হায়, এলোকেশীর ছেলের একশ বছর পরমায়ু হয়ে যদি বৌয়ের হাড়ির হাল হওয়া সম্ভব হত! তা হবার উপায় নেই। এলোকেশীর প্রাণের পুতুলই যে বৌয়ের অহঙ্কারের মাটি।
.
কিন্তু সত্য এ নাটকের কোন্ অঙ্কে?
সে কি এবারও স্বামীসেবার পুণ্য অর্জন করে না?
নাঃ, সে পুণ্য অর্জনের সৌভাগ্য তার হয় না। কারণ গুরুজনদের সামনে গিয়ে তো আর সে বরের গায়ে-পায়ে হাত বুলোতে বসবে না। ঘরে ঢুকবেই বা কোন লজ্জায়!
রাত্রে? সে তো শ্বশুর-শাশুড়ী দুজনে ছেলেকে বুক দিয়ে আগলে পড়ে থাকেন। আর সদু তাঁদের খিদমদগিরি করে। সেখানে সত্য কে?
তা ছাড়া তার কোলে বাচ্চা ছেলে। ছ মাসও হয় নি। আর তার গলাতেই সংসার।
স্বামীসেবার একটি অংশ তার ভাগে আছে। সেটা হচ্ছে ঔষধের অনুপান প্রস্তুত। বহুবিধ জিনিস নিয়ে ছাঁচা, বাটা, গুড়ানো, সেদ্ধ করা ইত্যাদিতে অনেকটা সময় ব্যয় হয় তার।
কবরেজ আবার ওষধে ফল হচ্ছে না দেখে অবিরতই অনুপানের ত্রুটি আবিষ্কার করছেন! তেজী সত্য এসময় শুকনো চোখে ঠায় খাড়া থাকে। শুধু রান্নাঘরের কোণে যখন একা মুখ নিচু করে কাজ করে, আর রাত্রে যখন ছেলে দুটো ঘুমিয়ে পড়ে, তখন বাধমুক্ত করে অশ্রুর সাগরকে।
নবকুমার যদি সত্যিই না বাঁচে!
তোলপাড় হয়ে ওঠে আকাশ পাতাল পৃথিবী। যে মানুষটা সত্যর মনের জগতে একটা অবোধ অজ্ঞান নাবালকের দলে গণ্য ছিল, সে যে তার এত বড় আশ্রয় এ কথা এখন টের পেল সত্য! যখন সে মানুষটা যেতে বসেছে।
সত্য কেন তাকে কেবল বকেই এসেছে! কেন শুধুই ভালোবাসে নি? কেন কেবল হেসে কথা বলে নি?
ঠাকুর, ওকে এবারের মত বাঁচিয়ে দাও, সত্য ওকে শুধু ভালবাসবে। ও বোকামি করুক, ভীরুতা করুক, ছেলেমানুষি করুক, কোন দোষ ধরবে না সত্য।
কিন্তু ও কি বাচবে!
মাকে অবহেলা করেছিল সত্য, মা বাঁচেন নি। আর স্বামীকে অবহেলা করে পার পাবে!
তখন না হয় বুদ্ধি ছিল না, মা কী বস্তু বোধ জন্মায় নি। কিন্তু এখন? এখন কী জবাব আছে?
সারারাত জেগে ঠায় বসে থাকে সত্য কান খাড়া করে। হঠাৎ বুঝি কোন সময় সেই ভয়ঙ্কর শব্দটা ওঠে। মাঝে মাঝে পা টিপে টিপে গিয়ে এ-জানলা ও-জানলা করে মরে। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে। রাত্তিরে রুগীর ঘরের জানলা কে খুলে রাখবে? একে তো “সান্নিপাতিক জ্বরবিকার”, হাওয়া লাগলেই বিপদ। তা ছাড়া রাত্তিরে জানলা খোলা দেখলে অপদেবতায় উঁকি মারবে না? হাওয়া বাতাস লাগবে না? আর ভাবতে বুক কাঁপলেও না ভেবে উপায় নেই, পথ খোলা দেখলে যমদূত ঢুকে পড়বে না? এলোকেশী কি সেই আসার পথ খোলা রাখবেন?
অতএব সত্য কানকে তীক্ষ্ণ থেকে তীক্ষ্ণতর করে তোলে।
কিন্তু এতেই কি সত্যর সকল কর্তব্য শেষ হয়ে গেল? আর কোন করণীয় নেই তার স্বামীর সম্পর্কে! ওঁরা মা-বাপ, তা ঠিক। কিন্তু এঁরা যদি অবোধ হন? তবে সত্যই বা কি কম অবোধ! এক মাস হতে চলল জ্বর চলছে নবকুমারের, দিন দিন বাড়ছে বৈ কমছে না, অথচ উচিতমত একটা ওষুধ পড়ল না তার পেটে!
আর সত্য নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে আছে।
সত্যর ভগবান কি এর পরও ক্ষমা করবেন সত্যকে?
এলোকেশীর সেই কান্নার পর এলোকেশীকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন মহিলারা, কখনো কোন দোষ করোনি, ঘাট করে নি, কারুর অহিত করো নি, পুত্রশোকের জ্বালা তোমায় কেন দেবে ভগবান?
আবার সু-পরামর্শ দিচ্ছিলেন পরক্ষণে, বলতে নেই, ছেলের যদি কিছু হয় নবুর মা তো তুমি একদোর দিয়ে ছেলেকে বিসর্জন দেবে, আর দোর দিয়ে ওই হারামজাদীকে গলাধাক্কা দিয়ে বার করে দেবে। যে বৌ শাশুড়িকে অত কথা বলে–
ও বাতাসীর মা, শুধু কি ওই কথা বলেছে! বলি তবে শোন! রাতে বাইরে যাব বলে হঠাৎ দোর খুলে দেখি ঝপ করে কে দুয়োরের কাছ থেকে সরে গেল! ভয়ে হাঁকপাক করে চেঁচিয়ে উঠেছি। কে কে বলে চেঁচিয়ে উঠে দেখি, না আমার অবতার! রাগের চোটে মুখ দিয়ে কু-কথা বেরিয়ে গেল, বললাম, দোরের গোড়ায় কি করছিলি রে হারামজাদী? তুক না তাক? বলল কি জান!–ছেলে মিত্যুশয্যেয়, তবু তোমার জিভের ধার কমে না? কেমন মা তুমি?
শ্রোত্রী মহিলা সঙ্গে সঙ্গে সবলে নিজের গালে ঠাঁই ঠাই করে দুটো চড় কষিয়ে বলে ওঠেন, ওমা আমি কোথায় যাব! ও নবুর মা, সে বৌয়ের মুখ তুমি নাথি দিয়ে ভেঙে দিলে না?
এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থার জবাবে উদারচরিতানাম নবুর মা কী বলতেন কে জানে, সহসা অন্য এক ঝড় এসে লাগল। দেখা গেল গোয়ালের পাশের দরজা ঠেলে ঢুকে নাপিত-বৌ চুপি চুপি রান্নাঘরের দিকে এগোচ্ছে। অর্থাৎ সত্যর সন্ধানে যাচ্ছে।
বৌয়ের সঙ্গে নাপিত-বৌয়ে কিসের শলা! মুহ্যমান এলোকেশী গলা তুলে হাঁক দিলেন, কোথায় যাওয়া হচ্ছে?
চতুর নাপিত-বৌ বুঝল ধরা পড়েছে। অতএব মিছে কথা বলে চাপা না দিয়ে এদিকে এসে চুপি চুপি বলে, বৌমা যে আমায় তেনার বাপের কাছে পাঠিয়েছিল গো, তার বার্তাটা দিতে।
কথা শেষ করতে পারে না সে। এলোকেশী রুদ্ধশ্বাসে বলেন, কার কাছে পাঠিয়েছে?
ওনার বাপের কাছে গো। ভারী মস্ত কবরেজ তো! পত্তর লিখে আমার হাত দে পাঠিয়েছিল জামাইরে বিত্তান্ত জানিয়ে। এসে চিকিচ্ছে করতে।
তুই সে-ই কথা আমায় না জানিয়ে, স্বাধীনে চলে গিয়েছিলে?
নাপিত-বৌ নরম হবার মেয়ে নয়। যেই দেখল ধমকের পথ ধরেছে গিন্নী, সেও সতেজে বলে, স্বাধীন পরাধীন বুঝি নে! বৌ-টা সোয়ামীর ভাবনায় ধড়ফড়াচ্ছে, দেখে মায়া হল–
