চোখের জল ছেলের গায়ে!
সত্য আঁচলটা তুলে ঘষে ঘষে চোখটা শুকনো করে ফেলে সভয়ে তাকিয়ে দেখে, ছেলের গায়ে কোথাও জলের ফোঁটা লেগে আছে কিনা।
এই তো এই যে! এই যে জলের ফোঁটা! শিউরে ওঠে সত্য।
হে মা ষষ্ঠী, রক্ষা করো মা। এমন বুদ্ধিহীনের মত কাজ আর কখনো করবে না সত্য।
কল্পিত সেই জলের ফোঁটা আঁচলের কোণ দিয়ে মুছে নিয়ে ছেলেকে নিবিড় করে ধরে সত্য। মৃত্যুর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে জীবনের মুখোমুখি বসে।
২৭. ভাগ্যবানের বোঝা ভগবান বয়
কথায় বলে, ভাগ্যবানের বোঝা ভগবান বয়! রাসুর বৌ সারদা অবশ্য নিজেকে খুব একটা ভাগ্যবতী মনে করে না, বরং যখন তখন আমার যেমন ভাগ্য বলে আক্ষেপ করতে ছাড়ে না। কিন্তু এক হিসেবে এযাবৎ ভগবান তার বোঝা বয়ে এসেছেন। বয়ে এসেছেন গ্রহ-নক্ষত্রের একটি সুকৌশল সমাবেশ ঘটিয়ে।
নইলে পাটমহলের লক্ষ্মীকান্ত বাঁড়ুয্যের নাতনীর তো এখনো পাটমহলেই পড়ে থাকবার কথা নয়। কিন্তু তাই পড়ে আছে সে, সারদাকে নিঃসপত্নী রাজভোগের সুযোগ দিয়ে।
লক্ষ্মীকান্ত নেই, কিন্তু তার পুত্র শ্যামকান্ত বাপের ঠাট-বাট বজায় রেখেছেন। সর্ববিধ আচার-আচরণ মেনে চলেন তিনি। নড়তে-চড়তে পাঁজিপুঁথি দেখেন এবং গ্রহ ফাঁড়া ঠিকুজিকোষ্ঠী ইত্যাদি গোলমেলে ব্যাপারে প্রত্যেক সময় কাশী-প্রত্যাগত জ্যোতিষার্ণব ঠাকুরের উপদেশ গ্রহণ করে থাকেন।
জ্যোতিষার্ণই পটলীর কোষ্ঠী দেখে তার পতিগৃহে যাত্রা সম্পর্কে একটি বিশেষ বিধিনিষেধ আরোপ করেছিলেন।
ঘোষণা করেছিলেন, আঠারো বছরে পদার্পণের আগে পটলীর স্বামী-সন্দর্শনে বিপদ আছে। উক্ত কলাবধি তার পতিসুখস্থানে রাহুর কটাক্ষ।
জোতিযার্ণবের ঘোষণায় অবশ্য আশ্চর্য কেউ হয় নি, বরং যেন এ ধরনের একটা কিছু না হলেই আশ্চর্য হত। কারণ পটলীর পতিসুখস্থানে যে রাহুর সৃষ্টি, সে আর জ্যোতিষীকে বলতে হবে কেন? সে তো তার বিয়ের দিনই হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া গেছে।
নেহাৎ নাকি ওর বাপের পূর্বজন্মের পুণ্যি ছিল, তাই সেই বিয়ের বর রামকালী কবরেজের দৃষ্টিপথে পড়ে গিয়েছিল। নয়তো পটলীকে তো বাসররাতেই শাখানোয়া খুলতে হত। আর নয়তো দাপড়া আধাবিধবা হয়ে জীবনটা কাটাতে হত।
রামকালী কবরেজ ভগবান হয়ে এসে উদ্ধার করেছেন। কিন্তু অদৃষ্টের ফল কে খণ্ডাবে বল! তাই গ্রহ-নক্ষত্ররা আঙুল তুলে নিষেধ করে রেখেছে, পটলী, তুই স্বামীর দিকে চোখ তুলবি না। অন্তত আঠারো বছর বয়স হবার আগে নয়।
লক্ষ্মীকান্তর শ্রাদ্ধের সময় সামাজিক আচার অনুযায়ী জামাইকে শ্যামাকান্ত নিমন্ত্রণ করেছিলেন। তবে বাড়িতে কড়া শাসন করে রেখেছিলেন, মেয়ে-জামাইয়ে দেখাশুনো না হয়। কিন্তু ভাগ্যচক্রে জামাইয়ের আসাই হল না। সেইদিনই নাকি জামাইয়ের রক্ত-আমাশা দেখা দিল। কে জানে সের দুই কাঁচা দুধ খাবার ফল কিনা সেটা।
যাক সে সব তো অতীত কথা।
শ্যামাকান্ত মেয়ের শ্বশুরকে তার কোষ্ঠীঘটিত বিপর্যয় জানিয়েছিলেন। কাজেই এতদিন ওপক্ষ থেকে বৌ নিয়ে যাবার প্রস্তাব ওঠে নি। দীনতারিণীর অত বড় সমারোহের শ্রাদ্ধেও শ্বশুরবাড়ি আসা হল না তার।
এক ঘাট করতে যে যেখানে জ্ঞাতিগোত্র ছিল সবাই এসে জড় হল, সত্য পুণ্যি কুঞ্জর পাঁচ পাঁচটা শ্বশুর-ঘরন্তী মেয়ে, শিবজায়ার দৌতুরগুষ্টি, বাকী কেউ থাকে নি বাকী ছিল শুধু পটলী যে নাকি সর্বপ্রধানের এক প্রধান।
কিন্তু এবার সময় এসেছে।
আঠারো বছরে পদার্পণ করেছে পটলী। কুঞ্জগৃহিণী অভয়া ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন নতুন বৌকে আনতে। মুখে বলেছেন অবশ্য, আর ফেলে রাখলে কি ভাল দেখায়, কিন্তু ভিতরের উদ্দেশ্য আরো গভীর, উদ্দেশ্য বড় বৌয়ের তেজ অহঙ্কার ভাঙা। সারদার যত তেজ, তত অহঙ্কার। দিন দিন যেন বাড়ছে। সংসারে ভুবনেশ্বরীর শূন্য স্থানটা কেমন করে কে জানে আস্তে আস্তে সারদার দখলে এসে গেছে। ভুবনেশ্বরীর মতই সারদা ভিন্ন যেন সব দিক অচল। কিন্তু ভুবনেশ্বরীর নম্র নীরবতা সারদার মধ্যে নেই, সারদা যতটা চৌকস, ততটাই প্রখর। শাশুড়ীকেও সে ডিঙিয়ে যেতে চায়।
অথচ দীনতারিণীর মৃত্যুতে গিন্নীর যে পদটা অভয়ার পাবার কথা, তা যেন অভয়া পেল না। অভয়ারা সেই হেঁসেলে চাকরির ঊর্ধ্বে নতুন কিছু হল না, বরং সেটাই আরো জটিল হয়ে উঠেছে। কাশীশ্বরী তো নেই-ই, হঠাৎ পড়ে গিয়ে হাত ভেঙে মোক্ষদাও কেমন কমজোরি হয়ে গেছেন। কাজেই অভয়াকে সদ্য-স্নানান্তে ওঁদের ঘরেও কিছু গুছিয়ে দিয়ে আসতে হয়। বাটনাটা জলটা।
মোক্ষদা হাতী হাবড়ে পড়ার নীতি’তেই সেই চির-অস্পৃশ্যার জল স্পর্শ করেন।
অতএব সমগ্ৰ সংসারটা অনেকটা বেলা পর্যন্ত সারদার হাতেই থাকে। সঙ্গে থাকেন অবশ্য শিবজায়া, থাকেন আরও জ্ঞাতি মহিলারা, কিন্তু আশ্চর্য, সবাই যেন আমে দুধে মিশে গেছে। অভয়া-রূপিণী আঁটির ঠাই হয়েছে ছাইগাদায়। অন্তত অভয়ার তাই ধারণা।
বৌয়ের এই প্রতাপ, এই দপদপা আর সহ্য করতে পারছেন না অভয়া। ঢিট করতে ইচ্ছে করছে বৌকে। তা অস্ত্র তাঁর হাতে এসে গেছে এবার। শ্যামাকান্ত জানিয়েছেন, আঠারো বছরে পা দিয়েছে পটলী।
শুনে বুকের জোর বাড়ল অভয়ার। ভাবলেন বড়বৌমার তেজ আসপদ্দা কমুক একটু। সতীন এনে বুকে দিলে মেয়েমানুষ যেমন করে ঢিট হয়, তেমন আর কিসে?
