.
ওদিকে পাটমহলে মস্ত তোড়জোড়।
ফাঁড়া কেটেছে এতদিন পরে, ঘরবসত হচ্ছে মেয়ের, ঘরভরা জিনিস দেবার বাসনা পটলীর মা বেহুলার। জিনিস গোছাচ্ছে, আর উঠতে বসতে মেয়েকে উপদেশ দিচ্ছে কিসে মেয়ে শ্বশুরবাড়ি গিয়ে “একজন” হতে পারে। মেয়েটা যে বড় ন্যাকা-হাবা, তাই ভাবনা বেহুলার।
তবে অন্যদিকে একটা মস্ত ভরসা আছে পটলীর মার। অলক্ষ্যে প্রতি মূহুর্তে মেয়ের দিকে তাকিয়ে দ্যাখে আর সেই ভরসায় আলো মুখে ফুটে ওঠে। পটলীর সতীনের বয়সটা মনে মনে হিসেব করে সে আলো আরও জোরালো হয়। পটলীর সঙ্গে কার তুলনা?
একে তো ভরন্ত বয়েস, তায় আবার এতকাল অবধি বাপের ঘরে নিশ্চিন্দির ভাত খেয়ে খেয়ে গড়ন হয়েছে পুরন্ত। আর রূপ? সে তো সেই শৈশভ থেকেই একরকম ডাকসাইটে।
ঘরে পরে সবাই বরং ওই রূপের জন্যেই খোটা দেয় তাকে। বলে, অতি বড় সুন্দরী না পায় বর, শাস্তরের এ কথাটা নতুন করে প্রমাণ করছিস পটলী তুই। এর থেকে আমাদের কালো খেদি মেয়েরা অনেক ভাল। তোর বয়সী সবাই তিন-চার ছেলের মা হল।
এখন আবার ভয়ও দেখাচ্ছে অনেকে।
বলছে, সতীন এখন স্থলকূল দিলে হয়! এযাবৎ একা পাটেশ্বরী হয়ে রয়েছে-পটলীর মা, তুমি মেয়ের গলায় কোমরে ভালমতন রক্ষাকবচ বেঁধে দিও। কে জানে কার মনে কি আছে! মেয়েকে বারণ করে দিও যেন সতীনের হাতের পান জল না খায়!
.
আশা আর আশঙ্কা, স্বপ্ন আর আতঙ্ক, এই নিয়ে দিন কাটাতে কাটাতে অবশেষে একদিন পটলীর জীবনের সেই পরম দিনটি এসে পড়ে। শ্বশুরবাড়ি যাত্রা করে পটলী।
বাড়িটার খানিক খানিক ঝাঁপসা ঝাঁপসা মনে আছে। বড় যে উঠোনটায় বৌছত্তরের উপর গিয়ে দাঁড়িয়েছিল, মস্ত যে দালানটায় তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে বসিয়েছিল, ঘাটের যে ধারটায় স্নান করিয়েছিল পটলীকে, যে ঘরে আটদিন বাস করেছিল সে, এইরকম একটু একটু–আর বিশেষ কিছু না।
অতগুলো মেয়েমানুষের মধ্যে কে যে তার সতীন, সে কথা বুঝতেই পারে নি পটলী। তা ছাড়া বোঝবার চেষ্টাই বা করেছে কে? কেঁদে কেঁদে যার চোখ ফুলে করমচা!
শুধু তো শ্বশুরবাড়ি আসার কান্না নয়, নিজেকে ভয়ঙ্কর একটা অপরাধী ভেবে আরও কান্নার যোগ হয়েছিল তার সঙ্গে। সত্যি, পটলীর মত মহা-অপয়া ত্রিজগতে আর কে আছে?
বিয়ের বর বিয়ে করতে এসে রাস্তায় মরে, এমন কথা কে কবে শুনেছে? তার পর আবার এ বাড়ি? বৌভাতের যজ্ঞির দিন বাড়ি যখন রমরম করছে, তখন কিনা বাড়ির একটা জলজ্যান্ত বৌ হারিয়ে গেল! শুনে হা হয়ে গিয়েছিল পটলী।
পুরুষমানুষ রাস্তায়-ঘাটে বেরিয়ে সাপের পেটে বাঘের পেটে কি চোর-ডাকাতের হাতে পড়ে হারিয়ে যেতে পারে, কিন্তু মেয়েমানুষ? বিশেষ করে বৌ-মানুষ? ঘরের মধ্যে থেকে হারিয়ে যাবে কি? ভূতে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া ব্যাপার ছাড়া আর কিছু ব্যাখ্যা করা চলে না এর।
সেই ব্যাখ্যাতেই নিশ্চিন্ত হয়ে সকল কারণের মূল নিজের উপর বিকারে আর ভয়ে যখন খালি কেঁদে আকুল হয়ে যাচ্ছিল, তখন সত্য এসে জ্ঞান দিয়েছিল তাকে।
হ্যাঁ, ওই আর একটা বস্তু মনে আছে পটলীর।
সত্য!
আর্শির মতন চকচকে সেই বড় বড় দুটো চোখ, আর তার উপরকার ঘনকালো জোড়া ভুরু, এখনও যেন স্পষ্ট মনে পড়ে যায় পটলীর।
পটলীর কান্নার কারণ শুনে সেই ভুরু কুঁচকে বলেছিল সত্য, নিজেকে অপয়া বলে কেঁদে মরছ কেন? ভগবান যার ভাগ্যে যা লিখে রেখেছে তার তাই হবে। নিজেকে সমস্ত ঘটন-অঘটনের হেত ভাববার হেতু? তুমি যদি না জন্মাতে, এই পৃথিবীর কলকব্জা বন্ধ থাকত?
অবাক হয়ে গিয়েছিল পটলী তার সেই প্রায় সমবয়সী খুড়তুতো ননদের কথা শুনে। তার জীবনে এ হেন কথা সে কখনো শোনে নি। তাও আবার এতটুকু মেয়ের মুখে!
অথচ এই কদিন পরে অনবরত সব গুরুজনের মুখে শুনছে পটলী, পটলীই নাকি সকল অঘটনের কারণ।
পটলীর দোষেই নাকি যত কিছু খারাপ।
সেই ননদ এখন নিশ্চয় শ্বশুরবাড়ি। কোন মেয়েটা আর পটলীর মত ফাঁড়া নিয়ে বাপের বাড়ি বসে থাকে?
.
তোড়জোড় এ বাড়িতেও চলছিল।
অভয়া যেন একটু বেশী-বেশীই করছেন।
করছেন ভালবেসে যতটা না হোক, লোক জানাতে। সারদা এবং সারদার সুয়োরা যাতে হৃদয়ঙ্গম করতে পারে, যে আসছে সে কারো করুণার ভিখিরী হয়ে নয়। আসছে রীতিমত অধিকারের দাবী নিয়ে।
অবিশ্যি ঘরটা সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছু উচ্চারণ করতে পারেন নি, কিন্তু ইশারায় ইঙ্গিতে ব্যক্ত করেছেন, এখন থেকে সারদার উচিত ছেলেদের নিয়ে এদিককার ঘরে শোওয়া। ছেলে ডাগর হয়ে উঠেছে, আর এখন ঘর আগলানো কেন?
তবে সারদা এসব ইশারা-ইঙ্গিত গায়ে মাখে না। বড় ছেলে ডাগর হয়ে ওঠা অবধি তো তাকে তার কাকাদের কাছে ভর্তি করে দিয়েছে সারদা। নিজের এলাকা ঠিক রেখেছে।
বড় ছেলে ‘বনু’ বা বনবিহারী তো ছোটকাকা নেড়ুর প্রাণপুতুল ছিল। নেড়ু হারিয়ে যাওয়া অবধি অন্য কাকাঁদের। প্রাণপুতুল অবশ্য সকলেরই, কিন্তু সর্বেসর্বা প্রথম নাতিটিকে অভয়া যেন তেমন দেখতে পারেন না। ছেলেটা শুধু সারদার পেটের বলেই নয়, বড় বেশী মা-ঘেঁষা বলেও। তাই যখন-তখনই তাকে খিঁচিয়ে বলতেন, রাতদিন ছোটকাকা ছোটকাকা! ছোটকাকার যখন বিয়ে হয়ে যাবে?
মেজকাকা থাকতে ছোটকাকার বিয়ে কেন হবে, অথবা বিয়ে হলে ভাইপোর সঙ্গে সংঘর্ষ বাধবার কারণটা কি, এ প্রশ্ন করত না ছেলেটা, শুধু সবেগে বলে উঠত, ছোটকাকাকে বিয়ে করতে দেবই না।
