এলোকেশী স্ব-স্বভাবে এসে পড়েন।
ভেঙিয়ে উঠে বলেন, বাপ উদ্দিশ করে না। বাপের বাড়ি যাবে কোন্ সুবাদে?
বাপকে একবার পেন্নাম করতেই যাব। সত্য আকাশের দিকে তাকিয়ে উদাস মুখে বলে, মা বাপের কর্তব্য আছে, সন্তানের নেই?
তা বেশ, কোর্তব্য করো। যেও বাপকে পেন্নাম করতে। আমার ছেলে বিনি আভ্যানে যাবে তা বলে রাখছি।
সত্য উঠে দাঁড়িয়ে বলে, এমন এক-একটা অনাছিষ্টি কথা বল তুমি! তোমার ছেলেকে তুমি আটকাবে তো আমি এতখানি রাস্তা যাব কি পাড়ার লোকের সঙ্গে!
তোমার আবার সঙ্গ! এলোকেশী পিচ্ করে একটা পিচ ফেললেন, ডাকাতে তোমায় দেখে ভয় পাবে মা!
পেলেই মঙ্গল। সত্যও কথায় ইতি টানে, তবু লোকসাক্ষী একটা বেটা-ছেলে সঙ্গে থাকা ভাল। আর বাবাকে পেন্নাম করা তো বাবার জামাইয়েরও কাজ!
ইল্লিমারি টুসকি! আরও কত শুনব! বলে, রাখালি কত খেলাই দেখালি! শ্বশুর আবার কবে কার গুরুঠাকুর হল, তা তো জানি না!
মেয়েমানুষের যদি এত হয় তো বেটাছেলের একেবারেই বা হবে না কেন, তাও তো জানি নে মা। মা-বাপ উভয় পক্ষেই গুরুজন। বলে এবার উঠেই যায় সত্য।
জানত এই রকমই হবে। তাই আর অনুমতি চাওয়ার প্রহসনটা করতে চেষ্টা করে নি।
.
প্রবলের জয় অবশ্যম্ভাবী।
পঞ্জিকা দেখে যাত্রার দিন দেখাও হয়, এবং শুভ মুহূর্ত অনুযায়ী “যাত্রা” করে স্বামী-পুত্রকে নিয়ে পালকিতে গিয়ে ওঠেও সত্য। বিশেষ কোনও বাধা আর আসে না। হালই ছেড়ে দিয়েছে তারা।
পালকি সত্যর শ্বশুরবাড়ির গ্রাম ছাড়ায়, পালকির দরজা সরিয়ে মুখ বাড়ায় সত্য।
নবকুমার বলে, ঘোমটা খুলে মুখ বাড়াচ্ছ কেন? কে কোথায় দেখে ফেলবে!
সত্য পুলক-কম্পিত স্বরে বলে, দেখলেই বা! আর তো এখন আমি শ্বশুরবাড়ির বৌ নয়!
বলছি কি তা নয়?
তবে মুখ বুজে থাক। মুখে তো লেখা নেই বৌ কি ঝি? দেখো না ওখানে গিয়ে কি রকম গাছকোমর বেঁধে দস্যিবিত্তি করে বেড়াই!
বড় ছেলে তুডু’র এসব আলোচনা হৃদয়ঙ্গম হবার বয়স হয়েছে। সে সহসা বলে ওঠে, য্যাঃ! তুই আবার গাছকোমর বাঁধবি কি?—
আবার তুই! সত্য তীব্র ভর্ৎসনায় বলে ওঠে, কত দিন বলেছি মাকে তুই বলতে নেই, তুমি বলতে হয়। তবু
সহসা কথার মাঝখানে হেসে ওঠে নবকুমার, হয়েছে। খুব শাসন হয়েছে। বড় একটা মানুষ ও, তাই সুশিক্ষে দেওয়া হচ্ছে। আমি তো বুড়ো বয়েস অবধি মাকে তুই বলেছি।
সত্যর মুখ কঠিন হয়ে ওঠে। বলে, তুমি যা যা করেছিলে বুড়ো বয়স অবধি, তার দৃষ্টান্ত তুমি অন্য সময় ছেলের কানে ঢেলো। আমি যখন একটা শিক্ষাদীক্ষা দিতে আসব, তখন তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ঝগড়া দিতে এসো না।
বাবাঃ! কী হল? কিসে যে কি হয় তোমার বোঝা দায়!
নবকুমার বোঝে একটু বেকায়দা হয়ে গেছে। ক্ষণপূর্বের সেই পুলকোচ্ছল লাবণ্যময়ী মূর্তি অন্তর্হিত হয়ে গেল ওই কাঠিন্যের আড়ালে। তাই আপসের সুর ধরে সে। সত্যি সত্যবতীর ওই চাপল্য, ওই লাবণ্য, ওই আহ্লাদে আলো হয়ে ওঠা মুখ কী অপূর্ব! কিন্তু বড় ক্ষণস্থায়ী! মুহূর্তে মেঘে ঢাকা পড়ে যায়!
আর যায় নবকুমারেরই বোকামিতে। অথচ নবকুমার কিছুতেই বুঝতে পারে না কিসে কি হয়ে যায়, কিসে কি হয়ে যেতে পারে।
সত্যবতীর নাগাল কোনদিনই কি পাবে সে?
.
কিন্তু সত্যর মুখের মেঘ কাটাতে পেরেছে নবকুমারের আত্মজ।
তুড়ু ইত্যবসরে মায়ের কোল ঘেঁষে বসে বলছে, মামার বাড়ি গিয়ে ভাল ছেলে হতে হয়, না মা? না না, সব বাড়িতেই ভাল ছেলে হতে হয়। শুধু মামার বাড়ি গিয়ে আরো বেশী বেশী ভাল হতে হয়। তা আমি তো সেসব জানিই, কিন্তু ওই খোকা বোকাটা? কিছু জানে না, মামার বাড়ি গিয়ে শুধু অ্যাঁ অ্যাঁ করে কাঁদবে।
ছেলের ওই অ্যাঁ অ্যাঁ ভঙ্গীতে হেসে ফেলেছে সত্য।
না, অন্তত এই পথটুকুতে তেমন ভয় নেই নবকুমারের। মেঘ স্থায়ী হবে না। বুঝি গতির মধ্যেই আছে এক অপূর্ব পুলকের স্বাদ। তাই মুহূর্তে মুহূর্তে কিশোরীর মত উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছে সত্য।
ওগো দেখ দেখ, ওই মাঠে কি কালো গরুটা! ঠিক যেন গয়ার পাথরবাটি। …তুড়ু দেখ দেখ, ওই পুকুরটায় কত পদ্ম ফুটেছে! ছোটবেলায় আমরা ওই পদ্ম গাদা গাদা তুলতাম। মামার বাড়ি চল, দেখাব তোকে সেই পুকুর। আচ্ছা হ্যাঁগো, ওই গাছটা কি বল তো? ঠিক ধরতে পারছি না। পাতাগুলো বেশ কেমন নতুন ধরনের। ওমা ওমা, কী চমৎকার বুনো ফুল বুনো ফুল গন্ধ এল! ঠিক আমাদের ওখানের মতন!
নিজের খুশিতে নিজের সঙ্গেই কথা বলে চলেছে সত্য, স্বামী-পুত্র উপলক্ষ মাত্র।
নবকুমার হাঁ করে চেয়ে থেকে সেই মুখের দিকে।
এতদিন ঘর করছে, দু-দুটো ছেলের বাপ হল, এমন প্রকাশ্য দিনের আলোয় এত স্পষ্ট করে কবে এমনভাবে তাকিয়ে থাকতে পেরেছে তার লাবণ্যময়ী স্ত্রীর মুখের দিকে!
বাসায় যাওয়ার ভয়টা একটু কমে এসেছে, এখন বরং একটু একটু রোমাঞ্চময় উন্মাদনা। সেখানে গুরুজনের রক্তচক্ষুর ভয় নেই, নেই পাড়া-পড়শীর গুরুভয়।
শুধু নবকুমার আর সত্য!
চাকরির ভয়টা খুব জোর আছে। তবে ভাবতোষ মাস্টার প্রচুর ভরসা দিয়েছেন। বলেছেন নবকুমার যা ইংরিজি জানে, তার সিকি ইংরিজি শিখেও সাহেবের অফিসে কাজ করছে কত লোক। নবকুমার ঢুকতে না ঢুকতে সায়েবের নেকনজরে পড়ে যাবে নির্ঘাত। আরো বলেছেন, গ্রামে পড়ে থেকে জমিজমার উপস্বত্বে জীবন কাটানোর ইচ্ছেটা এ যুগে অচল ইচ্ছে।
