মায়া! মায়া হল? তুই আর ভূতের কাছে মামদোবাজী করতে আসিস নে নাপতে-বৌ! বিনি মজুরিতে তুই পরের জন্যে একটা হাই তুলিস না, আর তুই যাবি মায়ায় পড়ে
বিনি মজুরিতে, তা তো বলি নি নাপিত-বৌ বেজার মুখে বলে, তা করলে আমার চলবেই বা কেন? নেয্য মজুরি দিয়েছে, গিয়েছি।
দিয়েছে! বৌ তোকে নেয্য মজুরি দিয়েছে? এলোকেশী ক্ষেপে ওঠেন, সে কোথায় পাবে শুনি? তা হলে সে আমার বাক্স থেকে চুরি করতে শিক্ষে করছে! আর তুই তার মন্ত্রী হয়ে
সহসা পিছনে বজ্রপাত হয়।
এতগুলো গিন্নী সম্বন্ধে অবহিত মাত্র না হয়ে সত্য বলে ওঠে, নিচু ঘরের মতন কথা বোলো না। নাপিত-খুড়ীকে আমি রাহাখরচ বলে আমার মলজোড়াটা দিয়েছি।
মলজোড়াটা! পাথর হয়ে যান মহিলারা।
শাশুড়ীকে না বলে-কয়ে গায়ের গহনা দানছত্র! মুহুর্মুহু মূৰ্ছা গেলেও বোধ করি এই প্রবল আঘাতের বেগ রোধ হবে না।
এত বড় দুঃসাহস কেউ কল্পনাও করতে পারেন না।
এলোকেশী বুকে হাত চাপড়ে বলে ওঠেন, দ্যাখ, তোমরা দ্যাখ! দেখে বল আমায় ধরে ঝ্যাঁটা মারবে কিনা, বৌকে আমি নিন্দে করি বলে! ওরে বাবা রে, আমি কি করব রে
সত্য সেদিকে দৃকপাত না করে নাপিত-বৌয়ের দিকে তাকিয়ে শান্তভাবে বলে, বাবা কি চণ্ডীমণ্ডপে ছিলেন?
ওমা শোন কথা! নাপিত-বৌ গালে হাত দিয়ে বলে, তিনি আবার কই? তেনার হাতে নাকি কোন মরণ-বাচন রুগী, তাকে ফেলে আসতে পারল না। ওষুধ পাঠিয়ে দেছে। এসেছে তোমার বড় ভাই–তার হাতেই ওষুধ আর তোমার নামে পত্তর আছে। ওমা ও কি ও কি, বৌ যে পড়ে গেল গো! ওমা ই কী কাণ্ড!
প্রবল একটা কোলাহল উঠল বাঁধ হারিয়ে ফেলা সেই ছড়িয়ে পড়া নদীটুকু ঘিরে।
ভিরমি লেগেছে… ভিরমি! ভিরমি না ভিটকিলোমি… মস্ত বড় একটা অপকম্ম করে ফেলে এখন ধরা পড়ে।
নদীকে ঘিরে ঢেউ ওঠে অসংখ্য।
.
দীক্ষাগুরু নিপাতে তিন দিন অশৌচ শাস্ত্রীয় বিধি।
বিদ্যারত্ন রামকালীর তথাকথিত মন্ত্ৰদীক্ষার গুরু ছিলেন না, আর রামকালীও ওই ধরনের শাস্ত্রীয় বিধি যে ঠিক অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন তা নয়। তবু বিদ্যারত্নের মৃত্যুর পরের দিন রামকালী সমস্ত কাজকর্ম পূজাপাঠ পরিত্যাগ করে স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলেন বারমহলে।
তিন দিন ঔষধরূপী নারায়ণে হস্তক্ষেপ করবেন না, শাস্ত্রপাঠ ইত্যাদি করবেন না, অনুগ্রহণ করবেন না।
বিগত কয়েকদিন রোগীর বাড়িতে দিনে রাত্রে যমের সঙ্গে যুদ্ধ করে পরাজিত হয়ে ফিরে এসেছেন। মুখে সেই পরাজয়ের কালি-মাখা ছাপ। চিন্তা করছেন এই অবস্থায় জামাত-গৃহে যাওয়ার কোন অর্থ হয় না। কারণ চিকিৎসা করা থেকে যখন বিরত থাকতে হবে। ঔষধ যখন স্পর্শও করবেন না। মনে করছেন আগামী পরশু স্নানশুদ্ধির পর
চিন্তায় বাধা পড়ল।
দেখলেন তাঁর পালকি ফিরছে। অর্থাৎ হয় রাসু নয় রাসুর খবর। রাসুকে বলে দিয়েছিলেন, সত্য উদ্বিগ্ন হয়ে খবরটা দিয়েছে বটে তবে যথার্থই রোগ কঠিন কিনা সেটা রাসু অনুধাবন করে শীঘ্রমধ্যে হয় নিজে ফিরে আসবে, নয় পালকি পাঠিয়ে দিয়ে ঘটনার গুরুত্ব জানিয়ে দেবে।
ঈষৎ কম্পিত বক্ষে অপেক্ষা করেন রামকালী, পালকি শূন্য না পূর্ণ দেখা পর্যন্ত।
না, শূন্য নয়।
রাসু নামছে। যাক ঈশ্বর রক্ষা করেছেন। রাসু এসে নতমুখে প্রণাম করতে উদ্যত হতেই রামকালী পিছিয়ে গিয়ে বলেন, থাক থাক, এ সময় প্রণাম নিষেধ। কি রকম দেখলে?
রাসু আস্তে আস্তে মাথা নেড়ে বলে, ভাল নয়।
ভাল নয়!
সহসা রামকালীর মনশ্চক্ষে একটা মূর্তি ভেসে ওঠে। নিরাভরণ শুভ্র মূর্তি। শিউরে ওঠেন রামকালী, নিস্তেজ স্বরে বলেন, ঔষধটায় ফল হল না?
ঔষধ প্রয়োগ করা হয়নি– রাসু জলদগম্ভীর স্বরে বলে, সত্য ফেরত দিয়েছে।
ফেরত দিয়েছে?
সত্য রামকালীর ঔষধ ফেরত দিয়েছে! রাসু ওই দিশেহারা মুখের দিকে না তাকিয়েই হাতের পেটিকাটি আস্তে নামিয়ে রেখে বলে, হ্যাঁ। আপনার পত্র নেয় নি, পড়ে নি।
রামকালী ব্যাকুলভাবে বলেন, তোমার সঙ্গে দেখা করতে দেয় নি?
না, না, তা দিয়েছে। সত্যও অসুস্থ ছিল। আমি গিয়েছি মাত্র, ঠিক সেই সময় হঠাৎ অচৈতন্য হয়ে পড়েছিল নাকি। পরে সুস্থ হয়ে আমার সঙ্গে দেখা করে বলল, বাবার যখন আসা সম্ভব হল না, চিঠি থাক বড়দা, ও আর পড়ে কি করব! আর ওষুধও তুমি ফিরিয়ে নিয়ে যাও। আমার অদৃষ্টে যা আছে তাই হবে। যদি সতীমায়ের কন্যে হই, সেই পুণ্যেই আমার শাখা লোহা বজ্জর হয়ে থাকবে।
জীবনে বোধ করি এই প্রথম রামকালী হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন, কথা খুঁজে পান না। এরপর কি আর স্নান-শুদ্ধ হয়ে যাত্রা করবেন রামকালী, সত্যর কথা অবোধের কথা ভেবে?
তা সেই অবোধ সত্য তো তাহলে একথাও বলে বসতে পারে, আবার তুমি এলে কেন বাবা, তোমার ওষুধ যখন খাওয়াচ্ছি না!
৩০. এ তল্লাটে এ ইতিহাস এই প্রথম
এ তল্লাটে এ ইতিহাস এই প্রথম।
সায়েব ডাক্তার ডাকার ইতিহাস।
ভবতোষ মাস্টার, নিতাইচরণ আর নীলাম্বর বড়য্যের কুলমজানি পুতবৌ, এই তেরোস্পর্শের যোগে এ ইতিহাসের সৃষ্টি। খবর শুনে যে যেখানে ছিল সে সেখানেই দাঁড়িয়ে পড়ল, যে যে বয়সে ছিল সে সেই বয়সেই রয়ে গেল।
বাঁড়ুয্যের লক্ষ্মীছাড়া রণচণ্ডী বৌয়ের গুণপনা জানতে কারও বাকী ছিল না, শুধু ভেবে পেত না বৌকে ওরা এখনো ঠাই কেন দিচ্ছে। গলাধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে কেন দিচ্ছে না!
