তোমাদের হয় না, আমার হবে। শশীতারা দৃঢ় রায় দেন, এ নিঘিনেপনার বিহিত আমি করে ছাড়ব।
বিহিত করতে ভাজকে নিয়ে এজলাসে এসে আসামীকে তলব করলেন শশীতারা।
সারদা এল, ঘার হেট করে বসে ঘোমটার মধ্যে থেকেই মৃদু অথচ স্পষ্ট স্বরে বলল, কি বলছ?
শশীতারা নড়েচড়ে বসে হাতপাখা নাড়তে নাড়তে বললেন, বলছি একটা নেয্য কথা। মনে কিছু করো না। আক্কেল যাদের শরীরে নেই, তাদের আক্কেল করাতে হলে চোখে আঙ্গুল দেওয়া ভিন্ন তো গতিও নেই। তাই দেব। তাতে চোখে যদি তোমার জ্বালা ধরে, আমায় কিন্তু দুষো না বাছা!
সারদার কণ্ঠ থেকে একটু হাসির আওয়াজ পাওয়া গেল, তোমাদের দুষব? এত আসপদ্দা আমার পিসীমা?
আসপদ্দা! শশীতারা পাখার বেগটা বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, না, আসপদ্দা তোমার দেখি না বটে, কিন্তু আক্কেলটুকুও তো তিলমাত্তর দেখি না বাছা! নতুন বৌমার দিকটা তো একেবারে ভাবছ না!
পরক্ষণে শশীতারা আর তার ভাজকে অবাক করে দিয়ে সারদার মৃদুকণ্ঠের স্পষ্ট স্বর ধ্বনিত হয়, আমি না ভাবলাম, তোমরা এতজনে তো ভাবছ!
এতজনে ভাবছি? আমরা এতজনে ভাবছি! তুমি যে অবাক করলে বড় বৌমা! আমরা ভেবে তার কী উবগারটা করতে পারব শুনি? তুমি এদিকে আত্মঘাতী হবার ভয় দেখিয়ে সোয়ামীকে শাসিয়ে রেখেছ, ভয়ে কাঁটা হয়ে আছে সে, আমরা কি করব? এই তো সিদিনকে রাত্তিরে ছোঁড়াটাকে হাত ধরে হিঁচড়ে এনে বললাম, রাসু, তুই ইদিকে আয়। ঘরের তো অভাব নেই বাড়িতে। এ ঘরে নবাবী পালঙ্ক না থাক, সোয়ামী পেলে নতুন বৌয়ের এখন আমতক্তাই রাজতক্তা। তা আনতে কি পারলাম? ভয়ে সিটিয়ে হাত ছাড়িয়ে পালিয়ে গেল। বলে কি, তাহলে তোমাদের বড়বৌ আপ্তঘাতী হবে! ….হ্যাঁ গা, বাপ তো তোমার শুনলাম ভালমানুষ, তোমার এ কী ছোটলোকমি।
শশীতারার কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘরের মধ্যে যেন একটা তীব্র বিদ্যুৎ ঝলসে ওঠে। বিদুৎটা আর কিছু নয়, সারদার চোখের আগুন। হঠাৎ মুখ তুলতে গিয়ে মাথার ঘোমটাটা খসে গিয়েছিল সারদার। ঘোমটাটা আবার একটু তুলে মুখ প্রায় অনাবৃত রেখেই সারদা বলে, দশচক্রে ভগবান ভূত হয় পিসীমা, তায় মানুষ তো কোন্ ছার! পাকেচক্রে ভদ্রলোকের মেয়ে ছোটলোক হয়ে উঠবে এতে আর আশ্চয্যি কি!
একে মুখ খোলা, তাতে এই বাকি!
সারদার শাশুড়ী বোধ করি নিজের মর্যাদা সম্পর্কে এবার সচেতন না হয়ে পারেন না। তাই নথপরা মুখ ঘুরিয়ে বলে ওঠেন, মুখের ঘোমটা খুলে শাশুড়ীর সঙ্গে ঝগড়া করছ তুমি বড় বৌমা! বুকের পাটা তোমার এত কিসের? জান, জন্মের শোধ বাপের বাড়ি বিদেয় করে দিতে পারি তোমায়?
এজলাসটা বোধ করি সারদার ধারণার জগতে ছিল, আর সওয়ালের জন্যে প্রস্তুতও ছিল সে। তাই তীক্ষ্ণ একটু হাসির সঙ্গে বললে, জন্মের শোধ যদি যেতেই হয় তো বাপের বাড়ি যাব কেন? যমের বাড়ি তো কেউ কেড়ে নেয় নি!
শশীতারা এবার চাকা নথ ঘুরিয়ে ঝঙ্কার দিয়ে ওঠেন, যমের বাড়ির ভয় দেখিয়ে আমাদের জব্দ করতে পারবে না বড় বৌমা, আমরা নাসু নই। বলি ওই যে একটা ঘরের মেয়ে এসেছে, যার বাপ ঘরবসতের দ্রবিতে বাড়ি ভরিয়ে দিয়েছে, তার দাবি-দাওয়াটা মানবে না তুমি? আর ওই রূপের কান্তি টাটকা পদ্মফুল, সোয়ামীকে তুমি এর ভোগ থেকে বঞ্চিত করছ, এতে যে তোমার নরকেও ঠাই হবে না!
হঠাৎ হেসে উঠে সারদা দিব্যি স্পষ্ট গলায় বলে, ভালই তো পিসীমা! নরকে ঠাই না হলে সগৃগে যাব! দুটো বৈ তো আর দশটা জায়গা নেই!
দুটো গিন্নীকে হতবাক করে দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সারদা, তালের বড়া খেতে চেয়েছে ছোট ঠাকুরপো, তালগুলো মেড়ে রাখিগে।
অর্থাৎ তোমাদের কাঠগড়া থেকে ফসকে পালাচ্ছি এবার।
শশীতারা বোঝেন, যেমন ভেবেছিলেন, ঠিক তেমনটি। ধিক্কার দিয়ে বিচলিত করে কার্যসিদ্ধ করা যাবে না। অন্য চাল চালেন তিনি। বলেন, সভ্যতা-ভব্যতার পাঠশালায় দেখছি একেবারেই পড় নি তুমি বড় বৌমা। গুরুজনের সামনে থেকে অনুমতি না নিয়ে উঠতে আমি আমার শ্বশুরবাড়ির দিকের কোন ঝি-বৌকে কখনও দেখি নি। আমরা নিজেরাও–গুরুজন ডেকে একটা কথা শুধোলে ঘাড় নেড়ে, হ্যাঁ হু করে উত্তর দিয়েছি, উঠে যেতে না বললে ঘাড় গুঁজে বসে থেকেছি।
সারদাকে এতেও অপ্রতিভ করা যায় না, সে তেমনি মদু হাসির সঙ্গে বলে, বসবার অবকাশ থাকলে তো বসে থাকাও একটা সুখ পিসীমা!
হুঁ! কথার পিঠে কথা দেওয়াই তোমার লোগ দেখছি। হাবাগঙ্গা শাউড়ী পেয়েছ, তাই এমন দুরবস্থা হয়েছে। যাক বলি শোন, আপস-মীমাংসার কথাই কইছি। ঘরণী গিন্নী বেটার মা তুমি, অনেকদিন তো সোয়ামীকে ভোগ করলে! ওকে একেবারে ভাসিয়ে দিলে চলবে কেন? ওরও আগুন সাক্ষী বিয়ে। আমি বলি কি, একটা পালা ঠিক করো।
মনে মনে হাসেন শশীতারা, একবার যদি রাসুকে নতুনের নেশা ধরিয়ে দেওয়া যায়, তারপর দেখা যাবে তোমার কত আদর থাকে! দেখা যাবে কোথায় থাকে তোমার ঐ তেজ! ওই বৌয়ের আস্বাদ পেলে, তুমি গলায় দড়ি দিলে কি জলে ডুবলেও কিছু এসে যাবে না রাসুর!
‘পালা’র বুদ্ধিটা মাথায় আসার জন্যেই নিজেকে নিজে তারিফ করেন শশীতারা।
কিন্তু সারদা সে তারিফ বেশীক্ষণ বজায় থাকতে দেয় না। তীক্ষ্ণকণ্ঠে বলেন, তোমাদের অনুমতি না নিয়েই যাচ্ছি, পিসীমা। এসব নীচু কথা শুনতে মাথা কাটা যাচ্ছে।
