এ রকমটা হল কেন?
অনেকদিন থেকেই যেন ভিতরে ভিতরে একটা ক্ষয় চলছে, যেন একটা ভাঙনের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন। শরীর খারাপ হয়ে গেছে। সেই থেকেই গেছে।
রামকালীর মধ্যেও একটা আবেগের আলোড়ন উঠল। সেই ছোটখাটো মানুষটা, যাকে রামকালী কোনদিনই পুরো একটা মানুষ বলে গণ্য করেন নি, সে যে দৃঢ়কঠিন রামকালীর ভিতরের এতটা শক্তি হরণ করে ফেলবে এ রামকালীর ধারণার মধ্যেই ছিল না।
ভুবনেশ্বরী সম্পর্কে যে তাঁর একটা বাৎসল্যমিশ্রিত প্রীতি ছিল, জীবনের কোন আদর্শে, কোন চিন্তায়, কোন সুখদুঃখে তাকে ডাক দেন নি। আজ মনে হচ্ছে সম্পূর্ণ বিচার করেন নি রামকালী স্ত্রীর উপর। চিরদিন যাকে ছোট ভেবে এসেছেন, সে হয়তো এমন ছোট ছিল না, যাকে সামান্য ভেবেছেন, সে হয়তো সামান্য নয়। রামকালী যদি তাকে স্নেহের সঙ্গে কিছু শ্রদ্ধাও দিয়ে হৃদয়ের সহধর্মিণী করে তুলতে পারতেন, হয়তো সারাটা জীবন এতখানি নিঃসঙ্গ হয়ে থাকতেন না।
মৃত্যুর মহিমায় ভুবনেশ্বরী যেন বড় হয়ে উঠেছে।
বিছানায় শুয়ে শুয়েই সংকল্প করলেন রামকালী, শীঘ্রই তীর্থযাত্রা করবেন। বায়ু-পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়েছে।
বায়ু পরিবর্তন ভিন্ন ভাঙন ধরা স্বাস্থের ক্ষয়পূরণ সম্ভব নয়।
তীর্থযাত্রার সংকল্প ঘোষণা করলেন রামকালী।
.
দু-তিনটে দিন রামকালী সম্পর্কে উদ্বেগ নিয়েই দিন গেছে সকলের, রাসু বারবাড়িতে চণ্ডীমণ্ডপেই রাত কাটিয়েছে, কাকার নিষেধ সত্ত্বেও, চুপি চুপি–তার অলক্ষ্যে।
আজ আবার স্বাভাবিকত্ব এল সংসারে। যদিও রামকালীর তীর্থযাত্রার সংকল্পে ভয় ভাবনা আতঙ্ক দেখা দিল, তবু সেটা তো আজই নয়। তীর্থযাত্রার অনেক তোড়জোর।
রাসুকে আজ শশীতারা আবার ডেকে পাঠালেন। বললেন, দেখ, পুরুষের চামড়া যদি গায়ে থাকে তো বৌয়ের নাকে-কান্নায় ভিজিস নে। আপ্তঘাতী অমনি হলেই হল! আজ তুই ইদিককার ঘরে শুবি।
তিন-তিনটে রাত বাইরের ঘরে কাটিয়ে রাসুরও মন চঞ্চল, এ প্রস্তাবে আরও চঞ্চল হয়ে ওঠে। অথচ তার সায় দেবার উপায় নেই। এ যেন পেটে খিদে, সামনে সুখাদ্য অথচ মুখ বাধা!
তাছাড়া রাসু সারদা নয় যে এসব কথার পিঠে কথা কইবে। লজ্জায় ঘাড় হেঁট করে থাকে সে। শশীতারা বোঝেন মৌনং সম্মতি লক্ষণম্। হৃষ্টচিত্তে বলেন, তোকে কিছু ভাবতে হবে না, তুই শুধু খাওয়ার পর আমার ঘরে এসে বসবি। পিসি-ভাইপোয় গল্প করবার ছুতোয় রাতটা একটু ঘোর করে দেব, তার পর–আহা নতুন বৌটার মনের দিকে একটু তাকাবি না তুই? ভাববি না তার কথা?
রাসুর চোখে জল এসে পড়ে, সে তাড়াতাড়ি সরে যায়। নতুন বৌয়ের কথা ভাবছে না সে? অহরহই তো ভাবছে!
কিন্তু যাকে নিয়ে এত দুর্ভাবনা শশীতারার, সে কোথায়? পাটমহলের লক্ষ্মীকান্ত বাড়ূয্যের নাতনী পটলী?
সে যেন একটা অদ্ভুত ভয়ে কাঠ হয়ে আছে। এতদিনে অবশ্য সে চিনে ফেলেছে কে তার সতীন। সতীনকে যে এতটাই ভীতিকর মনে হয় তা বুঝি ধারণা ছিল না তার। সারদার মুখের দিকে কোনদিন ভাল করে তাকাতে পারে না সে, কথা বলা তো দূরের কথা।
অথচ সারদা হরদমই তার সঙ্গে কথা বলে। সংসারের সবাইকে খেতে দেওয়ার ভার যে সারদারই হাতে-অগত্যাই পটলীকে তার হাতে পড়তে হয়েছে। তার শাশুড়ী দু-চারদিন নিজের এক্তারে রাখবার চেষ্টা করে অক্ষমতাবশতই হাল ছেড়ে দিয়েছেন।
সারদা ফি-হাত ডাকে, নতুনবৌ, খাবে এসো।…নতুনবৌ, এখন মুড়ি খাবে? নতুনবৌ, তুমি মাছের পেটি ভালবাস না দাগা? নতুনবৌ, তুমি হ্যাঁচা আমের আচার খাও না? নতুনবৌ, আচারের তেল দিয়ে কৎবেল মেখে খেয়েছ কোনদিন? খাবে তো বল মাখি?
নতুনবৌ যে কার নতুন বৌ সে কথা যেন জানে না সারদা। কুটুম্বের মেয়ে এসেছে, তাকে আদরযত্ন করছে ভারপ্রাপ্ত কর্মচারী।
আজও ফুলুরি আর তিলপিটুলি বেগুনভাজা করে এক বাটি হাতে নিয়ে ডাকতে এসেছিল সারদা নতুনবৌকে, খাবে গরম গরম?
পটলী মাথা নেড়ে বলল, না।
সারদা একটু আশ্চর্য হল। কারণ নতুনবৌ কোনদিন কিছুতেই না করে না। করে না বলে মনে মনে বরং একটু কৌতুকই অনুভব করে সারদা। ভাবে, ভাল করে খাইয়ে-দাইয়ে ঠাণ্ডা করে রাখা যাবে ওকে।
পটলী যে ভয়েই না করতে পারে না, সেটা বোঝে না সারদা। হয়তো বোঝার কথাও নয়। আজ না শুনে বলে, কেন গো, খাবে না কেন, খিদে নেই?
পটলী মাথা আরও নিচু করে মাথাটা আর একবার নাড়ে।
সারদা একটু চুপ করে থেকে মুচকি হেসে বলে, কেন বল তো নতুনবৌ? তোমার তো কখনও অগ্নিমান্দ্য দেখি নে!
এরপর নতুনবৌয়ের দিক থেকে কোনও সাড়া আসে না, শুধু তার ঘাড়টা আরও নুয়ে পড়ে। সারদা চলে যেতে উদ্যত হয়ে বলে, তবে নয় দুটো তিলের নাড়ু পাঠিয়ে দিই গে, খেয়ে জল খাও।
এবার হঠাৎ নতুনবৌ বলে ওঠে, তুমি আমায় এত যত্ন করো কেন?
সারদা বোধ করি এ প্রশ্নের জন্য আদৌ প্রস্তুত ছিল না, তাই হঠাৎ একটু থতমত খেয়ে যায়, তবে সে মুহূর্তের জন্য। পরক্ষণেই তীক্ষ্ণ একটু হেসে বলে, করব না কেন, যত্ন করবারই তো সম্পর্ক গো!
এতক্ষণ ঘাড় নিচু ছিল, এবার বোধ করি অজ্ঞাতসারেই মুখটা তুলে ফেলে পটলী, আর দীর্ঘ পল্লবচ্ছন্ন দুটি চোখের কোল বেয়ে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে তার। সে চোখের দৃষ্টিতে ফুটে ওঠে একটা অসহায় ভর্ৎসনা। সে দৃষ্টি সারদার উপর নিবদ্ধ রেখেই বলে, তামাশা করছ?
