তা ছাড়া
গেলে জাত যাবে কিনা, ম্লেচ্ছর জল খেতে হবে কিনা, জুতো মোজা পরতে হবে কিনা, বরের সঙ্গে “ল্যাণ্ডে ফেটিং” চড়ে গড়ের মাঠে হাওয়া খেতে যেতে বাধ্য হতে হবে কিনা ইত্যাদি বহুবিধ খাপছাড়া প্রশ্ন তো আছেই।
অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিয়ে ক্লান্ত সত্য এক সময় বলে ওঠে, বাব্বাঃ! নিজের পাঁচালীই গাইলাম এই অবধি, তোমাদের খবরাখবর কিছু শুনতে দাও?
মোক্ষদা ক্লান্ত আর্ত কণ্ঠে বলে ওঠেন, আমাদের আবার খবর! যারা মরে নি তারা এখনো বিধাতার অন্নজল ধ্বংসাচ্ছে এই খবর।
বাঃ, ও কি কথা!
ঠিক কথাই বলেছি সত্য। চিরটাকাল তোকে মুখ, করেছি, ভেবেছি হাড়ির হাল হবে তোর। এখন দেখছি তুই-ই টেক্কা মারলি! তুই-ই দেখালি! বেশ করেছিস এ মতলব করেছিস। এখন সবাই বলছে ইংরিজি বিদ্যের জয়জয়কার। ছেলে দুটোকে যদি কলকেতায় ইংরিজি ইস্কুলে দিতে পারিস
শিবজায়া সম্প্রতি বিধবা হয়েছেন এবং কিছুক্ষণ আগে গগণভেদী চিৎকার করে সত্যকে বুঝিয়েছেন, সত্যর মা পরম পুণ্যবতী ছিল, মরে পুণ্যের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে গেছে এবং জগতে যে যেখানে শাঁখা-নোয়ার গৌরব নিয়ে এখনো টিকে আছে, তারা যেন এই বেলা সেই গৌরব বজায় থাকতে পৃথিবী থেকে সরে পড়ে। এখন শিবজায়া মুখে কাপড় ঢাকা দিয়ে শুয়েছিলেন পোড়ামুখ কাউকে দেখাবেন না বলে।
কিন্তু চিরপ্রতিদ্বন্দিনী মোক্ষদার এই বাক্য শুনেই তাঁর নির্বেদ ভঙ্গ হল। মুখের কাপড় সরিয়ে বলে উঠলেন, বললে ভাল ছোটঠাকুরঝি! জন্ম গেল ছেলে খেয়ে, আজ বলছে ডান! বলি একাল সেকাল সবাইয়ের বাংলা সমসক্রিত’য় চলল, বেশী বিদ্যান হল তো ফার্সি, আর এখন ওই মেলেচ্ছ ভাষা না শিখলে আর
ফার্সিটাও মেলেচ্ছ ভাষা সেজবৌ!
ওমা শোন কথা! জন্মকাল ফাসি’র কথা শুনে এলাম, কই কখনো তো শুনি নি মেলচ্ছ ভাষা!
সত্য এবার কথা বলে, থাক পিসঠাকুমা ওসব জাত থাকা জাত যাওয়ার গপ্পো! ও তোমার যা যাবার সে যাবেই। তা কে রুখতে পারবে? ও কথা ছাড়ো। তোমার এমন হাল হল কি করে তাই বল? এত তীর্থধর্ম করে হাওয়া বদল করে এসেছ, শরীর তো ভাল হবার কথা!
আর ভাল!
মোক্ষদা জিভে একটা শব্দ করেন, আমার ভাল একেবারে সেই যমরাজ এলে তবে। বর তো কখনো চোখে দেখি নি, ওই যম বরের চতুদ্দোলাতে চড়েই যাব। তবে একালে ভাল আর কজন আছে? সেই সেবারও যে গা দেখেছিস সে আর নেই। মানুষের দেবদ্বিজে ভক্তি যাচ্ছে, গুরুলঘু জ্ঞান যাচ্ছে, মানুষ মনিষত্ব সব ঘুচেছে। দেখবি, ঘুরে ঘুরে দেখবি তো? দেখিস সুখ পাবি না।
.
দিন সাতেক থাকার পর ফিরতিপথে অনবরত সেই কথাই ভাবতে ভাবতে চলে সত্য। ভাবে আর মনে মনে বলে, দেখেছি পিসঠাকুমা, দেখে বুঝেছি তোমার কথাই ঠিক। সুখ পেলাম না। সেই আগের গা আর নেই। নেই আগের সুখ আনন্দ তৃপ্তি।
এবারও ছেলেবেলাকার খেলার জায়গাগুলোয় গিয়ে গিয়ে বসে দেখেছে সত্য, চেষ্টা করেছে আগের দিনের সুর বাঁধতে, কিন্তু পারে নি। শেষ পর্যন্ত সেটা হাস্যকর হয়ে উঠেছে। ছেলেদের দেখাবে বলে ফট করে একদিন গাছে চড়তে গিয়েছিল, ছেলেরাই এমন হাঁ হাঁ করে উঠল যে নেম আসতে হল। সেই সাঁতারের পীঠস্থান বড় দীঘিতে গিয়ে সাঁতার দিয়েছে, সুখ পায় নি। নোনা আতা আর নোড় কুড়োতে গিয়ে কেমন যেন পাগলামি মনে হয়েছে, তবু কুড়িয়ে এনে ঘেঁচে আচার করবে বলে রেখে দিয়ে ফেলে রেখেছে। বুঝেছে সুখ পাবে না ওতে।
সুখ তো সবটা নিয়ে।
সেই সবটা, সম্পূর্ণটা, অখণ্ডটা কোথায়? কোথায় সেই আগের সঙ্গী-সঙ্গিনীরা?
আর কোন্খানে সুখ পাবে সত্য? এর মাঝখানে কোথায় খুঁজে পাবে রামকালী চাটুয্যের সেই মাঠবেড়ানো সেই দস্যি মেয়েটাকে? যাকে খুঁজে পাবার জন্যে এত তোড়জোড় করে আসা?
আর সেই মেয়েটার মা, তার ছায়াও কি থাকতে নেই? সব ধুয়ে মুছে পরিস্কার হয়ে গেছে? বদলে গেছে।
সব বদলে গেছে।
সত্যর সেই চেনা জগৎটি অদৃশ্য হয়ে গেছে। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে সত্যর আসনটি। সত্যর জন্মভূমির মাটিতে সত্য এখন আগন্তুক, বহিরাগত। এখন এখানে চোখের সামনে অন্যায় ঘটতে দেখলেও চুপ করে যেতে হয় মনে হয়, থাক! দুদিনের জন্যে এসে আর বেপরোয়া দুঃসাহসে বলতে পারা যায় না, এ বাপু তোমাদের অন্যায়ই।
নইলে এ কদিনে দেখলেও তো কম নয়। অনেক অন্যায্য ঘটনা ঘটছে এখন সংসারে। তার কারণ বাবাই যেন কেমন একটু উদাসীন হয়ে গেছেন। আগে পাড়ার ছেলেদের এতটুকু বেচাল করবার জো ছিল না, এখন বাড়ির ছেলেরাও ওঁর সামনেই যা ভয় করে, আড়ালে সমীহর বালাই নেই।
পাড়াতেই কত দেখল।
জটাধার বৌ এখন গলা তুলে শাশুড়ীর সঙ্গে ঝগড়া করে। আর জটাদা নাকি বৌয়ের কাছে জোরহস্ত। সত্যর মামারবাড়িতে ভাইয়ে ভাইয়ে হাঁড়ি ভেন্ন হয়ে গেছে। দু বাড়িতে দুদিন নেমন্তন্ন খেতে হয়েছে সত্যকে। তুষ্ট গয়লা পক্ষাঘাত হয়ে বিছানায় পড়ে, তুঠুর বৌ কেঁদে কেঁদে লোকের দোর-দোর ঘুরছে, কিন্তু কেউ আর ওর কাছে ঘি-দুধ নেওয়ার গা করছে না, টালবাহানা করে অন্যের কাছে নিচ্ছে। বলে কিনা, তুষ্টুর বৌয়ের পাতা দই? মুখে করা যায় না। তুষ্টুর বৌ আবার ঘি তৈরি করতে শিখল কবে?
জিনিস একটু যদি নীরেসই হয়, তা বলে চিরদিনের লোকটার দুঃখ-কষ্টর সময় দেখবে না? মানুষ আর জন্তু-জানোয়ারের তবে তফাৎ কি?
