আঁ আঁ? কী বললি? আমরা নীচু কথা কইছি? ছোটলোকের বেটি, হাঘরের মেয়ে। বলতে জিভ আড়িয়ে গেল না! শশীতারা ধেই ধেই করে নেচে ওঠেন, খুব উঁচু কথাটা তুমি কইছ বটে! একলা খাব, একলা পরব, একলা ভোগ করব, এই তো মহত্ত্বের কথা! পালা কথাটা নিচু কথা হল! বলি তাতে তো দুই দিকই রক্ষে হয়!
সারদার বোধ করি কী একটা কঠিন কথা মুখে আসে, কিন্তু সেটা কষ্টে দমন করে বলে, দুদিক রক্ষের দরকার নেই, একদিকই রক্ষে করো তোমরা।
এরপর আর দাঁড়ানো চলে না।
মান-সম্মান বজায় রাখা শক্ত হবে। সারদার নিজের চোখই তাকে অপদস্থ করে ছাড়বে।
.
দু-টো গিন্নীকে পাথর করে দিয়ে চলে যায় সারদা।
এই চরম অপবাদের মুহূর্তে ভুবনেশ্বরীকে মনে পড়ে তার। সারদার ভাগ্যটাই মন্দ, নইলে অমন একটা স্নেহের আশ্রয় হারায় সে? ভুবনেশ্বরীর কি এখন মরবার বয়স?
হ্যাঁ সারদা নির্লজ্জ, সারদা বেহায়া, সারদা স্বার্থপর। কিন্তু পরার্থপরতায় উদার হবার ভাগ্য সে পেল কবে? ভাগ্য যে তাকে বঞ্চনাই করেছে। আর সে বঞ্চনা এসেছে তার গুরুজনদের হাত থেকেই।
গুরুজনদের প্রতি শ্রদ্ধা সম্মান তার আসরে কোথা থেকে? বিষপাত্রের বিনিময়ে কে অমৃতপাত্রের উপহার নিতে হাত বাড়ায়?
শশীতারা গাল হাত দিয়ে অভয়াকে উদ্দেশ করে বলেন, মান্যে বড় গুরুজন তুমি বৌ, তোমার পায়ের ধুলো নেবারই কথা। তবু বলি, তোমার পায়ের ধুলোয় গড়াগড়ি দিতে ইচ্ছে করছে। এই কালকেউটে নিয়ে ঘর করছ তুমি?
কুঞ্জ-গৃহিণী কপালে হাত ঠেকিয়ে বলেন, অদেষ্ট ঠাকুরঝি!
আসল কথা অদেষ্ট’টা তাঁর নিজের কাছে ধরা পড়েছে এই সম্প্রতি। ননদিনীর দিব্যদৃষ্টির প্রভাবে। এবং এযাবৎ বোকামি করে এসেছেন, সুদে-আসলে সেটা উসুল করে নিতে ইচ্ছে হচ্ছে তাঁর।
ওই কালনাগিনীর দিক থেকে রাসুর মন একেবারে ঘুরিয়ে দিতে পারি, এমন ‘ওষুধ’ আমার জানা আছে বৌ শশীতারা চাপা হিংস্র স্বরে বলেন, অব্যর্থ তুক। রাসু তোমার ছটফটিয়ে নতুন বৌর পায়ে পড়বে, বড়বৌকে জন্মের বিষ দেখবে!
ভাজ অবাক হয়ে বলেন, সত্যি ঠাকুরঝি, তেমন ওষুধ তোমার জানা আছে?
শশীতারার মুখে একটি বিচিত্র হাসি ফুটে উঠে, জানা না থাকলে আর তোমার ননদাইকে অমন কেন গোলাম করে রেখেছি? বয়সকালে কি কম দুর্দান্ত ছিল নাকি? সম্পর্ক অসম্পর্ক মানত না, রূপসী মেয়েমানুষ দেখলেই উন্মাদ হয়ে উঠত। এক বাণীবুড়ী শেখাল আমায় সেই তুক, তার পর থেকে এমন নেলাখেপা হয়ে গেল যে, আমি বৈ আর কিছু জানে না। আমি উঠতে বললে ওঠে, বসতে বললে বসে, খেতে বললে খায়, ঘুমুতে বললে ঘুমোয়। আমার মুখের দিকে ফ্যালফেলিয়ে তাকিয়ে থাকে। আমি বলি থাক, ওই আমার ভাল, নাই বা রোজগার করল, নাই বা হট্টগোল করে বেড়াল, ভাতের তো অভাব নেই ঘরে। আমার আঁচলটিতে তো বাবা রইল জন্মের শোধ!
রাসুর মা ইতস্তত করে বলেন, কোন শেকড়বাকড় নাকি? রাসুর কোন ক্ষতি হবে না তো?
শোন কথা! সে কাজ আমি করব? এ আর কিছুটি নয়, শুধু একজনের থেকে মন ঘুরে আর একজনের ওপর পড়া। তাহলে বলি শোন, তোমার কপালক্রমে এই পরশুই আমাসে আসছে– একেবারে দুপুররাতে নতুন বৌমা যদি এলোচুলে বিবস্ত্র হয়ে একটা কলাগাছের গোড়ায় এক ঠোকায় একটি ছুঁচ বিধে দিয়ে আসতে পারে, তাহলে
কথা শেষ হয় না শশীতারার, সারদার ছেলে দৌড়ে এসে বলে, তোমরা শীগগির চলে এস, মেজঠাকুদ্দা অজ্ঞান হয়ে গেছে।
মেজঠাকুদ্দা! মানে রামকালী! যিনি জ্ঞানের পারাবার! রামকালী অজ্ঞান হয়ে গেছেন, এ কী অদ্ভুত ভাষা?
সকলেই দৌড়ায়। তবে কি রামকালীও ভুবনেশ্বরীর মত বিনা নোটিশে
ব্যাপারটা এত জানাজানি হল, ভিতরবাড়িতে পড়ে গিয়ে। বারবাড়িতে পড়লে অন্তত মেয়েমহলের দল এভাবে ধারেকাছে গিয়ে হা-হুতাশ করতে পারত না।
যাদের স্পর্শের অধিকার আছে তারা মুখে মাথায় জল ঢেলে গঙ্গা বইয়ে দিল, বাড়িতে যত হাতপাখা এনে জড় করল। এ শুধু দুর্ভাবনাই নয়, এক প্রকার রোমাঞ্চও। যে মানুষটার মুখের দিকে কেউ কোনদিন স্পষ্ট করে তাকিয়ে দেখবার সাহস পায় নি, সে মানুষটা অসহায়ভাবে চোখ মুদে পড়ে আছে, তাকিয়ে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে কেমন তার নাকমুখ, করুণা করা যাচ্ছে তাকে জল দিয়ে বাতাস দিয়ে, এটা প্রায় সুখের পর্যায়েই পড়ে।
সারদাও একখানা হাতপাখা নিয়ে এসেছিল, আর দূর থেকে বাতাস করছিল এবং ভাবছি, আশ্চর্য এতদিন ঘর করছি মানুষটা কেমন দেখতে তা তো কোনদিন দেখি নি! একেই কি বলে “তপ্ত কাঞ্চন-বৰ্ণাভাং_”
ভয়ঙ্কর একটা আবেগের আলোড়নে চোখে ছলাৎ করে জল এসে যায় সারদার, এ হেন স্বামীকে ফেলে চলে যেতে হয়েছে মেজখুড়িকে? আর তাই বুঝি স্বর্গেও তিষ্ঠোতে পারছেন না, আকর্ষণ করে টেনে নিয়ে যেতে চাইছেন নিজের কাছে? মনের মত স্বামী এমনি জিনিস! তার পর চোখ মুছে ভাবল, মেজখুড়ো আমাদের মায়া কাটিয়ে চললেন!
কিন্তু আপাতত দেখা গেল সারদার আশঙ্কা অমূলক। চিরশান্ত চিরসুকুমার ক্ষীণশক্তি ভুবনেশ্বরীর আকর্ষণ মাধ্যাকর্ষণের চেয়ে জোরালো হল না।
রামকালী চোখ মেললেন।
চারদিকে এতগুলো মুখ দেখে ভুরুটা ঈষৎ কুঁচকে গেল, আবার চোখ বুঝলেন। আর অনেকক্ষণ পরে বললেন, আমাকে বাইরে চণ্ডীমণ্ডপে বিছানা করে দাও।
.
হ্যাঁ, বাইরেই শুলেন রামকালী। মেয়েদের এই হা-হুতাশ তাঁর অসহ্য, নিজের কাছে নিজে ভয়ানক লজ্জিত হচ্ছেন। রামকালীর পক্ষে এ হেন দুর্বলতা ক্ষমার অযোগ্য। রামকালী জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেছেন। পাঁচজনে মুখে-মাথায় জল দিল, হা-হুতাশ করল, এর চাইতে ঘৃণ্য ব্যাপার আর কি আছে!
