখরে সমস্ত সত্তাকে। তাই উচ্ছ্বসিত হতে বাধবে, উল্লসিত হতে বাধবে যতটা জুটছে তার সবটা গ্রহণ করতে বাধবে।
এই আশ্চর্য নতুন সকাল সেই অজানিতের ইশারা নিয়ে তাকিয়ে রইল সত্যবতীর মুখোমুখি।
সত্যবতী অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে। ভাবল, আকাশটা কি রকম অন্যরকম!
অথচ সত্য যে এইমাত্র এই স্বপ্ন-শহরের মাটিতে পা ফেলল, আর তার আকাশে চোখ মেলল তাও নয়। গতকাল বিকেলে এসে উঠেছে সে পাথুরেঘাটার এই একতলা বাসাবাড়িটায়।
তবু ভোর সকালে ঘুম ভেঙে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বেশ খানিকক্ষণ দাওয়ায় দাঁড়িয়ে রইল সত্য বিমূঢ়ের মত।
মনে পড়ল না, ঠিক এই মূহুর্তে ওর কোন কাজ আছে।
যে জীবনটা অভ্যস্ত ছিল, তার কাজগুলো যেন নিজেরাই সজীব হয়ে পর পর সামনে এসে দাঁড়াত, কিন্তু চিরপরিচিত গণ্ডির সেই নিত্য কাজগুলো ঝাঁপসা হয়ে গেছে। এলোকেশীর হাতের কাটা খাল দিয়ে আর ডোঙা ভাসবে না সত্যর। এবার সত্যকে নিজে হাতে খাল কাটতে হবে।
.
কোথায় যেন ভোরের পাখীরা ডাকছিল, সত্যর মনে হল ওরা আর কি নিত্যেনন্দপুর থেকে উড়ে উড়ে সত্যর সন্ধান করতে এসেছে, না বারুইপুরের কোন এক অজানা গাছের ডালে বসে সত্যকে ডাক দিচ্ছে! বলছে, সত্য, তুমি ভুল করতে বসেছ! দ্যাখ বিবেচনা কর, এখনও হয়তো সময় আছে ফেরবার!
সত্য কি সত্যই ভুল করল?
নইলে বুকের ভেতরটায় এমন ভয়-ভয় করছে কেন? কেন নিজেকে কেমন যেন অসহায় লাগছে?
দাঁড়িয়ে থাকতে বল পাচ্ছে না সত্য, তাই বসে পড়ল দাওয়ার ধারে। ভাবল হঠাৎ ঘুম ভেঙে উঠে এসে বোধ হয় মাথাটা হালকা লাগছে। একটুক্ষণ বসে নিয়ে স্নান করতে গেলেই হবে। আজকের দিনটা পর্যন্ত ইচ্ছেমত, কাল থেকে নবকুমার কাজে লাগবে।
