এলোকেশী আঁতুড়ের দরজায় এসে মুখটা কঠিনে কোমলে করে বললেন, আঁতুড়ঘরে কাঁদতে নেই, কাঁদলে ছেলের অকল্যাণের ভয়, নাড়ীর দোষ হবার ভয়, সাবধান করে দিয়ে খবরটা বলি বৌমা, ভেদবমি হয়ে তোমার মা-টি মরেছেন। লুকোছাপা করে চেপে রাখবার তো খবর নয়, চতুর্থী করা না হোক, দুদিন মাছভাতটা তো বন্ধ দিতে হবে। তাই জানিয়েই দিলাম দেখি, ভটচার্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পাঠাই, এক্ষেত্তেরে কী বিধিব্যবস্থা!
একটা সদ্যপ্রসূতি তরুণী মেয়ের নিঃশঙ্ক বুকে বেপরোয়া একখানা ধারালো ছুরি বসিয়ে দিয়ে নিতান্ত সহজভাবে সেখান থেকে সরে গেলেন এলোকেশী। ছুরিটার ক্ষমতার বহরও তাকিয়ে দেখে গেলেন না।
কিন্তু পাড়ায় বেরিয়ে এলোকেশী তার প্রায় সখীমহলে এই সরেস খবরটি পরিবেশন করে বলে বেড়ালেন, দেখলি তো? মিথ্যে বলি কাঠপ্রাণ? মা মরার খবর শুনে পাট প্যাট করে তাকিয়ে বসে রইল, ডুকরে কেঁদে উঠল না!
সত্যিই ডুকরে কেঁদে সত্যবতী ওঠে নি।
স্তম্ভিত বিস্ময়ে শুকনো চোখ মেলে বসেই ছিল অনেকক্ষণ। তার পর কখন একসময় নবজাত শিশুটা তার দেহের ওজনের চেয়ে অনেক গুণ বেশী ওজনের চিৎকার করে উঠেছে, ধীরে ধীরে তাকে কোলে তুলে নিয়ে এদিকে পিঠ ফিরিয়ে চুপ করে বসে থেকেছে দেওয়ালের দিকে মুখ করে।
ওদিকে যদি একটুকরো জানলা থাকত, সত্যর প্রাণটা বুঝি তাহলে সেই খোলা পথটুকু দিয়েই দষ্টির খেয়া-নৌকা চড়ে অসীম আকাশে সাঁতরে সাঁতরে আছড়ে গিয়ে পড়ত সেই তার শৈশবনীড়ে।
যেখানে মেজবৌ পরিচয়ে চিহ্নিত একটি নিটোল মুখ, ফর্সা রং, ছোটখাটো মানুষ ভীরু কণ্ঠিত পদক্ষেপে সারাদিন শুধু সকলের মনোরঞ্জন করে বেড়াচ্ছে। আর তারই আশেপাশে এখানে সেখানে, তাকে প্রায় বিস্মৃত হয়ে দৃপ্ত পদপাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে একটি গাছকোমর-বেঁধে কাপড় পরা স্বাস্থ্যবতী তালিকা। কিন্তু এই আঁতুরঘরের এধারে ওধারে কোন ধারেই জানালা নেই। তিনদিকেই বেরলেপা নিরেট মাটির দেওয়াল। দৃষ্টি সেখানে অচল হয়ে থেমে থাকে।
কেন সর্বদা এমন ভয়ে ভয়ে থাকে, এই নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করত সত্যবতী। বলত, ভয় ভয় ভয়! এই ভয়ের জ্বালাতেই সগগ পাবে না তুমি মা, দেখে নিও।
সত্যবতীর মা কি স্বর্ণ পায় নি।
সত্যবতীর প্রাণটা তবে কেন ‘স্বর্গ’ নামক সেই এক অদৃশ্যলোকের অসীম শূন্যতায় হাহাকার করে বেড়াচ্ছে?
মা নেই, মাকে আর দেখতে পাবো না, এ কথা মনে রাখতে পারছে না সত্য, শুধু মনে হচ্ছে সেই চিরমমতাময়ী মানুষটা যেন ভয়ঙ্কর এক নিষ্ঠুর খেলায় মেতে একছুটে কোন দূর-দূরান্তর লোকে পোঁছে গিয়ে সত্যকে দুয়ো দিয়ে ব্যঙ্গহাসি হাসছে।
বলছে, কি গো, রাতদিন তো নিজের খেলা নিয়েই উন্মত্ত হয়ে বেড়াতে, মা বলে যে একটা মানুষ ছিল সংসারে, তার দিকে তাকিয়ে দেখেছিলেন কোন দিন? মনে রেখেছিলে তুমি তার একমাত্র সন্তান, তুমি ছাড়া আপনার বলতে আর কেউ নেই তার?
মা মারা গেছেন এ দুঃখের চেয়ে দুরন্ত হয়ে উঠছে সত্যর ছেলেবেলাকার সত্যর সেই মার প্রতি ঔদাসীন্যের দুঃখ। মাকে কেন ভাল করে দেখে নি সত্য, দু’দন্ড কেন স্থির হয়ে বসে নি মার কোলের কাছে? কেন রাতে আর পাঁচটা মেয়ের সঙ্গে ঠাকুমার ঘরে শোয়ার বদলে মায়ের গলাটি জড়িয়ে ঘুমোয় নি? প্রায় তো সেই কুণ্ঠিত মানুষটি ভীরু ভীরু মুখটি হাসিতে উজ্জ্বল করে চুপি চুপি অনুনয় করত, এ ঘরে আমার বিছানায় শুবি আয় না! রূপকথার গল্প বলব!
যার কাছে এই অনুনয়, সে কোনদিনই তার মান রাখত না। নিতান্ত তাচ্ছিল্যে বণত, হুঁ, কতই গল্প জান তুমি! ওঘরে বলে আমার বন্ধুরা সবাই-ওদের ছেড়ে তোমার কাছে শুতে আসব আমি? বলিহারী কথা বটে!…
কী পাষাণ ওই মেয়েটা গো! কী পাষাণ!
গোবরলেপা ওই নিরেট দেওয়ালটায় মাথা কুটে কুটে মাথার মধ্যেকার ভয়ঙ্কর যন্ত্রটাকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলতে ইচ্ছে করে সত্যর।
ভগবান, একবারের জন্যে সেই দিনটা এনে দিতে পারো না? সত্য তাহলে সেদিন সেই নিষ্ঠুর মেয়েটার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে?
সেই ছোটখাটো দেহটাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে বুকে মুখ গুঁজে বলে, মা মাগো, নিষ্ঠুর ছিল না সে মেয়েটা, শুধু অবোধ ছিল!
ইদানীং-এর মাকে, শ্বশুরবাড়ি থেকে ঘুরে গিয়ে দেখা মাকে, কিছুতেই যেন মনে পড়াতে পারে না সত্য, ঘুরেফিরে শুধু মার সেই নিতান্ত বধু-মূর্তিটিই রামকালী কবরেজের মস্ত বড় বাড়িটার সর্বত্র সঞ্চরণ করে ফেরে।
সত্য যদি এখুনি মরে যায়, ‘স্বর্গ’ নামক সেই জায়গাটায় কি দেখা হবে মার সঙ্গে? তা হলে সত্য তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ডুকরে কেঁদে উঠবে, মা মাগো, এত পাষাণ তুমি কী করে হলে মা!
আত্মবিস্মৃত সত্য কি মনে করে বসেছিল, সত্যিই সেখানে পৌঁছে গেছে? ঝাঁপিয়ে পড়েছে মার বুকে? আর তার ডুকরে ওঠাটা এত তীক্ষ্ণ হয়ে গেছে যে মর্ত্যলোকের এইখানে এসে ধাক্কা দিয়েছে?
নইলে এলোকেশী ছুটে আসবেন কেন? কেন কঠিন গলায় ধমকে উঠবেন, বৌমা, একটাকে বিসর্জন দিয়ে আশ মেটে নি, এটাকেও দিতে চাও? ওই আঁতুড়-ষষ্ঠীর ছেলে কোলে নিয়ে মড়াকান্না? বুকের পাটাকেও ধন্যি! বলি মা বাপ কি কারো চিরদিনের? তবু তো বিধাতাপুরুষের সুবিচার হয়েছে, বাপ না গিয়ে মা গিয়েছে। শাঁখা-সিঁদুর নিয়ে এয়োসতী ভাগ্যবতী ড্যাংডেঙিয়ে চলে গেল, দেখে আহ্লাদ কর, তা নয় মা-মা করে চিৎকার তুলছ! বলি আর বেশীদিন বাচলে কপালে দুর্ভোগ ছাড়া কি ছাই সুখভোগ আসত? হাত শুধু করে থান পরে বোগনো বেড়ির ঘরে ভর্তি হতে হত না? চোখের জল যদি ছেলের গায়ে পড়ে বৌমা, তোমায় আমি বাপান্ত করে ছাড়ব তা বলে দিচ্ছি, মা-মা করে ন্যাকামি করা বার করে দেব।
