মুখরা সারদা সহসা যেন মূক হয়ে যায়। ওই দুফোঁটা চোখের জলের দিকে তাকাতে পারে না, আর ভগবান জানেন কোন এক অদ্ভূত হৃদয়-রহস্যে সারদার নিজের চোখ দুটোও জলে ভরে ওঠে।
তবু নিজেকে সামলে নিয়ে সে বলে, করলামই বা একটু তামাশা! করতে নেই?
পুটলীর বোধ করি এক্ষণে খেয়াল হয় যে, তা চোখ দুটো শুধু দু’ফোঁটা জল ফেলেই ক্ষান্ত হয়নি। তাই সে দুটোকে নামিয়ে ফেলে এবার। আর কষ্টে গলার স্বর পরিষ্কার করে বলে, আমি তো তোমার শত্তুর, আমাকে বিদেয় করে দাও না? তুমি বাঁচ, আমিও বাঁচি।
সারদা ঈষৎ বিষণ্ণ কৌতুকে বলে, আমি না হয় বাঁচব, তোর বাঁচবার হেতু?
তোমার বুকের পাথর হয়ে আর সংসারসুদ্ধ সকলের দয়ার পাত্র হয়ে থাকতে হয় না, সেই বাচান?
সারদা আর একবার মূক হয়। দেখে নতুনবৌয়ের হেঁটমুণ্ডের অন্তরাল থেকে জল ঝরে ঝরে তার কোলের উপর জড়ো হয়ে থাকা ফর্সা ফর্সা ফুলো ফুলো দুখানি করপল্লবের ওপর পড়েই চলেছে।
স্তব্ধ হয়ে অনেকক্ষণ সেই দিকে তাকিয়ে থাকে সারদা, তার পর সহসাই আত্মস্থ হয়ে শান্ত দৃঢ়কণ্ঠে বলে, চোখ মোছ, নতুনবৌ, আর কাঁদতে হবে না।
তোমার পায়ে ধরি দিদি, আমায় পাঠমহলে পাঠিয়ে দাও।
শোন কথা, আমি কি পাঠিয়ে দেবার কর্তা? সারদা হেসে ওঠে, বলে আমার ওপরই হুকুমজারি হয়েছে–জন্মের শোধ বিদেয়! সে যাক, বলি এত রূপযৌবন নিয়ে কেঁদে মরবি আর হেরে পালাবি কি লো? লড়াই করে সতীনের কাছ থেকে বর কেড়ে নিবে নে?
লড়াই-টড়াই আমি কিছু চাই না দিদি।
লড়াই চাস না! কি মুশকিল, তবে তো খয়রাত করতে হয়! সারদা তেমনি বিষণ্ণ কৌতুকে বলে, তুই দেখছি আমার সব মজা মাটি করে দিলি। লড়াই করতে বসলে জোরের পরীক্ষে হয়, দান-খয়রাত করতে গেলে যে বেবাক সবটাই তুলে দেওয়া ছাড়া গতি থাকে না।
ব্যাকুল আবেগে উচ্চারণ করে নতুনবৌ।
আমার কিছু চাই না দিদি।
সারদা হাসে, কিছু চাস না? বরও চাস না?
না।
সারদা বলে, কিন্তু জগতের কি নিয়ম জানিস, না চাইলে সব জিনিস মেলে চাইতে বসলেই হাতছাড়া! ইস, কথা কইতে কইতে এমন খাসা তিলপিটুলি বেগুনভাজাগুলো নেতিয়ে গেল। খা, খেয়ে ফেল, মন ভাল হবে।
.
মেজঠাকুদ্দা!
রামকালী একখানা সরু খাতার উপর ঝুঁকে পড়ে আসন্ন তীর্থযাত্রার হিসেবের খসড়া করছিলেন, হঠাৎ রাসুর ছোট ছেলের এই ডাকে চমকে স্নেহকোমল স্বরে বললেন, কি দাদা?
মা বলছে, মা তোমার কাছে ভিক্ষে চাইবে।
এ আবার কী অভূতপূর্ব কথা!
রামকালী বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখেন।
দরজার ওপাশে রাসুর বৌয়ের উপস্থিতি টের পান। প্রায় বিচলিত স্বরে বলেন, কি বলছ দাদা, বুঝতে পারলাম না তো!
এবার মাধ্যমের গুরুত্ব হারায়। মাধ্যমকে মাধ্যম মাত্র করে সারদা মৃদু কণ্ঠে বলে, খোকন বল, মা বলছে কখনো কিছু চায় নি মা, বাড়ির বড়বৌ, একটা ভিক্ষে চাইছে।
রামকালী ধারণা করেন, এ আর কিছু নয়, রাসুর দ্বিতীয় পক্ষ ঘটিত নাটক। নির্ঘাত সপত্নী অসহিষ্ণু এই মেয়েটি সতীনকে তার পিত্রালয়ে পাঠানোর প্রস্তাব করতে এসেছে। বিরূপ চিত্তে গম্ভীর হাস্যে বলেন, ভিক্ষেটা কি, সেটা না জানলে তো সাদা কাগজে দস্তখত করা যায় না বড় বৌমা! দেবার ক্ষমতা যদি আমার না থাকে!
খোকা বল, আপনি ইচ্ছে করলেই হয়।
রামকালী যদিও রাসুর বৌয়ের এই অসমসাহসিকতায় স্তম্ভিত হন, তবু ঈষৎ চমৎকৃতও হন। হঠাৎ একটা অতি অসমসাহসী মেয়ের কথা মনে পড়ে গিয়ে মনটা শিথিল হয়ে যায়! বলেন, মাকে বল দাদাভাই, ইচ্ছে করবার মত হলে অবশ্যই করব।
খোকা বল, আপনি তীর্থে যাচ্ছেন আমার মাকে সঙ্গে নিন।
এ আবার কি কথা!
এ যে রামকালীর ধারণার অগোচর, স্বপ্নের অগোচর। এই কথা বলতে এসেছে রাসুর বৌ! মেয়েটা পাগল নাকি! তবে নাকি নিতান্তই হাস্যকর অলীক কথা, তাই ঈষৎ কৌতুকের সুরে বলেন, তোমার মাকে নিয়ে যাই এত সাধ্যি কি আমার আছে দাদাভাই? তুমি বড় হও, মাকে নিয়ে যাবে।
মেজঠাকুদ্দা, মা বলছে তামাশা করে উড়িয়ে দিলে হবে না, মা সত্যি ভিক্ষে চাইতে এসেছে।
রামকালী আর মাধ্যমকে গ্রাহ্য করেন না, বলেন, বড় বৌমা, তোমার প্রার্থনাটা যে বড় অসম্ভব। আমি পুরুষমানুষ, কোথায় উঠব, কোথায় থাকব, কিভাবে ঘুরব
মেজঠাকুদ্দা, মা বলছে, মা কষ্ট করতে হারবে না। তোমার রান্না করা, বাসন মাজা–এর জন্যেও তো একটা লোক চাই। মা সব করে দেবে।
দাদাভাই, তোমার মা ছেলেমানুষ, সবটা বুঝতে পারছেন না। সম্ভব হলে আমাকে দুবার বলতে হত না। তোমার মাকে বল, বাড়ির বড়বৌ বলে আমার কাছে একটা আবদার করলেন, রাখতে পারছি না, এটা আমারও কষ্ট। আমি তার বদলে তার নামে খাসে কুড়ি বিঘে ধানজমি লেখাপড়া করে দেব। তার আদায় থেকে উনি যা খুশি করতে পারবেন। আর তুমি যখন বড় হবে—
.
খোকা বল বাবা, বিষয়-সম্পত্তিতে মার কোন দরকার নেই।
খাসে কুড়ি বিঘে ধানজমি!
এতেও একটু প্রলোভিত হল না মেয়েটা? আশ্চর্য তো! সত্যি বলতে কি, এ সংকল্প রামকালীর সহসা আজকের নয়। কিছুদিন থেকেই ভাবছিলেন তিনি, এই ধরনের একটা কিছু করবেন। ওই মেয়েটাকে তিনি যতই সাধারণ হিংসুটে মেয়েছেলে ভেবে আসুন, ওর সম্পর্কে কোথায় যেন একটু অপরাধবোধ তাকে হৃদয়ের গভীর স্তরে পীড়িত করত। তাই ভাবতেন ক্ষতি পূরণার্থে
কিন্তু মেয়েটা বলে কি? বিষয়-সম্পত্তিতে তার দরকার নেই?
