কলকাতায় গিয়ে দুটো কামিজ করাতে হবে আর একজোড়া সু-জুতো। এ নইলে তো আর অফিসে যাওয়া যাবে না।
ভবতোষ তাদের জন্যে একটা বাসাও ঠিক করে রেখেছেন নাকি। নিজে তিনি মেসে থাকেন, কিন্তু নবকুমারের তো তা চলবে না। সে যখন ফ্যামিলি নিয়ে যাচ্ছে। নিতাইটার মন্দ কপাল। ওর বৌকে বাসায় আনতে পারবে না। নিতাইয়ের মামা বলেছেন, বৌ কলকাতার বাসায় গেলে তার হাতে আর তাদের খাওয়া চলবে না।
এত বড় শাস্তির ভয় তুচ্ছ করে বরের সঙ্গে বাসায় যাবে এত সাহস নাকি নিতাইয়ের বৌয়ের নেই।
অতএব নিতাইকেও নবকুমারের হাঁড়িতে জায়গা দিতে হবে। বৌটাকে যদি আনতে পারত নিতাই! বেশ দুটো বৌতে থাকত একসঙ্গে। হোক বামুন-কায়েত, কেউ কারুর ভাতের হাঁড়ি নাড়তে না যাক, দুজনে একত্রে বসা, গল্প করা, চুল বাধা, পান সাজা, এসব তো করতে পারত।
তা হবার জো নেই।
বেচারী নিতাইটাকে তাদেরই একটু যত্ন-আত্তি করতে হবে।
ভবতোষ বলেছেন, খুব খাসা বাড়ি। তিন-চারখানা ঘর, মস্ত দরদালান। রান্নাঘর, ভাড়ারঘর, উঠোন, কুয়োতলা। জলের কলও নাকি আছে। বাড়ির ভেতরে নয়, দরজার কাছে। থাক। তার জল খেয়ে জাতজন্ম না খোয়ানোই ভাল, কুয়োর জল যখন আছে!
সে যা হয় হবে।
প্রধান কথা ভাড়া। বড্ডই গায়ে লাগবে। বাপের কাছ থেকে তো আর টাকা চাইতে যাবে না নবকুমার!
কিন্তু ভবতোষ বলেছেন, কলকাতায় ও-রকম বাড়ি দশ টাকাতেও সহজে মেলে না, নেহাত বাড়িটা ভবতোষের এক বন্ধুর বাড়ি বলেই আট টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।
হোক।
নবকুমার তো তেমনি মাইনেও পাচ্ছে আটান্ন টাকা! এত বড় মোটা মাইনের চাকুরের পক্ষে ওতে কাতর হওয়া ঠিক নয়।
যাক তাই হোক।
তা বলে নিতাইয়ের প্রস্তাব সে নেবে না! নিতাই বলেছে, ভাড়ার ভাগ দেবে। না, ছিঃ! নবকুমারের এত বন্ধু নিতাই, তাই কখনো নেওয়া যায়?
কিন্তু কে জানে সেখানে সত্যর মেজাজ কেমন থাকবে! এখানে তো ক্ষণে রুষ্ট ক্ষণে তুষ্ট, সেখানে যতই হোক নিতাই একটা পর ছেলে! সত্য যদি তার সামনে মেজাজ দেখায়!
নাঃ, তা বোধ হয় করবে না।
সেদিকে সভ্য আছে।
এখন কবে সেই দিনটি আসে! যবে সেই অজানা অচেনা দরদালানে বসে দুই বন্ধু অফিসের ভাত খাবে! আর সত্য এলোচুল দুলিয়ে কোমরে কাপড় জড়িয়ে ছুটোছুটি করে রান্না করবে! পরিবেশন করবে!
এই সমস্তই সম্ভব হবে সত্যর শক্তিতে।
বিগলিত প্রেমে সত্যর দিকে তাকিয়ে দেখে নবকুমার।
কিন্তু সত্যর তখনও দৃষ্টি লক্ষ্যভেদী, নাসারন্ধ্র স্ফীত, সমস্ত চেতনা একাগ্র। সহসা চেঁচিয়ে ওঠে সে, ওই তো, ওই তো জটা-দাদাদের বাড়ির চিলেকোঠা, ওই গাঙ্গুলি-কাকাদের উঠোনে বাজপড়া নারকোল গাছটাও বেহারারা, ডান দিকে ডান দিকে।
পথ দেখিয়ে দেওয়ার ভার সে নিজে নিয়েছে।
.
পালকি নামাতেই একটা বিরাট চাঞ্চল্যে ঢেউ উঠেছিল, তার পর জানা হতেই আকাশ থেকে পড়ল সবাই। না বলা না কওয়া এমন করে মেয়ে কেন উপস্থিত? এমন তো হবার কথা নয়!
কি মূর্তি নিয়ে নামছে?
কে ফেলে দিয়ে যেতে এসেছে?
ওগো না গো না!
ষড়ৈশ্বর্যময়ী রাজরাণীর বেশে এসেছে সে কার্তিক-গণেশের হাত ধরে, ভোলানাথকে সঙ্গে করে!
মন কেমন করছিল তাই দেখতে এসেছে বাপকে, বাপের বাড়ির সবাইকে। এসেছে জন্মভূমিকে দেখতে।
বারবাড়ির কলরোল মিটিয়ে অন্দরমহলের দিকে এগোল সত্য, চারিদিকে বিভ্রান্ত দৃষ্টি মেলে।
আর যেই ভেতর-বাড়ির উঠোনে পা ফেলল, তুমুল একটা কান্নার রোল উঠল। বিলাপধ্বনি মিশ্রিত রোল।
আলাদা করে বোঝবার উপায় নেই গলা কার। ঐকতান বাদন। বাড়ির সকলের সঙ্গে পাড়ার মহিলারও যোগ দিয়েছেন অনেকে।
কিন্তু নতুন কার জন্যে বিলাপ? ভুবনেশ্বরীর ঘটনা তো অনেক দিনের হয়ে গেছে।
না, বিশেষ কারও জন্যে বিলাপ নয়, আর সদ্য শোকের কাতরতাও নয়। খানিকটা সত্যর আবির্ভাবে আনন্দাশ্র আর বাকীটা সত্যর এই দীর্ঘ অনুপস্থিতিকালের মধ্যে সংসারের যা যা শোকাবহ ঘটনা ঘটেছে, তারই ফিরিস্তি জানিয়ে নতুন করে বিলাপ-ক্রন্দন।
এই ক্রন্দনরোলের মাঝখানে দিশেহারা সত্য ছেলে দুটোর হাত ধরে উঠোনের একধারেই দাঁড়িয়ে থাকে, আর বারবাড়িতে নবকুমার উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি মেলে উৎকর্ণ হয়ে বসে থাকে। সামনে শ্বশুর বসে, কিন্তু তাকে প্রশ্ন করবে এত বুকের পাটা নবকুমারের নেই। সেই যে প্রণাম করে ঘাড় হেট করে বসেছে, বসেই আছে।
তা ছাড়া তিনি তো দেখা যাচ্ছে নির্বিকার। বাড়ির মধ্যে এত বড় ক্রন্দনরোল যখন ওঁকে তিলমাত্র বিচলিত করতে পারছে না, তখন ব্যাপারটায় গুরুত্ব নেই বলেই মনে হচ্ছে।
নবকুমারও পাড়াগাঁয়ের ছেলে। মেয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে এলে কান্নাকাটির ঘটনা তার একেবারে অজানা নয়, তাই ক্রমশ সে নিশ্চিন্তে হয় আর রোলটাও আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে আসে।
ঈষৎ নড়েচড়ে রামকালীই কথা বলেন।
কখন বেরিয়েছ?
আজ্ঞে–! নবকুমার চমকে তাকায়।
রামকালী তাকিয়ে দেখেন। একটি স্বাস্থ্যবান সুকান্তি পুরুষের দেহে এখনো যেন একখানা লাজুক কিশোরের মুখ! সুন্দর সুকুমার, কিন্তু বুদ্ধির ছাপ খুঁজে পাওয়া যায় না। মনে মনে মৃদু আক্ষেপের হাসি হাসেন। একে স্নেহ করা যায়, ভরসা করা যায় না। হয়তো এই জন্যেই ভগবান সত্যকে অমন দৃঢ় মজবুত করে গড়েছেন, ও লতার মত আশ্রয় চাইবে না, বনস্পতির মত আশ্রয় দেবে।
