এলোকেশীর কাছে যাওয়া কর্তব্য ছিল, কিন্তু কোন্ কর্তব্যটা করবে? সে তো আর চতুর্ভূজ্যা নয়?
এলোকেশী ঢেঁকিঘরে বসে কাঁদছেন।
সমাগতা মহিলারা সেইখানেই জমায়েত হলেন এবং এই হঠাৎ-কান্নার কারণ অবগত হয়ে গালে হাত দিয়ে বসে পড়লেন।
কয়েকজন এ কথাও বললেন, পায়ের ধুলো দাও নবুর মা, তোমার একটু পায়ের ধুলো দাও, মাথায় ঠেকাই, যদি তাতে তোমার মতন সহ্যশক্তি জন্মায়। ওই দজ্জাল বৌ নিয়ে এই অবধি ঘর করছ তুমি!
জনৈকা আক্ষেপ করে বলেন, আমি ভাবছিলাম আজ ভরসন্ধ্যেয় তোমার বৌকে নিয়ে চণ্ডীতলায় গিয়ে মায়ের পায়ে তার শাঁখা-সিঁদুর জমা দিয়ে এয়োৎ বাঁধা রাখার মানুতি করে আসব। তোমার তো মাথার ঠিক নেই, পাঁচজনে না দেখলে চলবে কেন? কিন্তু যে বৌ তোমার–বলতে তো ভরসা হচ্ছে না!
অপরা ফিসফিস করে, বলো না দিদি, বলো না। আমি বলি নি ভেবেছ? হাত বাঁধার কথা বলেছিলাম। কিন্তু সদুর কাছে নাকি বলেছে নবুর বৌ, আমি ডান হাতের বদলে বাঁ হাতে ভাত খেলে আমার স্বামীর পরমায়ু ফিরবে এ কথা আমি বিশ্বাস করি না। উচিতমত ওষুধ না পড়লে কি অসুখ সারে?
আঁ! এই কথা বলেছে?
তাই তো বলল সদু। বলল, ওই নিয়ে আর বৌকে পেড়াপেড়ি করতে যেয়ো না খুড়ি, মানুষের মান-মর্যাদা তো রাখতে জানে না। হয়তো তোমার মুখের ওপরই না বলে বসবে।
সাধে কি আর বলছি, নবুর মার পাদোদক খেতে হয়!
কথাটা এলোকেশীর কানে যায়। তিনি বুকটা আর একবার চাপড়ে, আর একবার সেই চিরপরিচিত সুরের কান্নাটি কেঁদে ওঠেন।
ওরে নবু রে–ওরে আমার সোনার গোপাল রে, তুই থাকতেই তোর বৌ আমাকে কী পায়ে দলছে দ্যাখ রে!
যারা রোগীর সেবা করছিলেন, তারা সেবা ফেলে ছুটে আসেন।
হলটা কি?
এই দুঃসময়ে ‘পাহাড়ে’ বৌ কি না কি করে বসল!
তা সে যা করে বসেছে তা চরম!
শাশুড়ীর মুখের ওপর বলেছে, মানুষটাকে দশজনে মিলে কুপিয়ে কুপিয়ে না কেটে একেবারে মা চণ্ডীর কাছে বলি দিয়ে দিলেই হত! মানুষটাও উদ্ধার পেত, দশজনেরও খাটুনি কমত!
স্বামীর কথা নিয়ে যে বৌ এমনি করে গলা তুলে শাশুড়ীর সঙ্গে কথা বলতে পারে, সে বৌ তা হলে না পারে কি!
ঝেটিয়ে বিদেয় করে দাও, ঝেটিয়ে বিদেয় করে দাও– চাটুয্যে-গিন্নী দৃপ্তকণ্ঠে বলেন, ওই ডাকাতের আওতাতে-আওতাতেই ছেলে তোমার তুষ হয়ে গেছে নবুর মা! নইলে অমন ডবকা ছেলে, হঠাৎ এমন পিচাশ পাওয়া রোগেই বা ধরবে কেন?
তবু আমার নবু ওই বৌ-অন্ত-প্রাণ চাটুয্যে দিদি! বৌয়ের ভয়ে কাঁটা!
দুটো অবস্থার মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকলেও কথাটা বলেন এলোকেশী।
তা ভগবান তেজ ভাঙছেন! অবিশ্যি তোমার মাথায়ও মুগুর মারছেন! কিন্তু ওই তো বিধাতার বিধান। একের পাপে আরের দণ্ড। তবু এও বলব, ওর দুঃখে শেয়াল-কুকুর কাঁদবে! পথের শত্রুর আহা করে যাবে!
এঁরা অধিকাংশই এলোকেশীর খাতক। গোপনে সুদী কারবার করে থাকেন এলোকেশী। ওঁদের অনেকেরই সোনাটা রূপোটা এলোকেশী সিন্দুকে পচছে।
অবশ্য পাড়ায় স্পষ্টবক্তা ন্যায়দর্শী একেবারে নেই তা নয়। কিন্তু তেমনদের সঙ্গে এলোকেশী ভাব চটিয়ে রেখেছেন। তবু নবকুমারের মরণ বাঁচন অসুখ শুনে দেখতে আসছেন তারা, ন্যায্য কথা দু-একটাও বলেও যাচ্ছেন।
যেমন ভজুর পিসি বলে গেছলেন, হাগা, বৌয়ের বাপের বাড়ি খবর দিয়েছ?
এলোকেশী বাঁকা মুখে জবাব দিয়েছিলেন, কেন, সেখানে খবর দিয়ে আবার কি হবে?
ওমা, তাদের হল গে জামাই! মুখের ওপর বলছি না, তবে ভগবানের মারের ওপর তো কথা নেই! একটা এদিক-ওদিক কিছু হয়ে গেলে জবাবটা কি দেবে?
জবাব!
এলোকেশী মনোকষ্ট ভুলে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছিলেন, কেন, আমি কি তাদের উঠোনে বাস করি? আমি কি তাদের জমিদারির প্রজা? আমি কি তাদের খাতক? আমি কি কাঠগড়ায় আসামী যে জবাবদিহি দিতে হবে? কি বলব, এখন আমার দুঃসময় চলছে তাই-নইলে তোমায় উচিত কথা শুনিয়ে দিতাম কায়েত-ঠাকুরঝি!
সনতের জেঠী একদিন বলেছিলেন, নবুর শ্বশুর তা শুনেছি নামকরা কবরেজ, জামাইয়ের অসুখের খবর দিচ্ছ না কেন?
এলোকেশী গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিয়েছিলেন, আমার তো দশটা পাইক-পেয়াদা নেই দিদি যে হুট বলতে খবর দেব। বলে ছেলের ব্যামোতেই চোখে সরষে ফুল দেখছি। বেশ তো, তোমরা পাঁচজন আছ, খবর দাও না। বলে পাঠাও, এস তুমি। তোমার জামাইয়ের উচিত চিকিচ্ছে করে যাও।
.
এরপর আর কে কথা কইবে?
কিন্তু এলোকেশী কি সত্যিই এত মন্দ যে নিজের ছেলের কল্যাণ-অকল্যাণ দেখেন না?
না, তা নয়।
আসলে এলোকেশী এ বিশ্বাস রাখেন না বৌয়ের বাপ ধন্বন্তরী! তা ছাড়া এটাও মনের মধ্যে কাজ করছে,যদি সত্যিই তা হয়, বৌয়ের বাপের গুণপনাতেই যদি তাঁর ছেলে সেরে ওঠে, সে অপমানের জ্বালা এলোকেশী জুড়োবেন কিসে?
আর বৌও কি তা হলে আরও সাপের পাঁচ-পা দেখবে না? ছেলের প্রাণের জন্য শত-সহস্রবার তেত্রিশ কোটি দেবতার চরণে মাথা খুড়ছেন এলোকেশী, কিন্তু বৌয়ের তেজ-দর্পটা কিছু খর্ব হোক, এটাও প্রার্থনা। দুটোর সামঞ্জস্য বিধান হয় না, কারণ মরা স্বামী বেঁচে উঠলে তো দবুদবার আর শেষ থাকে না মেয়েমানুষের। তেমন হলে বড় কেউ মায়ের পুণ্যবলের কথা তোলে না, তোলে পরিবারের এয়োতের জোরের কথা!
আবার সেই বেঁচে ওঠাটাই যদি বৌয়ের নিজের বাপের গৌরবে হয়? উঃ রক্ষে করো! নবু তার নিজের বাপের পুণ্যে তরবে। নিত্য একশ আট তুলসী দেওয়া কী ব্যর্থ হবে!
