এ যেন প্রতিবেশীর গালে আচমকা একটা থাপ্পড় বসিয়ে দেওয়া! আবার সাহেবের পায়ে ধরে কাঁদতে বসেছে।
হ্যাঁ, প্রায় পায়েই পড়েছিলেন নীলাম্বর, ও সাহেব, আমি কিছু জানি না, আমি কোনও দোষে দোষী নয়। ঘরে আমার ছেলে মরছে।
সাহেব যে ভারী গলায় আশ্বাস দিল, ভয় না আছে। রোগী ভাল হইয়া যাবে– তাও তাঁর কানে ঢুকল না।
কানে ঢুকল ভবতোষ মাস্টারের কথা।
এ কী, এ রকম করছেন কেন? কলকাতা থেকে ডাক্তার এসেছেন নবকুমারের চিকিৎসার জন্য!
নীলাম্বর তাকিয়ে দেখলেন।
নিতাইকেও দেখলেন।
মুহূর্তে অনুভব করলেন, কোথাও একটা কিছু ষড়যন্ত্র ঘটেছে। তার সঙ্গে সঙ্গেই সেই ষড়যন্ত্রের নায়িকা হিসাবে সত্যর চেহারাটাই চোখের উপর ভেসে উঠল।
কিন্তু কি করে কী হল?
তা সে যাই হোক, এখন টু শব্দ চলবে না। বলির পাঁঠার মত কাঁপতে কাঁপতে ভবতোষ মাস্টারের সঙ্গে সঙ্গে নিজের ঘরে চোরের মত ঢুকলেন নীলাম্বর।
সত্য নিশ্চল প্রস্তর-প্রতিমার মত দাঁড়িয়েছিল সেই রুগীর মাথার কাছে বাগানের দিকের জানলায়। কপাটটা এমন ভাবে আড় করে রেখেছিল, যাতে সে নিজে ঘরের মানুষদের দেখতে পায়, ঘরের মানুষরা তাকে দেখতে পায় না।
ভবতোষ মাস্টারের সঙ্গে সঙ্গে যখন তার চাইতে প্রায় হাতখানেক লম্বা দশাসই গড়ন লাল টকটকে মানুষটা ঘরে ঢুকল, কেন কে জানে বুকটা কেঁপে উঠল সত্যবতীর। তার পর হঠাৎ দু চোখ ভরে জল উপচে এল।
দৃশ্যত হাতজোড় করল না, মনে মনে প্রণামে বলল, বাবা, তোমার আস্পদ্দাওলা অবাধ্য মেয়েটাকে মাপ করো। দূরে থেকে আশীর্বাদ করো যেন তার হাতের নোয়া, সিঁথির সিঁদুর বজায় থাকে।… বুঝেছি তোমার বুকে দাগা দিয়েছি, কিন্তু আমি তো তোমারই মেয়ে। তেজ বল, অহঙ্কার বল, তোমার স্বভাব থেকেই তোমার মেয়েতে বর্তেছে।
তারপর মা’র মুখখানা মনে করতে চেষ্টা করল। বলল, মা, তোমার নামে দিব্যি গেলে বাবার ওষুধ ফেরত দিয়েছি, তোমার নামে যেন কলঙ্ক না পড়ে।
কালী দুর্গা চণ্ডী শিব, এত সব জানে না সত্য, জীবনের সাক্ষাৎ দেবতার কাছেই বার বার আশীর্বাদ প্রার্থনা করে।
সাহেব ডাক্তারের ওষুধ ধন্বন্তরী হোক!
আবার তার চির-কৌতূহলী চিত্ত ওই ভয়ঙ্কর গম্ভীর মুহূর্তেও হঠাৎ অজানতে কখন নেহাৎ ছেলেমানুষের মত কৌতূহলী হয়ে ওঠে। বিস্মিত পুলকে দৃষ্টি বিস্ফারিত করে দেখে, ডাক্তার কিভাবে রোগীর বুকে পিঠে নল বসাচ্ছে আর সেই নলের দুটো মুখ নিজের কানে ঢুকিয়ে গম্ভীর মুখে বসে আছে।
একটু পরে শুনতে পেল, ভারী ভারী একটা গলা উচ্চারণ করছে, ভয় না আছে। ভাল হয়ে যাবে।
স্লেচ্ছকে দেবতা ভাবলে কি পাপ হয়?
তার পর রঙ্গমঞ্চের সমারোহ মিটল।
যারা ডাক্তারকে নিয়ে এসেছিল, তারা তার সঙ্গেই সরে পড়ল। আর উদ্যত বজ্র হাতে নিয়ে দু দুটো মানুষ নিশ্চেতনের মত নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে রইলেন।
বাঁড়ুয্যে আর বাঁড়ুয্যে গিন্নী।
মাটির পুতুলের মত বসে আছেন দুজনে। বুঝতে পারছেন না, এই অবস্থায় ঠিক কোন পথে চলা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
না, বজ্ৰ বোধ করি ওঁদের মাথায় পড়েছে!
নবুর কথা ভুলে গেছেন ওঁরা।
অপেক্ষাকৃত সচেতন ছিল সদু।
সে চলে যাবার আগে নিতাইকে হাতছানি দিয়ে ডেকে, ডাক্তার কি কি নির্দেশ দিয়ে গেল তা ভাল করে বুঝিয়ে দিয়ে যেতে বলেছিল। এবং সেই ফাঁকেই ঝপ করে বলে বসেছিল, টাকা কে দিল রে? মাস্টার?
নিতাই মাথা চুলকে বলে, না, মানে ইয়ে–ব্যাপারটা কি জান সদুদি, বৌঠান হঠাৎ সেদিন ঘাটের পথে ডেকে কেঁদে পড়ে
সদু থামিয়ে দেয়, ঈষৎ কঠিন সুরে বলে, বৌ যার-তার কাছে কেঁদে পড়বার মেয়ে নয়। ভণিতা রেখে সত্যি কথাটা বল! ঝপ করে বল!
নিতাই অতএব সত্যি কথাই বলে।
ঘাটের পথে নিতাইয়ের হাতে গলার হার খুলে দিয়ে বলেছে সত্য, আমার যেমন স্বামী তোমারও তেমনি বন্ধু। সেই বুঝে কাজ করবে। কলকাতায় গিয়ে এই হার বিক্কিরি করে সাহেব ডাক্তার নিয়ে এস। ওপর হাতের তাগা-জোড়াটাও খুলে দিতে চাইছিল, নিতাই নিবৃত্ত করেছে।
.
রোগীর ঘরে কেউ নেই।
সত্য আস্তে আস্তে এসে বিছানার কাছে দাঁড়িয়েছিল, সদু ঢুকতে এসে ফিরে গেল। মনে মনে বলল, বাঁচে যদি তো তোর পুণ্যেই বাঁচবে বৌ। বেহুলা মরা স্বামী নিয়ে স্বর্গ পর্যন্ত ধাওয়া করেছিল, সাবিত্রী যমরাজের পেছনে ছুটেছিল। যুগে যুগে তারা সকলের পূজো পাচ্ছে।
একটু পরে আবার যেতে গিয়ে শুনতে পেল বৌ শাশুড়ীর কাছে এসে নরম গলায় বলছে, সাহেব ডাক্তারের ওষুধে তো তোমরা সর্বদা ছুঁতে পারবে না, রুগীর ভারটাই বরং আমাকে দিয়ে রান্নাঘরটা তুমি।
এলোকেশী নড়েচড়ে শুকনো গলায় বলে ওঠেন, তা এখন তুমি যা বলবে তাই শিরোধায্য করতে হবে! মহারাণী ভিক্টোরিয়ার নিচেই তুমি! তা রান্নাঘরের ভার না হয় বাদী নিল, তোমার ছেলেদের ভার কে নেবে?
সত্য আরও নম্র গলায় বলে, ঠাকুরঝির কাছেই তো বেশী থাকে ওরা।
থাকে বলে গলায় চাপাতে হবে?
জগতে সবই সম্ভব। সদুর দিকে টেনেও কথা বলেন এলোকেশী! সদু পরবর্তী কথা শোনার জন্যে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। আবার শুনতে পায় বৌয়ের আরও নরম গলা, ঠাকুরঝি তো ওদের প্রাণতুল্য দেখেন। গলায় চাপা ভাববেন কেন মা?
কিন্তু সত্যের এই নরম গলাটা কেন সদুর চোখে জল এনে দেয়! কেন যেন মনে হয় সত্যর গলায় এই নরম সুর একেবারে মানায় না। ওর সেই জোরালো গলাটাই ভাল। অনেক ভাল।
৩১. সাহেব ডাক্তারের হাতযশে
সাহেব ডাক্তারের হাতযশে, কি সত্যর শাখা-লোহার পুণ্যে, অথবা নবকুমারের নিজেরই পরমায়ুর জোরে বেঁচে গিয়েছিল নবকুমার। কিন্তু ভিতরে ভিতরে কেন কে জানে সত্যকে সে নিজের জীবনদাত্রী বলেই ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে সেই থেকে।
