বলাবলি করছে সবাই, ভেতরে কোনও রহস্য আছে…..বাপের এক মেয়ে তো! আর বড় মানুষ বাপ! নির্ঘাত বাপ কোন কড়ার করে বিয়ে দিয়েছে!… বৌকে বাপের বাড়ি খেদিয়ে দিলে বোধ করি সেই বামুন বদ্যির বিষয়সম্পত্তিগুলো নবা পাবে না। তা নয় তো, সমস্যা সমাধানের সব চেয়ে সোজা উপায়টা ত্যাগ করে বাড়ূয্যে-গিন্নী গালাগালি শূলোশূলি বুক-চাপড়াচাপড়ির ঘুরপথ ধরে মনের ঝাল মেটায় কেন!
বৌ বিদেয় করে দেওয়ার নাটকটা বার বার ঠিক জমে ওঠার মূহুর্তেই ভেস্তে গিয়ে গিয়ে ইদানীং সবাই হতাশ হয়ে গিয়েছিল। এবং নিত্য নতুন একটা ঢেউয়ের যোগানদার হিসাবে সত্যকে বেশ এক রকমের পছন্দই করতে শুরু করেছিল।
আলোচনার একটা বড় খোরাক, আপন আপন ঘরের বৌ-ঝিকে সুশিক্ষা দেবার সুবিধার্থে একটা কুদৃষ্টান্ত, এটাও একটা লাভের অঙ্ক বৈকি।
কিন্তু নবুর জ্বরবিকারে পড়া অবধি নবুর বৌয়ের সমালোচনায় উপযুক্ত ভাষাও খুঁজে পাচ্ছিল না কেউ। বেদে পুরাণে, যাত্রা নাটকে এমন জাহাবাজ মেয়েমানুষ কেউ কখনো দেখে নি, শোনে নি।
কাজেই ভাষাও সৃষ্টি হয় নি ওর জন্যে।
তবু এতদূর বুঝি কেউ দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করে নি। বৌ নাকি নবুর বন্ধু নিতাইয়ের সঙ্গে আড়ালে দেখাসাক্ষাৎ করে গলার দশভরির হারগাছা বিক্রী করিয়ে, ভবতোষ মাস্টারকে দিয়ে ব্যবস্থা করে কলকাতা থেকে সায়েব ডাক্তার আনিয়েছে।
আবার ভবতোষ মাস্টারের সঙ্গেও কথা কয়েছে?
সাহেব ডাক্তারের চিকিৎসায় নবু বাঁচুক আর মরুক সেটা এখন চিন্তনীয় বিষয় নয়, চিন্তনীয় হচ্ছে–বাঁড়ুয্যে সম্পর্কে অতঃপর কিংকর্তব্য।
ব্যাপারটা তো আর এখন গিন্নীদের এলাকায় নিবদ্ধ নেই, সমাজের মাথার মণি পুরুষদের মাথা টলিয়েছে। নবুর বৌ শাশুড়ীর সঙ্গে গলা তুলে কোদল করে, শ্বশুরের সামনে কথা কয়ে বসে, অথবা দজ্জালজনোচিত আরও বহুবিধ অকাণ্ড করে, এ তাঁরা এযাবৎ গৃহিণী মারফৎ শুনে এসেছেন, কিন্তু তাতে বৌটা সম্পর্কে বিরক্ত হওয়া ছাড়া আর কিছু করার ছিল না।
কিন্তু এখন আর “মেয়েলী কাণ্ড” বলে উড়িয়ে দেওয়া চলে না। এখন জাত যাওয়ার প্রশ্ন উঠেছে। হতে পারে বড় য্যে কর্তা সমাজের মাথা, কিন্তু মাথা বলেই তো আর সবাইয়ের মাথা হাতে কাটবার আবদার চলে না?
বাগদিনীর ছোঁয়াচটা হাসা-হাসির মধ্যে দিয়ে একরকম মেনে নেওয়া হয়েছে, আর ওটা এমন সৃষ্টিছাড়া নতুনও কিছু কথা নয়, কিন্তু ঘরে দোরে যদি সাহেব ঢোকে, ঘরের বৌ যদি পরপুরুষের সঙ্গে কথা কয়, সেটা মেনে নেবে সমাজ এত নখদন্তহীন হয়ে যায় নি।
চণ্ডীমণ্ডপে বৈঠক বসে এবং পাঁচ মাথা এক হয়ে এই স্থিরীকৃত হয়, প্রথমে নীলাম্বর বড়য্যেকে চাপ দেওয়া হবে পুতবৌকে ত্যাগ করবার জন্যে, তারপর যদি সে তাতে রাজী না হয়, বা না পেরে ওঠে, অবশ্যই পতিত করতে হবে নীলাম্বরকে।
সমাজে বাস করা তো আর ছেলেখেলা নয়। ওই মুমূর্ষ রোগীটা সত্যিই যদি সাহেব ডাক্তারের ওষুধ খেয়ে বাঁচে, বাঁচাতেও পারে, ওই লালমুখোদের ওষুধে ভেলকি খেলে শোনা যায়, ঈশ্বর করুন বাঁচুকই, ওকে একটা অঙ্গ-প্রায়শ্চিত্ত করিয়ে মহাপ্রসাদ খাওয়াতেই হবে।
আর ওই ভবতোষ মাস্টারটা!
ওটাকে জলবিছুটি দিয়ে গ্রামের থেকে বার করে দেবার কথা, কিন্তু শয়তানটা ডাক্তারের সঙ্গেই। গট গট করে গাড়িতে গিয়ে উঠে কলকাতায় লম্বা দিল।
ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে এসেছে ডাক্তারের সঙ্গে!
তা ওর আর বাস ওঠাবার প্রশ্ন কোথায়, নিজেই তো প্রায় বাস উঠিয়ে কলকাতায় গিয়ে বাসা বেঁধেছে। পিসিটা আছে, তাই কালেকস্মিনে আসে!
আসামী বলতে হাজির শুধু নিতাইটা।
তা আপাতত ওকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সাহেব ডাক্তাররূপী আগুনটি ল্যাজে বেঁধে এনে লঙ্কাকাণ্ড ঘটিয়ে সরে পড়েছে।
এখন আগুনের কাজ আগুন করছে।
.
আগে ঘুণাক্ষরে কেউ টের পায় নি।
কোন ফাঁকে যে এসব যোগাযোগ করেছে সত্য, ঈশ্বর জানেন! গ্রামের এত জোড়া চোখের ওপর দিয়ে ভানুমতীর খেল দেখিয়ে দিল!
লোকে দেখল গ্রামের পথে ঘোড়ার গাড়ি।
নীলাম্বর দেখলেন সে গাড়ি তার দরজায় থামল। আর তা থেকে নামল এক বাঘা সাহেব।
বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল নীলাম্বরের। সন্দেহ নেই এ গাড়ি কালেক্টরে বা ম্যাজিস্টারের, নিশ্চয় কোন শত্রু নীলাম্বরের নামে কিছু লাগিয়ে-ভাঙিয়ে এসেছে, আর সেই বাবদ হাতকড়া এসেছে নীলাম্বরের জন্যে।
কেন আসবে, কি সূত্রে আসা সম্ভব, এসব কথা ভাববার ক্ষমতা থাকে না নীলাম্বরের, খেয়াল থাকে না সঙ্গে সঙ্গে কে নামছে দেখবার! হাউমাউ করে গিয়ে প্রায় আছড়ে পড়েন তিনি সাহেবের সামনে।
ওদিকে পাড়ায় ঘরে ঘরে বেতার-বার্তা। নীলাম্বরের দরজায় ঘোড়ার গাড়ি থেকে সাহেব।
আইন-আদালত ছাড়া চট করে কারুর মগজে কিছু আসে না এবং সকলে একবার করে জানলা একটু ফাঁক করে আর বলাবলি করতে থাকে, একেই বলে বিপদ একা আসে না! ওদিকে ছেলে শুষছে, এদিকে এই কাণ্ড!
নীলাম্বরের বাড়িতেও উঁকিঝুঁকি চলতে থাকে।
কিন্তু সহসা একজনের চোখে পড়ল সাহেবের গলায় নল ঝুলছে।
ডাক্তার….ডাক্তারী নল ঝুলছে গলায়! একটা চাপা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে।
ডাক্তার! সাহেব ডাক্তার এনেছে নবুর জন্যে! তলে তলে এই চালাকি খেলেছে নীলাম্বর, অথচ কারুর সঙ্গে কোন পরামর্শ নেই?
