অতএব সে জীবনটা নিয়ে সত্য যা করতে পারে করুক। যে দেশে অসুখ করলেই সাহেব ডাক্তার পাওয়া যায়, মৃত্যুভয় বলে বিভীষিকাটাই থাকে না, সত্য যদি নবকুমারকে সেই দেশে নিয়ে গিয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, সেই চাওয়াটাকে আর হাস্যকর অবান্তর বলে উড়িয়ে দেয় না নবকুমার।
কাজেই সত্যর কাজ কিছুটা সহজ হয়ে এসেছে। হয়তো এই জন্যেই লোকে বলে থাকে, ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্যে। নবকুমারের এই মারাত্মক রোগটাও শেষ অবধি সত্যর জীবনে অন্তত সত্যর মতে, পরম মঙ্গল ডেকে এনেছে। ছেলেদের মানুষ করতে চায় সত্য, মানুষের মত মানুষ। আর সে মানুষ হতে হলে জগৎটাকে দেখতে হয়।
অবশ্য তার পরও কি আর কাঠখড় পোড়াতে হয় নি? অনেক হয়েছে। অবশেষে আস্তে আস্তে মেঘ কেটে সূর্যকিরণের আভাস দেখা যাচ্ছে।
ভবতোষ মাস্টারের চেষ্টায় নিতাই আর নবকুমারের এক-একটা চাকরি যোগাড় হয়েছে কলকাতায়। নিতাইয়ের রেলি ব্রাদার্সে, নবকুমারের সরকারী দপ্তরে।
অতএব ওদের এখন এক পা রথে এক পা পথে। নবকুমার অবশ্য মা-বাপের কাছে নিজে প্রস্তাব করে নি, করতে পারে নি, সত্যকেই বলতে হয়েছে। তবে কথা বন্ধ করেছেন তারা ছেলে বৌ দুজনের সঙ্গে।
এলোকেশী আজকাল খাওয়া শোওয়া ব্যতীত বাড়িতে থাকেন না বললেই হয়। আর নীলাম্বর সন্ধ্যার দিকে হরিসভায় যেতে শুরু করেছেন।
কিছুদিন আগে পর্যন্ত সদু সত্যর উপর একটু খাপ্পা ছিল। কিন্তু সত্যর সাহেব ডাক্তার ডাকা রূপ অসাধ্য সাধনের পর থেকে সদুও যেন কেমন মহিমাস্তব্ধ।
মাঝে মাঝে নিজের জীবনের খাতাটাও বুজি উল্টো দেখতে শুরু করেছে আজকাল সদু। সদু যদি ওই রকম নির্ভীক হতে পারত! পারলে হয়তো সদুর জীবনটা এমন বরবাদ হয়ে যেত না। হয়তো বিপথগামী স্বামীকে সুপথে টেনে এনে সংসার করতে পারত। কিন্তু সত্যর মত বলার শক্তি সদুর নেই। সত্যর মত বলতে জানে না সদু মনে-জ্ঞানে যে কাজে দোষ দেখব না, পাপ দেখব না, সে কাজে নিন্দের ভয় করব কেন? নিন্দে সুখ্যাতির ভয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকাটাও তো এক রকম স্বার্থপরতা। কিসে লোকে আমায় নিন্দে করবে, আর কিসে আমার সুখ্যাতি করবে এই চিন্তায় যদি স্বামী-পুত্তুরের ভালটি পর্যন্ত না দেখি সেটা তো ঘোর স্বার্থপর কাজ। ১৮৬
সদু উঠে-পড়ে লেগে স্বামীকে শোধরাতে পারত, তা পারে নি সদু, ভয় খেয়েছে। সদু মামার বাড়িতে এসে অকারণে মামা-মামীকে বাঘের মত ভয় করে মরেছে। ন্যায়-অন্যায় কথাটি কখনো বলতে পারে নি। সদু ভীতু।
সত্য সাহসী।
তাই সত্য আজ ডোবার ঘোলা জল থেকে মুক্ত হয়ে সাগরে তরী ভাসাতে গেল।
পাড়াপড়শীর ঘরে সত্যর বয়সী যে সব বৌ-ঝি আছে, তাদের মধ্যেও সত্য একটা আলোড়ন এনেছে বৈকি। তাদের দিনরাত্রির চিন্তার অনেকখানি দখল করে রেখেছে সত্য।
কী আশ্চর্য!
কী বিস্ময়!
কী অলৌকিক!
ঠিক তাদেরই মত একটা মেয়েমানুষ স্বামীপুত্র নিয়ে কলকাতায় বাসায় যাচ্ছে! আর কিসের কবল থেকে? না এলোকেশীর মত ভয়ঙ্করীর কবল থেকে! ওদের স্বামীরা এখন কিছুদিন যাবৎ দাম্পত্যসুখের মাধুর্য থেকে বঞ্চিত। কারণ সেই নিভৃত নির্জনে তাদের স্ত্রীরা এখন অনবরত নবকুমারের সাহস ও প্রেমের দৃষ্টান্ত দেখাচ্ছে।
হতভাগ্য স্বামীরা নবকুমারকে ‘স্ত্রৈণ’, ‘মেয়েমানুষের বশ’ ইত্যাদি বিশেষণে ভূষিত করেও বিশেষ সুবিধা করতে পারছে না।
তবে বৌগুলোর অসুবিধে এই সত্যর সঙ্গে একবার নির্জনে দেখা করে স্বামীদের স্ত্রৈণ করে তোলবার মন্তরটা শিখে নেবে এ উপায় নেই। বাঁড়ুয্যে-গিন্নীর বৌয়ের সঙ্গে মেশার ব্যাপারে তাদের প্রতি কড়া নিষেধ আছে, আর ঘাটে আসার সময় শাশুড়ী পিশাশুড়ী কি বড় ননদ, নিদেনপক্ষে একটা পুঁচকে ননদও পাহারাদার থাকে।
অতএব মন্তর শেখা হয় না।
অবশ্য ওপরওয়ালাদের শুনিয়ে তারা সত্যকে ছিছিক্কার দেয়। যে মেয়েমানুষ বুড়ো শ্বশুর শাশুড়ীর সেবারূপ মহৎ কর্মে জলাঞ্জলি দিয়ে ছেলেদের ভাল ইস্কুলে পড়াব ছুতো করে বাসায় যায়, সে মেয়েমানুষকে শত ধিক দেবে না আর মেয়েমানুষরা?
কিন্তু দিক।
সত্যর কানে এসব আসেও না।
এলেও সত্যর কানের ভিতর দিয়া মরমে পশে না। সে তখন শুধু যাবার প্রস্তুতিসাধনে যত্নবতী।
এই সময় কথাটা একদিন পাড়ল সত্য।
হয়তো সেটাকেও ওই প্রস্তুতি হিসেবেই ধরেছে সে। অথবা এক অনিশ্চিতের পথে পা বাড়াবার আগে জন্মের শোধ জন্মভূমিকে দেখার বাসনা তাকে প্রবলভাবে পেয়ে বসে। কারণটা যাই হোক, কথাটা পাড়ে সত্য, যাবার আগে একবার ওখানে ঘুরে আসব।
ঘুরে আসতে ইচ্ছে করছে অথবা ঘুরে আসলে ভাল হয়, কি ঘুরে আসা কর্তব্য এসব ভাষার ধার দিয়ে যায় নি সত্য।
ঘুরে আসব!
তার মানে ব্যাপারটা স্থির সিদ্ধান্তের কোঠায়। এখন ব্রহ্মার ব্যাটা বিষ্ণু এলেও সে সিদ্ধান্তের রদ হবে এ আশা নেই কারো।
এলোকেশী বিরস মুখে বলেন, যাবে ভাল কথা। তা আমাকে বলতে এলে কেন? শুধোচ্ছ? নাকি অনুমতি নিচ্ছ?
হ্যাঁ, কথা আবার কইছেন এলোকেশী বৌয়ের সঙ্গে। তার কারণ কথা কওয়াই তার রোগ। মুখ বুজে দু-দণ্ড থাকা তার কোষ্ঠীতে নেই। কথা বন্ধ করব ভেবেও কয়ে ফেলেন।
সত্য তার বড় বড় চোখ দুটো একবার তুলে তাকিয়ে দেখে বলে, নাঃ, সে মিথ্যে রঙ্গর দরকার দেখি না। যাব যখন মনস্থ করেছি, যাওয়ার ব্যবস্থাই করতে হবে। জানানটা দিলাম, ঠাকুরকে বলবেন পঞ্জিকাটা একবার দেখে দিতে।
