অভয়া আরও খিঁচিয়ে বলেন, তা দিবি কেন? কারুর আর এসে কাজ নেই, ভাগ নিয়ে কাজ নেই। একা তোর মা-ই সব্বস্ব দখল করে বসে থাকুক।
তা তার সেই ছোটকাকা নিরুদ্দেশই হয়ে গেল, বিয়ে আর হল না।
অভয়া ভাবেন, এ ঐ অপয়া ছেলেটার বাক্যির ফল।
আর বাক্যগুলো মার শিক্ষার ফল।
সারদা হাতের বাইরে বলে অভয়া হাতের মুঠোয় পুরতে পারেন এমন একটি হাতের পুতুলের বাসনা করছেন। তাকে নিয়ে অভয়া সাজাবেন খাওয়াবেন চোখের ইশারায় ওঠাবেন বসাবেন।
মেজবৌটা এলেও হত!
অথচ অভয়ার মেজছেলের বিয়ের কথা মুখেও আনছেন না রামকালী। বরং একদিন বড় ভাইয়ের মুখের ওপরই স্পষ্ট বলেছিলেন, ওই অপদার্থটার বিয়ে দিয়ে কি হবে?
অপদার্থ বলে যে বেটাছেলের বিয়ে হবে না, এমন ছিষ্টিছাড়া কথা ত্রিসংসারে কে কবে শুনেছে? কিন্তু কুঞ্জ চিরদিনই ছোট ভাইয়ের ভয়ে কাঁটা। সমালোচনা যা করেন সে আড়ালে। তাই যা বলেছেন আড়ালেই বলেছেন। নিজে সাহস করে বিয়ের ব্যবস্থা করতে যান নি।
যাক, এতদিনে অভয়ার একটা নিজস্ব বস্তু পাবার আশা হচ্ছে।
কিন্তু একেবারে নিঃসংশয় সুখ জগতে কোথা?
নতুন বৌয়ের বয়সের কথা ভেবে বুকের মধ্যে তেমন স্বস্তি নেই।
বুড়ো শালিখ কি পোষ মানবে?
পাকা বাঁশ কি নুইবে?
.
কিন্তু পটলী কি পাকা বাঁশ?
কে জানে পটলী কি!
মেয়েমানুষ যতক্ষণ না নিজের স্বার্থ-কেন্দ্রে এসে দাঁড়ায়, ততক্ষণ তাকে কে চিনতে পারে? ভাল মেয়ে লক্ষ্মী মেয়ে এসব বিশেষণ কত ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়ে যায়।
পটলী কি তা না জানলেও পটলীর ফাড়া কাটার খবর পাওয়া পর্যন্ত সারদার বুকে বাঁশ পড়েছে। কে যেন সেই বাঁশ দিয়ে অহরহ ডলছে তাকে।
আর রাসু?
রাসুরও যন্ত্রণার শেষ নেই।
মনের মধ্যে দারুণ এক ভয়, অথচ পুলককম্পিত আবেগ। না জানি সেই সাত বছরে মেয়েটি আঠারো বছরের হয়ে কেমনটি হয়েছে। এখান থেকে পত্তর নিয়ে যে গিয়েছিল, সেই রাখুর মা তো এসে বলেছেন, বৌ তো নয়, যেন পদ্মফুল!
শুনে অবধি এক অবর্ণনীয় সুখকর যন্ত্রণা রাসুর মনকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
সেই পদ্মফুল কি রাসুর পূজোয় লাগতে দেবে সারদা? নাকি বহুদিন আগের সেই এক দুর্বল মুহর্তের শপথটা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বঞ্চিত করে রাখবে রাসুকে?
সারদা কোনদিনই পদ্মফুল নয়।
পদ্ম গোলাপ চামেলী মল্লিকা কিছুই নয়, ফুলের সঙ্গেই যদি তুলনা করতে হয় তো বলতে হয় অপরাজিতার গা-ঘেঁষা।
কিন্তু শ্যামলা রং হলেও তীক্ষ্ণ মুখশ্রী আর অনবদ্য গঠন-সৌকুমার্যের জোরে এ বাড়ির বড়বৌ হয়ে ঢোকবার সৌভাগ্য তার হয়েছিল।
আর এখন প্রবল ব্যক্তিত্বের জোরে বাড়ির একেবারে শীর্ষস্থানীয় হয়ে বসে আছে সে। কিন্তু রাসু এখনো জীবনরসের সন্ধানী নবীন যুবক। প্রখরা আর মুখরা সারদাকে সে আজকাল ভয় করে।
অবশ্য স্বামীসেবার নিখুত নৈপুণ্যে বরকে আয়ত্তে রেখে দিয়েছে সারদা নিখুত ভাবেই। এখনো গরমকালের রাতে পাখা ভিজিয়ে বাতাস করে স্বামীকে, শীতের রাতে পিদ্দিমে হাত তাতিয়ে ঠাণ্ডা সিরসিরে হাত-পা গরম করে দেয় তার।
আর সংসারের কাজে রান্নাঘরের গরমে যতই গলদঘর্ম হোক, শৌখিন বরটির কাছে রাতে শুতে আসার সময় গা-হাত ধুয়ে কোচানো মিহি শাড়িখানি পরতে ছাড়ে না, মাথায় গন্ধ তেলটি দিয়ে একটু চকচকে হয়ে আসতে ভোলে না।
কিন্তু প্রস্ফুটিত পদ্মের সঙ্গে কি গন্ধ তেল পাল্লা দিতে পারবে?
.
বৌ এসে দাঁড়াতেই একা ধন্যি ধন্যি রব উঠল। উঠল দু কারণেই। একে তো বৌয়ের রূপ, তার উপর ঘরবসতের সামগ্রীর বহর।
রামকালী কবরেজের সংসারে প্রয়োজনের অতিরিক্ত প্রাচুর্য, ঘর-সংসারের জিনিসপত্র তিনি অপ্রয়োজনেই কতকগুলো করে করিয়ে রেখে দেন, কোন একটা উপলক্ষ হলেই। খুঁজলে বাড়িতে ছোটয়-বড়য় খাবারো জাতা মিলবে, খানষোল শিল। জলের ঘড়া না হোক গোটা চল্লিশ-পঞ্চাশ। তবু মেয়েদের মন!
সেই শিল-নোড়া আঁতা-কুলো ঘড়া-ঘটি ইত্যাদি করে সংসার-নির্বাহের তুচ্ছ উপকরণগুলোই তাদের মন আহ্লাদে ভরে তোলে।
সকলেই একবাক্যে স্বীকার করে, কুটুমের নজর আছে। ঠানদি নন্দরাণী হেসে বলে, না দেওয়ার মধ্যে দেখছি ঢেঁকি। একটা ঢেঁকি দিলেই রাসুর শ্বশুরের ষোলকলা দেওয়া হত। ঘরবসতে বৌমার বেহাই ওইটেই বা বাকী রাখল কেন?
না, ঢেঁকিটা পটলীর বাবা দেয় নি।
কিন্তু পটলীকে দিয়েছে!
আর পটলীই ঢেঁকির মুষল হয়ে অন্তত একজনের বুকের গহ্বরে পাড় দিতে শুরু করেছে।
তবু সেই টেকির পাড়ের মধ্য থেকেই শক্তি সঞ্চয় করে নেয় সারদা। সংকল্প করে এ সতীনকে সে স্বামীর ধারেকাছে আসতে দেবে না। সেই সিংহবাহিনীর শপথটা রীতিমত কাজে লাগাবে।
তা ছাড়া আর উপায় কি!
রাসুকে তো চিনতে বাকী নেই সারদার। এই রূপসীর কাছে আসতে পেলে রাসু তো তদ্দণ্ডেই মাথা মুড়িয়ে তার চরনে নিজেকে বিকিয়ে দেবে।
.
প্রথম দিন অবিশ্যি অভয়াই বৌকে কাছে নিয়ে শুলেন এবং অনেক রাত পর্যন্ত জেগে আর জাগিয়ে বৌকে জ্ঞানদান করতে চেষ্টা করলেন…এ সংসারে তার কে আপন কেহ পর! কাকে সমীহ করতে হবে, আর কাকে সন্দেহ করতে হবে।
কিন্তু পরদিন কি হবে?
অথবা তারও পরদিন?
পর পর চিরদিন?
সারদা সেই কথাই ভাবতে থাকে।
আজ তো গেল। কিন্তু কাল?
এবং চিরকাল?
রাসুর জন্যে না হয় সিংহবাহিনীর শপথ। কিন্তু সংসারের আর দশজনের কী ব্যবস্থা? তাদের প্রশ্নবান যখন বিষের প্রলেপ মেখে বুকে এসে বিধবে? কি উত্তর দেবে সারদা?
