একটা নিঃশ্বাস পড়ল।
মনে করলেন সত্যর কপালে চির দুঃখ। রামকালীর মেয়ে রামকালীর ললাটলিপিই পেয়েছে। কত দুঃখী রামকালী! কত সুখী ছিল ভুবনেশ্বরী!
আগে স্বপ্নেও কল্পনা করেন নি রামকালী, এমন করে কখনো ভাববেন, নিজেকে কখনো দুঃখীর কোটায় ফেলবেন।
নবকুমারের ওই তটস্থ সুরের “আজ্ঞে” শুনে রামকালী মৃদু হেসে আর একবার বললেন, কতক্ষণ বেরিয়েছ?
আজ্ঞে, সেই প্রাতঃকালে দুটো ফেনাভাত খেয়েই
কথাটা বলেই বোধ করি নিজের বেকুবিটা বুঝতে পারে নবকুমার, প্রাতঃকাল কে আরও মোক্ষম করে বোঝাবার জন্যে ওই ফেনাভাতের প্রসঙ্গটা না আনলেই হত। প্রাতঃকালই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু মুখের কথা হাতের ঢিল!
রামকালী ব্যস্ত হয়ে বলেন, সেকি! এতটা সময় লেগেছে। তা হলে তো–না না, আর বসে থাকা নয়। শীঘ্রই হাতমুখ ধুয়ে
নবকুমার এবার কিঞ্চিৎ স্পষ্ট গলায় বলে, না না, ব্যস্ত হবেন না। পথে পালকি নামিয়ে আহার হয়েছে। সঙ্গে জলপান ছিল।
তা হোক। বেলা পড়ে এসেছে। ওরে কে আছিস?
একসঙ্গে অনেকগুলো নানা বয়সের ছেলে এসে দাঁড়ায়। অর্থাৎ এরা আশেপাশে উঁকিঝুঁকি মারছিল, শুধু সামনে আসতে ভরসা পাচ্ছিল না।
রামকালী বলেন, অন্দরে গিয়ে বল গে, বাবাজীর হাতমুখ ধোয়ার ব্যবস্থা করতে।
হাতমুখ ধোয়াটা একটা সাঙ্কেতিক শব্দ। মূল অর্থ জলখাবারের ব্যবস্থা করা। ওরা দু-একজন ব্যস্ত হয়ে চলে যায়, দু-একজন দাঁড়িয়ে থাকে। আর কে একজন খপ করে বলে বসে, জামাইবাবুর কী মজা! কেন কলকাতার বাসায় গিয়ে থাকবে!
রামকালী ঈষৎ চমকে ওঠেন।
ভাবেন, এটা আবার কি কথা!
সত্য তো ঘোমটা ঢাকা অবস্থায় একটা প্রণাম করেই ভেতরে চলে গেছে, নবকুমারের সামনে বাপের সঙ্গে কথা বলে নি, তা ছাড়া ছিল পাড়াপড়শীর হুল্লোড়।
নবকুমার মেয়েদের মত লজ্জার ভান করে বসে আছে। রামকালী ঈষৎ কৌতুকের স্বরে বলেন, কলকাতার বাসার কথা কি বলছে?
প্রশ্নটা নবকুমারকে।
নবকুমার উত্তর না দিয়ে পারে না। তাই আস্তে আস্তে বলে, হ্যাঁ, সেই রকমই স্থির হয়েছে।
শুনে সুখী হচ্ছি। এখন কলকাতায় উন্নতির নানাবিধ পন্থা হয়েছে। কোনও কর্মের চেষ্টা হয়েছে নাকি?
আজ্ঞে হ্যাঁ। মাস্টারমশাই একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
রামকালীর জামাতা, তাই কর্তব্যবোধেই প্রশ্ন করেন রামকালী, কোথায়?
ইয়ে, আ-আজ্ঞে সরকারী দপ্তরে।
সুখের কথা। তা কোথায় থাকবার ঠিক করেছ? মেসে?
আজ্ঞে না। বাসায়। মাস্টারমশাই বাসাও ঠিক করে দিয়েছেন।
রামকালী অবশ্য বেতন কত তা জিজ্ঞেস করেন না, শুধু সামান্য চিন্তিত স্বরে বলেন, তা হলে তো পাঁচকের ব্যবস্থা করতে হবে। একা বাসা নিয়ে–
নবকুমার আর বেশীক্ষণ লজ্জা বজায় রাখতে পারে না, পুলক গোপনের উচ্ছ্বসিত আভা মুখে মেখে বলে ওঠে, পাচকের দরকার হবে না। তুড়ু খোকার মা, ইয়ে, আপনার মেয়েই তো যাচ্ছে!
আমার মেয়ে! সত্য! সত্য! কলকাতায় বাসায় যাচ্ছে!
নবকুমার থতমত খেয়ে চুপ করে যায়। বুঝতে পারে না রামকালীর এই স্বরটা ঠিক কোন ভাবব্যঞ্জক। একটু যেন বিচলিত মনে হল না?
হ্যাঁ, কিঞ্চিত বিচলিত হয়েছেন রামকালী।
অনেকদিন আগের একদিনের কথা মনে পড়ে গেছে।
বালিকামূর্তি নিয়ে সত্য ভেসে উঠেছে চোখের সামনে। আর তার সামনে ভেসে উঠেছে আর একখানা ভয়ব্যাকুল মুখ। সেই মুখের সামনে আঙুল তুলে বলছে সত্য, তোমার যে এত ভয় কিসের মা! এই তুমি দেখে নিও, কলকাতায় আমি যাব, যাব, যাব!
সত্য তার প্রতিজ্ঞা রাখছে, কিন্তু তা দেখে গর্বে আনন্দে বিস্ময়ে পুলকে কে মুগ্ধ হবে?
নিঃশ্বাস গোপন করে বললেন, সাহস করতে পারছে সুখের বিষয়। তা তোমার মাতাপিতার ব্যবস্থা?
দিদি আছে। পড়শীরা আছে।
হু। তা ওঁরা আপত্তি করলেন না?
এবার আর নিজেকে সংবরণ করা দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে নবকুমারের। প্রায় একগাল হেসে ফেলে বলে, আপত্তি কি আর তারা না করেছেন। কিন্তু আপত্তি টিকলে তো? এ ধুয়ো ধরল, ছেলেদের ভাল ইস্কুলে পড়ানো চাই! বুদ্ধির রাজা তো!
ওর ওই উদ্ভাসিত মুখের দিকে তাকিয়ে সহসা ওর ওপর ভারী একটা স্নেহ অনুভব করলেন রামকালী। অন্দরে পাঠিয়ে দিলেন নবকুমারকে।
.
অন্দরের অবস্থা তখন হাস্যমুখর। সত্যর ছেলেদের নিয়ে ঠাট্টা-আমোদ চলছে দিদিমা সম্পর্কীয়াদের। সত্যকে ঘিরে বসেছে বাকী সবাই।
রাসুর নতুন বৌ, শিবজায়ার আইবুড়ো নাতনীরা, রাসুর দুই ভাদ্রবৌ আর ভাগ্নী দুটো এবং পড়শীবাড়ির নবীন-প্রবীণার দল। মোক্ষদার বেশী কথা বলার ক্ষমতা আর নেই, তবু আসরের একপাশে বসে আছে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে। শুধু সারদা এ আসরে অনুপস্থিত। সারদার মরবার সময় নেই।
তার ঔদাসীন্যের কাছে সত্যর নতুনত্ব, অপূর্ব, বৈচিত্র্যের বহুমুখিত্ত্ব, সব কিছুই পরাস্ত মেনেছে।
কিন্তু আর সবাই তো সারদা নয়, তাই প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে নিজে আর কাউকে কোনও প্রশ্ন করবার সময় পাচ্ছে না সত্য। অথচ সে তো নিজেকে দেখাতে আসেনি, সবাইকে দেখতে এসেছে।
কিন্তু কৌতূহল যে সকলেই অদম্য। দু-দুটো ছেলে হয়ে গেল, তারা ডাগরটি হল, যোগাযোগ তো নেই। ওরা অবিশ্যি ছেলেদের অন্নপ্রাশনে বলে পাঠিয়েছিল, কিন্তু রামকালী তো তখন তীর্থে ঘুরছেন। তবে ফিরে এসে তো কই—?
কিন্তু এত দিন কেন আসে নি সত্য আর এখন এমনই হুট করে এল কেন, এ প্রশ্ন চাপা পড়ে গেল। এখন প্রশ্ন কলকাতার বাসা! সেইখানেই সহস্র কৌতূহলের প্রশ্ন। কে সাহস দিল সত্যকে? কে দেখবে সেখানে সত্যকে? শ্বশুর-শাশুড়ী বেঁচে থাকতে বরের সঙ্গে বাসায় যাবার পরিকল্পনটা তার মাথায় এলোই বা কি করে, আর তাদের অনুমতিই বা পেল কোন্ অলৌকিক সাধনার জোরে?
