লুকিয়ে দুটো টাকা দিয়ে এসেছিল সত্য তুষ্টুকে, তুষ্টুর চোখ দিয়ে জল পড়েছিল। বলেছিল, বাপের মতন মনটি। কবরেজ মশাই আছেন, তাই এখনো বেঁচে আছি।
কুমোর-জেঠা, কামার-খুড়ো, ধোপাপিসি কারুর সঙ্গে দেখা করতে বাকি রাখেনি সত্য, কিন্তু আগের মতন কেউ সহাস্যে বলে নি, এসেছিল? আয় বোস।
আসন পেতে দিয়ে বলেছে, আসুন দিদিঠাকরুণ, বসুন।
আশ্চর্য, একসঙ্গে সবাই কি করে বদলে গেল?
.
বদলায় নি শুধু গ্রামটা। বদলায় নি গাছপালা মাঠ বন দীঘি পুকুর। এরাই শুধু উচ্ছ্বসিত আনন্দে স্বাগত জানিয়েছে মাথা নেড়ে নেড়ে, কোলাহল করে করে। আবার বিদায়কালে তারাই বিষণ্ণ বিধুর দৃষ্টি মেলে মৌন বেদনার মত তাকিয়ে থেকেছে।
এরাই শুধু বদলায় নি।
কিন্তু ওদের কাছে আর কতটুকু আশ্রয়? আশ্রয় চায় হৃদয়ের কাছে, প্রাণোত্তাপের কাছে। কোথায় সেই উত্তাপ? সকলেই ভাল করে যত্ন করেছে আর বলেছে, ওরে বাবা, দুদিনের জন্য এসেছ! কেউ বলে নি, তুই যে আমাদের চিরদিনের!
সত্যর মা বেঁচে থাকলে কি অন্য রকম হত না? মার কাছে কি সত্যর সেই শৈশবটি সোনার কৌটায় তোলা থাকত না? সত্য এসে দাঁড়ালে মা সেই কৌটোটি খুলে ধরে হাসিমুখে বলত না, এই দেখ কিছু হারায় নি তোর। সব আছে। আমি তুলে রেখেছি।
তা হলে হয়তো সত্যর সেই পুতুলের বাক্সটাকেও এসে দেখতে পেত সত্য। মা বলত, এই দেখ, তোর হাতের কাপড় পরানো এই তোর বড়বৌ, মেজবৌ, ন’বৌ’ সেবারে এসে যেমন রেখে গিয়েছিলি তেমনই আছে।
হ্যাঁ, ঠাকুমার শ্রাদ্ধে এসে সেবারে নিজের ফেলে যাওয়া পুতুলবাক্স সাজিয়েছিল সত্য, তারপর তো তার নিজেরই জীবনের মধ্যে এল পুতুল ভেঙ্গে যাওয়ার ঘটনা। …মাটির পুতুলের কথা আর কে ভেবেছে!
সত্য হয়ত মার ছেলেমানুষিতে হাসত। তবু সুখ পেত। মা না থাকলে বাপের বাড়ি এসে সুখ নেই। নিঃশ্বাস ফেলে ভাবল সত্য। অত বড় সংসারের মধ্যে সেই মানুষটাকে, অনেকের মধ্যে একজন মাত্র ছাড়া আর তো কোনদিন কিছু ভাবে নি। হঠাৎ আজ ধরা পড়েছে, সেই একজন ছাড়া সমস্ত অনেকেই অর্থহীন।
তবু ওরই মধ্যে পিস্ঠাকুমার কাছে দুদণ্ড বসলে প্রাণটা ঠাণ্ডা হত। কিন্তু সেই দোর্দণ্ডপ্রতাপ মানুষটার এত দুরবস্থা হয়েছে যে দেখলে প্রাণটা ফাটে।
সত্য বলেছিল, অতিরিক্ত খেটেখেটেই তুমি এমনি করে দেহ ভেঙেছ পিঠাকুমা! তোমার সেই শরীর-স্বাস্থ্য এই কবছরে এমনি হয়েছে?
মোক্ষদা ধিক্কারের হাসি হেসে বলেছেন, অতিরিক্ত যদি না খাটব তো সেই ভূতের মত আঁকড়া গতর নিয়ে করতাম কি বল? ভেতরের ভূতই রাত-দিন ছুটিয়ে মারত!
আর এখন যে সেই ভূত তোমাকেই জীর্ণ করে ফেলল!
মরুক গে। যে কদিন পৃথিবীর অনুজলের বরাত আছে গড়িয়ে গড়িয়ে বাঁচবই। তারপর যে পারবে সে মুখে এক মুড়ো আগুন দিয়ে চিতেয় তুলে দেবে। যার ছেদ্দায় আসবে সে এক মুঠো পিণ্ডি দেবে। যার জন্য একটা দিন অশৌচ পালবার কেউ নেই, তার আবার বাঁচা-মরা!
সত্য ব্যথিত হয়ে বলেছিল, বাবাই তোমার সব করবে পিঠাকুমা।
মোক্ষদা উদাস কণ্ঠে বলেছিলেন, তা অবিশ্যি করবেন। রামকালী মহৎ মানুষ, হয়তো মায়ের মতন করেই পিসির ছেরাদ্দ করবেন, তবু মনে মনে তো জানবেন যা করছি বাহুল্য করছি, ভিক্ষে দিচ্ছি।
আশ্চর্য!
মোক্ষদাকে দেখে আগে কি কেউ কখনো ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পেরেছে, এ সংসার মোক্ষদার নিজের নয়? এখানে মোক্ষদার জন্যে তেরাত্তির অশৌচ পালবার মতও কেউ নেই? মোক্ষদা মরলে যে তার মুখে আগুন দেবে, পিণ্ডি দেবে, সে দয়া করেই দেবে? মোক্ষদার প্রাপ্য পাওনা বলে দেবে না?
অত দাপট তবে কোন ভিতের ওপর খাড়া ছিল। নাকি কোথাও কোনও ভিত ছিল না বলেই ফোপরা দাপটটা অত বড় করে তুলে ধরতেন মোক্ষদা? জানতেন হাতটা একটু শিথিল হলেই মুহূর্তে ভূমিসাৎ হয়ে যাবে ফাঁকা ইমারত?
ভাবতে ভাবতে—
ছেলে দুটোকে একটু কাছে টেনে নিয়ে বসল সত্য। এরাই জোর, এরাই ইমারতের ভিত।
.
সারদাকে বুঝতে পারে নি সত্য।
নাগালই পায় নি সারদার।
অবিশ্যি সারদাই সর্বদা খাইয়েছে, মাখিয়েছে, যত্ন করেছে। সত্য ছেলেবেলায় যা যা খেতে ভালবাসত সেগুলি মনে করে বেঁধে দিয়েছে, হেসে হেসে বলেছে, বুঝলি তুড়ু, তোর দাদামশাইয়ের সংসারে এ হেন জিনিস মজুত থাকতে তোর মার রুচি পছন্দ ছিল পুঁইমেটুলি ভাজা, শশাপাতার বড়া, তেতো পুঁটির টক!
কিন্তু সত্য যখন বলতে গিয়েছিল, যাই বল বৌ, খুব মহত্ত্বটা দেখিয়েছ তুমি! নতুন বৌ বলছিল, তুমি একপ্রকার দেবী তখন কেমন কঠিন হয়ে উঠেছিল সারদা। ভয়ানক তীক্ষ্ণ একটা হাসি হেসে বলেছিল, তোমার তো বুদ্ধি-সুদ্ধি আছে ঠাকুরঝি, পরের মুখে ঝাল খাচ্ছ কেন?
বুদ্ধিসুদ্ধি যথেষ্ট পরিমাণ থাকা সত্ত্বেও কথাটার নিহিতার্থ ঠিক ধরতে পারে নি সত্য। আর সর্বদাই লক্ষ্য করেছে, পুরনো অন্তরঙ্গতার দরজা কিছুতেই খুলতে রাজী নয় সারদা।
আর বড়দা?
তার সঙ্গে তো কথাই কইতে ইচ্ছে হয় নি সত্যর। বড়দা যে ওই গিন্নিবান্নি সারদার স্বামী, অত বড় দুটো ছেলের বাপ, তা যেন খেয়ালেই নেই বড়দার। যেন নতুন বৌয়ের নতুন বর! তার কথা নিয়েই সত্যর সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা ফষ্টি-নষ্টি! ছিঃ!
কারো সঙ্গেই যেন কথা কয়ে সুখ হয় নি।
অবিশ্যি বিদায়কালে সকলেই ব্যাকুলতা দেখিয়েছে, চোখের জল ফেলেছে, আবার কবে দেখা হবে বলে হা-হুতাশ করেছে। কেউ কেউ ডাক ছেড়েও কেঁদেছে, কিন্তু সত্যর নিজেরই যেন ভেতরের শিকড় ছিঁড়ে গেছে। তাই নিজেও সে চোখের জল ফেললেও, যে প্রাণ নিয়ে এসেছিল সে প্রাণটা নিয়ে ফিরছে না।
