.
ঘরের প্রদীপ নেভানো, রাসু এখনো বারবাড়ি থেকে আসে নি।
বৈশাখের দুরন্ত বাতাসে বৈশাখী চাপার মদির গন্ধ, ছোট ছোট গবাক্ষ-পথেও সেই বাতাস ঝলসে জলকে ঢুকে পড়েছে, আর সারা ঘরে ছড়িয়ে দিচ্ছে তার সুবাস।
এই রাত্রি, এই মোহময় বাতাস, আর এই ব্যথায় টনটনে বুক-এর মাঝখানে কি আনা যায়, সারদা অনেকদিন স্বামীসঙ্গ পেয়েছে, সারদার ছেলের বয়স এখন বারো!
ভাবা যায়, সারদার জীবনের ভোগপাত্রের দিকে হাত বাড়ানো শোভন নয়, স্বামীর অধিকার স্বেচ্ছায় ত্যাগ করে ভাঁড়ারের হাঁড়িকুঁড়ির মধ্যে জীবনের সার্থকতা খুঁজে বার করাই এখন তার উচিত।
আশ্চর্য, আশ্চর্য, কিছুতেই কেন বিশ্বাস হচ্ছে না এই ঘর সারদা এত দিন ভোগ করছে?
বরং দৃষ্টি-অন্ধকার-করে দেওয়া অশ্রু-বাম্পের সঙ্গে বারে বারে মনে হচ্ছে, ক’দিনই বা
মাঝে মাঝে কাদচ কখনো যে বাপের বাড়ি গিয়ে থেকেছে, সেইগুলোই যেন এখন মনে হচ্ছে বিরাট এক-একটা বিরতি।
কিন্তু গরীব গেরস্ত বাপ সারদার, কতই বা নিয়ে যেতে পেরেছে মেয়েকে! ওর এই ষোল সতেরো বছরের বিবাহিত জীবনের মধ্যে দিন মাস ঘণ্টা মিলিয়ে হিসেব করলে না হয় চার-পাঁচটা বছর!
তা হলেও তো হাতে থাকে এক যুগ।
কখন কোথা দিয়ে গেল সেই দীর্ঘ এক যুগ?
আস্তে আস্তে ঘরে এস ঢুকল রাসু। বরাবর যেমন ঢোকে। সারদা যে ধরনটাকে ব্যঙ্গহাসিতে অভিষিক্ত করে বলে, চোরের মতন।
এই নতুন বিয়ের বরের ভঙ্গীটা আর কোনদিনই বদলাল না রাসুর।
তবে কি সেও টের পায় নি কবে কখন তার বয়স আঠারো থেকে চৌত্রিশে এসে পৌচেছে? টের পায় নি, মাঝখানের সেই বয়সগুলো হাতফসকে পালাল কি করে?
তাই আজও শয়নমন্দিরে ঢুকতে তার লজ্জা!
.
আজ কিন্তু সমস্তটা দিন রাসুর বড় যন্ত্রণায় কেটেছে। অব্যক্ত সেই যন্ত্রণাটা যেন ধরা-ছোওয়া যাচ্ছে না, শুধু মনটা ভারাক্রান্ত করে রেখেছে।
তা যন্ত্রণার কারণ আছে বৈকি।
এ যন্ত্রণা শুধু যে রূপসী স্ত্রীকে এখনো চোখে দেখতে পায় নি বলে তা নয়, কর্তব্য নির্ধারণের দ্বন্দ্বই বেচারী রাসুকে এত বিচলিত করছে।
অতঃপর রাসুর কর্তব্য কি?
পূর্ব শপথ স্মরণ করে দ্বিতীয়বার মুখদর্শন না করা? সারদার প্রতিই একান্তক অনুরক্তি রেখে চলা? না শপথটা একটা মুখের কথামাত্র বলে উড়িয়ে দিয়ে
যন্ত্রণা এইখানেই।
উড়িয়ে দিলে সারদা যদি ভয়ঙ্কর একটা কিছু করে বসে? তা ছাড়া সারদা মর্মাহত হবে, সারদা রাসুকে ধিক্কার দেবে, ঘৃণা করবে, এ কথা ভাবতেও তো বুকটা ফাটছে।
অথচ সারদার প্রতি সেই আনুগত্যের শপথ রক্ষা করতে গেলে আর একটা নির্দোষ অবলা সরলার প্রতি অবিচার করা হয়। এতদিন পরে স্বামীগৃহ এসে স্বামীর এই নিষ্ঠুরতা দেখে সেও কি দুঃখে লজ্জায় অভিমানে দেহত্যাগ করতে চাইবে না? এতখানি আঘাত তাকে দেওয়া যাবে? যে নাকি বৌ নয়, যেন পদ্মফুল!
এই দোটানায় রাসু সারাদিন টুকরো টুকরো হচ্ছে।
তবু ঘরে ঢুকে সহজ হবার চেষ্টা করল রাসু। বলল, উঃ, কী অন্ধকার!
একটা মাত্র মাটির প্রদীপে মস্ত একখানা ঘরের অন্ধকার দূরীভূত হয় এ কথা রাসুর আমলে হাস্যকর ছিল না। তাই সেই দীপশিখাটুকুর অভাবে রাসু বলল, উঃ, কী অন্ধকার!
কিন্তু ও পক্ষ থেকে এ সম্পর্কে কোন সাড়া এল না।
রাসু যথানিয়মে দরজায় হুড়কোটা এঁটে সরে এসে এসে বলল, পিদ্দিম জ্বালো নি যে?
এবার সারদা কথা বলল।
আর আশ্চর্য, ভিতরকার সেই বেদনা-বিধুর হাহাকার যখন কথা হয়ে বেরিয়ে এল, এল তীক্ষ্ণ তীব্র একটি ব্যঙ্গের মূর্তিতে। হয়তো এইজন্যই স্বভাব জিনিসটাকে মৃত্যুর ওপার পর্যন্ত বিস্তৃতি দেওয়া হয়েছে।
সারদা তীক্ষ্ণ হুল ফোঁটানোর সুরে বলে উঠল, আর পিদিম জ্বালার দরকার কি? বাড়িতে যেকালে পুন্নিমা চাঁদের উদয় হয়েছে!
পূর্ণিমা চাঁদ!
রাসু সরল, রাসু অবোধ, রাসু এইমাত্র স্বর্গ হতে খসে পৃথিবীতে এসে পড়েছে। পূর্ণিমা চাঁদ মানে?
ও, মানে জানো না বুঝি? স্বামীকে যেন বিদ্রুপে খানখান করে দেয় সারদা, কেন, বাড়িসুদ্দু সবাই এত ধন্যি ধন্যি গাইছে, আর তোমার কানে ওঠে নি? তোমার দ্বিতীয়পক্ষর রূপেই তো ভুবন আলো গো! তাতেই আর তেল খরচা করে আলো জ্বালি নি!
রাসু হঠাৎ বল সঞ্চয় করে বলে ওঠে, মেয়েমানুষ বড় হিংসুটে জাত!
কী! কী বললে? সারদা যেন তীক্ষ্ণতার প্রতিযোগিতায় নেমেছে, মেয়েমানুষ হিংসুটে জাত?
তবে না তো কি?
মহাপুরুষ পুরুষজাতটা একেবারে দেবতা, কেমন? সারদা ক্ষুব্ধ গর্জনে বলে, কি বলব– মুখ ফুটে তুলনা করে দেখাতে গেলে মহাপাতকের ভয়, তবু বলি–মেয়েমানুষের অবস্থার সঙ্গে একবার নিজেদের অবস্থা মিলিয়ে দেখ না। পরিবার যদি একবার পরপুরুষের দিকে তাকায়, তা হলে তো মহাপুরুষের মাথায় খুন চাপে!
রাসু ধিক্কার-বিজড়িত কণ্ঠে বলে, ছি ছি, কিসের সঙ্গে কী! পরপুরুষের নাম মুখে আনতে লজ্জা করল না তোমার? দ্বিতীয় পক্ষ বুঝি পরস্ত্রী? ছিঃ!
সারদা কিন্তু এ-হেন ধিক্কারেও বিচলিত হয় না, তাই অনমনীয় কণ্ঠে বলে, তা দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ যত ইচ্ছে, পক্ষ জুটলে আর পরস্ত্রীতে দরকার? মেয়েমানুষের তো আর সে সুবিধে নেই?
রাসু হতাশ কণ্ঠে বলে, হিংসেয় জ্বালায় তোমার দিগ্বিদিক জ্ঞান ঘুচে গেছে বড়বৌ, তাই যা নয় তাই মুখে আনছ! নতুন বৌকে আমি আনতে যাই নি, গুরুজনরা বুঝেসুঝে এনেছে। নইলে এযাবৎ কাল তো সেখানেই পড়ে ছিল!
