এ রোগে রোগীর শেষ অবধি জ্ঞান থাকে, চৈতন্য বিলুপ্তি ঘটে না। কিছু একটু বলবার জন্যে ভয়ঙ্কর একটা আকুলতা যে সেই মৃত্যুপথযাত্রিনীর ভিতরটাকে তোলপাড় করছে তা সেই বাতাসে– কাঁপা ক্ষীণ প্রদীপশিখার আলোতে ধরা পড়ল।
রামকালী তেমনি রুদ্ধগম্ভীর আবেগকম্পিত গলায় বললেন, মেজবৌ, এমন কঠিন শাস্তি কেন?
মুহর্তের জন্য রোগিণীর ভিতরকার সেই আকুলতার জয় হল। ঠোঁটটা, নড়ে উঠল। উচ্চারিত হল, ছি!
সত্যকে না দেখেই চললে?
হঠাৎ সেই কাঠ হয়ে আসা দেহটা বিদ্যুতাহতের মত নড়ে উঠল, একঝলক জল সেই কোটরগত চোখের চারধার থেকে উথলে উঠে গড়িয়ে পড়ল।
রাসুর হাতে প্রদীপটা নিভে গেল বাতাসের ঝটকায়।
গত রাত্রে সহজ সুস্থ ভুবনেশ্বরী সংসারের বহুবিধ কাজ সেরে, আগামী সকালের রসদ বাবদ তিন-তিনটে মোচা কুটে রেখে, এক জামবাটি ডাল ভিজিয়ে ঘুমোতে গিয়েছিল, আজ আর সে সেই সকালের মুখ দেখতে পেল না। ভোরের প্রথম আলো একজোড়া ঘুমন্ত চোখের ওপর এসে স্থির হয়ে পড়ে রইল ব্যর্থতার গ্লানি বহন করে।
রাসু মেয়েমানুষের মত হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল। কেঁদে উঠল যে যেখানে ছিল সকলেই। মোক্ষদার তীব্র তীক্ষ্ণ চিৎকার প্রথম ভোরে স্নিগ্ধ পবিত্রতাকে যেন দীর্ণ-বিদীর্ণ করে ধিক্কার দিয়ে উঠল।
কুঞ্জ ভাসুরমানুষ, বেশী কাছে আসবেন না, দূরে বসে বুচাপড়ে বলে উঠলেন, জীবনভোর এত লোককে বাঁচালে রামকালী, সোনার প্রতিমা ঘরের লক্ষ্মীকে বাঁচাতে পারলে না? হেরে গেলে?
রামকালী শুধু একবার সেই হাহাকারের দিকে ফিরে তাকালেন, বললেন না, যুদ্ধের অবকাশ পেলাম কই?
অজাতশত্রু ভুবনেশ্বরীর মরণকালে তার পরমদেবতার সঙ্গে যেন ভয়ঙ্কর একটা শক্রতা সেধে গেল।
সেজকর্তা ভাঙা-ভাঙা গলায় মন্ত্রোচ্চারণের ভঙ্গীতে বললেন, নারায়ণ নারায়ণ! অন্তিমে নারায়ণ! রামকালী, আত্মা এখানেই অবস্থান করছেন, নারায়ণের নাম কর।
আপনারা করুন। বলে রামকালী উঠে দাঁড়ালেন।
.
এমন অকস্মাৎ মৃত্যুতে ঘরের পাশের লোকের সঙ্গেই দেখা হয় না, তা গ্রামান্তরের! মায়ের এ হেন মৃত্যু সত্যবতীর দেখবার কথা নয়, কিন্তু মাতৃশ্রাদ্ধও দেখা হল না তার।
হ্যাঁ, শ্রাদ্ধ ভুবনেশ্বরীর ভাল করেই হল।
বাড়িতে পাঁচটা বুড়ী আছে বলে যে আর কেউ তার প্রাপ্য পাওনা পাবে না, এমন নীতিতে বিশ্বাসী নন রামকালী। আয়োজন দেখে ক্ষুব্ধ মোক্ষদা রামকালীকে বললেন, আমাদের কথা না হয় ছেড়েই দিলে, কিন্তু তোমার খুড়ো এখনো বেঁচে, তার চোখের সামনে একটা কচি বৌয়ের ছেরাদ্ধয় এত ঘটা করা কি বেশ বিবেচনার কাজ হচ্ছে রামকালী?
রামকালী পিসীর মুখের দিকে না তাকিয়েই উত্তর দিলেন, তোমাদের কথা ছেড়ে দেবার কিছু নেই, কারুর কথাই আমি ছেড়ে দিচ্ছি না, যেটা বিধি সেটাই করছি।
মোক্ষদা একটা ঈর্ষাকাতর নিঃশ্বাস ত্যাগ করে বলেন, পাঁচটা বুড়ীর চোখের ওপর ওই কচি বৌটার সমারোহ করে ছেরাদ্ধ করাই তাহলে বিধি?।
রামকালী তেমনি মুখ ফিরিয়েই বললেন, আত্মার বয়স নেই।
কিন্তু চোখে যে সহ্য করতে পারা যায় না রামকালী! বললেন মোক্ষদা।
রামকালী মৃদুস্বরে বললেন, জগতে অনেক জিনিসই সহ্য করে নিতে হয়। এ নিয়ে বৃথা আলোচনায় ফল কি?
মোক্ষদা চুপ করে গেলেন। কথাটা সত্যি বৈকি কনিষ্ঠজনের মৃত্যুটাই যদি সহ্য করে নেওয়া যায়, তার সেই প্রিয় পরিচিত মূর্তিটা আগুনে পুড়িয়ে শেষ করে চিতায় জল ঢেলে এসেই আবার যাওয়া যায়, ঘুমানো যায়, তবে আর কোন্ মুখে বলা চলে- তার পারলৌকিক কাজটা চোখ মেলে দেখে সহ্য করার ক্ষমতা আমার নেই!
কিন্তু মায়ের শ্রাদ্ধ চোখে দেখবার ক্ষমতা ছেলেমানুষ সত্যবতীর হবে না বলেই কি নিয়ে আসা হল না তাকে?
না, তা নয়, নিজেরই তার আসা সম্ভব হল না। সে যখন মায়ের মৃত্যুসংবাদ পেল, তখন দুদিনের ছেলে নিয়ে আঁতুরঘরে। ভুবনেশ্বরী যেদিন ভোরে মারা গেছেন ঠিক সেইদিনই সকালবেলা সত্যর দ্বিতীয় সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়েছে। পুত্র-সন্তান
দু পরিবার থেকে দুজন লোক কুটুমবাড়ি এসেছে খবর জানাজানি করতে। একজন জনের, আর একজন মৃত্যুর খবর বহন করে।
.
কিন্তু সত্য কেন প্রসবের প্রাক্কালে বাপের বাড়ি আসে নি? বিশেষ করে বাপ যার এত বড় চিকিৎসক?
আসে নি তার কারণ আছে। যদিও ধরতে গেলে কারণটা নিতান্তই মেয়েলী, কিন্তু এসব ক্ষেত্রে মেয়েলী প্রথা আর মেয়েলী কুসংস্কারেই জয়ী হয়, সত্যর বেলাতেও তার অন্যথা হয়নি। সত্যর প্রথমবারের ঘটনাটাই এমন অনিয়মের কারণ। বাপের বাড়িতে যখন অমন একটা অপয়া ব্যাপার ঘটে গেছে, তখন পালা বদল হোক।
তাই এবারে দুপক্ষ থেকেই একমত হয়ে স্থির করা হয়েছিল, সত্যর এবারের সন্তান মাতুলালয়ে ভূমিষ্ঠ না হয়ে পিত্রালয়ে ভূমিষ্ঠ হবে।
সত্য তাই ওখানেই আছে।
ভালই আছে। বেটাছেলেটি কোলে এসেছে। এলোকেশী বড় মুখ করে লোক পাঠিয়েছিলেন বড়লোক কুটুমবাড়ি। তাকে বলে দিয়েছিলেন, শুভ সংবাদের বকশিশ হিসেবে পেতলের গামলাটা দিলে নিবি না, বলবি ঘড়া কই?
কিন্তু ঘরা গামলা কিছুই পাওয়া হল না তার। এসে শুনল এই বিপদ।
ওদিকে সত্যবতীও পুলকে আনন্দে আশায় গর্বে প্রত্যাশিত হয়ে বসেছিল কখন সংবাদদাতা ধড়া নিয়ে ফিরবে। কিন্তু তার ফেরা পর্যন্ত আর অপেক্ষা করে বসে থাকতে হল না! লোক এল ওদিক থেকে।
