অভিমানে সত্য তিন দিন শুয়ে রইল।
ভুবনেশ্বরী অনুযোগ করলে বলল, এই তো চাও তোমরা। বেশ তো, যা চাও তাই হচ্ছে।
সত্যিই হঠাৎ চুপচাপ হয়ে গেল সত্য।
.
কিন্তু ক্ষতিকে কি রোধ করা গেল?
না, রামকালী এখন গ্রহের কোপে পড়েছেন।
রামকালী মহাগুরু নিপাতের বিপাক মুক্ত হতে পারছেন না।
তাই রামকালীর প্রথম দৌহিত্র সন্তান পৃথিবীর আলোয় উদ্ভাসিত না হতেই অন্ধকারের রাজ্যে হারিয়ে গেল।
তা ছাড়া আর কি কারণ?
সত্য তো সব কিছু বিধিনিষেধ মেনে চলছিল ইদানীং।
মোক্ষদা অবশ্য বললেন, এ সেই গোড়ার কালে ধিঙ্গীপনা করার ফল। কিন্তু চিকিৎসক রামকালী তা বলেন না। রামকালীর হঠাৎ মনে হয়, এ বোধ করি তার নিজেরই অবহেলার ফল। পিতা হিসাবে না হোক, চিকিৎসক হিসেবে তার আর একটু কর্তব্য ছিল।
তবু এটাও তো সত্যি, এ পরিবারভুক্ত আত্মীয় আশ্রিত মিলিয়ে যে গোষ্ঠীটি সে গোষ্ঠীতে বছরে গড়ে অন্তত পাঁচ-সাতটা শিশুর জন্ম হচ্ছে নিতান্ত সহজে, প্রায় কর্তা-পুরুষের অজ্ঞাতসারেই।
না, অত্যুক্তি নয়। ওই ছেলেমেয়েগুলো একটু বড় হয়ে যখন অন্যের ট্যাঁকে চড়ে বহির্জগতে বেরোয়, তখন ওঁরা কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করেন, কার এটা?
অতএব অপরাধটা কোথায় রামকালীর?
এই কটা দিন আগে তেল-সন্দেশ সহকারে খবর পাঠানো হয়েছিল সত্যর শ্বশুরবাড়িতে এবং এলোকেশী হেন মানুষও খবরদাত্রীকে একখানি নতুন কাপড়দানে পুরস্কৃত করেছিলেন, বৌকে বাপের ঘরে রাখার অনুমতিও দিয়েছিলেন দীর্ঘকালের জন্যে। আবার এখন এই বার্তা পাঠাতে হবে।
ঘটা করে সাধ দিচ্ছিলেন বৌয়ের বড়লোক বাপ, তা নয়, মূলে হাবাৎ! হয়েছিল অবিশ্যি মেয়েসন্তান, তবু প্রথম সন্তান তো! সত্য তো ভাঙ্গা হয়ে গেল। আরতো সত্য অখণ্ড পোয়াতি রইল না। কোনো শুভকর্মে নিয়ম লক্ষণের কাজে আগ বাড়িয়ে আসতে তো পারবে না সত্য।
কড়া হুকুম দিলেন এলোকেশী, শরীর-স্বাস্থ্য একটু ভাল হলেই যেন মেয়েকে পালকি চড়িয়ে পাঠিয়ে দেন বেহাই। আহ্লাদে মেয়ে বাপের বাড়ি গিয়ে আহ্লাদেপনা করেই যে এইটি ঘটিয়েছেন, তাতে আর সন্দেহ কি!
ঐ বচন হজম করতে হল রামকালীকে।
এ নির্দেশ মানতেই হল।
আবার রাসুকে যেতে হল সত্যর শ্বশুরবাড়ি, কেঁদে কেঁদে চোখ-ফোলানো ম্রিয়মাণ সত্যকে নিয়ে।
কিন্তু রামকালীর গ্রহের কোপ কি কাটল?
মহাগুরু নিপাতের বছর পূর্ণ হয়েও তো আরো একটা বছর কেটে গেল, তবু রামকালীর সংসারে অঘটন ঘটতেই লাগল কেন? কোনোখানো কিছু নেই, নেড়ু নামক নিরীহ ছেলেটা হঠাৎ একদিন হারিয়ে গেল, যেমন করে একদিন রামকালী হারিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু নেড়ু তো খড়মপেটা খায় নি।
অনেক খোঁজাখুঁজি করলেন রামকালী, কুঞ্জ অনেক কাঁদলেন মেয়েমানুষের মত, নেড়ুর বার্তা পাওয়া গেল না। এর ক’মাস পরেই কাশীশ্বরী মারা গেলেন, আরো ক’মাস পরে শিবজায়ার বড় মেয়ে বিধবা হয়ে বাপের বাড়িতে এসে আশ্রয় নিল একপাল ছেলেমেয়ে নিয়ে।
এ সমস্তই যে রামকালীর গ্রহবৈগুণ্য, একথা কেহ না বলবে?
এর সব ‘হ্যাঁপা’ই তো রামকালীকে নিতে হচ্ছে।
আর মজা এই, শত অসুবিধের মধ্যেও রামকালী কাউকে বলেন না, সুবিধে হবে না। শত ঝঞ্ঝাটেও বলে ফেলেন না, আর পারা যাচ্ছে না!
বিধবা হয়ে বাপের বাড়ি আসা খুড়তুতো বোনের বিয়ের যুগ্যি মেয়ে দুটোর জন্যেও তোড়জোর করে পাত্র খুঁজতে ঘটক ঠিক করে স্যাকরা ডেকে পাঠালেন। পাত্র খোঁজা হোক, গহনাপত্রও প্রস্তুত হোক। বোনের ছেলে চারটের কথাও ভুলে থাকলেন না, যথাযথ হিসেবে তাদের কাউকে টোলে, কাউকে পাঠশালা ভর্তি করে দিলেন।
কর্তব্যের ত্রুটি করছেন না রামকালী, করছেন না কোনো অনাচার, তথাপি বারেবারেই ভাগ্যের মার পড়ছে তার উপর।
কিন্তু ওস্তাদের মার নাকি শেষরাত্রে, আর ভাগ্য নামক ব্যক্তিটির মত এমন ওস্তাদ আর কে আছে?
তাই–
রাত্রিশেষের ছায়াছন্ন আলো-আঁধারি মুহূর্তে সে তার প্রধান মারের খেলা দেখিয়ে গেল।
ঘণ্টা কয়েকের ভেদবমিতে ভুবনেশ্বরী মারা গেল!
রামকালী কবারেজের ডেকে কথা কওয়া ওষুধের সমস্ত মাহাত্ম্য কি ব্যর্থ হল? হয়তো ব্যর্থই হল, নিয়তিকে কে পারে ঠেকাতে? কে পারে অপ্রতিরোধ্যকে রোধ করতে? তবু চেষ্টা করবার সম.টাও যে পেলেন না রামকালী। হয়তো সময়টা পেলে আক্ষেপটা কম হত। কিন্তু লাজুক ভুবনেশ্বরী, নির্বোধ ভুবনেশ্বরী সে চেষ্টাটুকুর অবকাশ দেয় নি। সে মাঝরাত্রে বিছানা থেকে উঠে সেই যে ঘাটের ধারে গিয়ে পড়েছিল, আর উঠে আসে নি, কাউকে জানায় নি। হয়তো বা পারেও নি।
বাণী-বুড়ী শেষরাত্রে ঘাটে গিয়ে আবিষ্কার করল এই ভয়ঙ্কর ঘটনার দৃশ্য।
ও মা আঁ আঁ- করে চেঁচাতে চেঁচাতে এসে সে আছড়ে পড়ল। তার আর্তনাদ থেকে ব্যাপারটা বুঝতেও কিছুক্ষণ গেল লোকের।
কিন্তু দু-পাঁচ মিনিট আগে বুঝেই বা কী এমন লাভ হত? তখন তো একেবারে শেষ সময়। চোখ মুখ বসে গেছে, নাড়ী ছেড়ে গেছে।
রামকালী নাড়ীটায় একবার হাত দিয়েই আস্তে সেই প্রায় স্পনহীন হাতখানা নামিয়ে রাখলেন ঝুঁকে বসে রুদ্ধ-কম্পিত স্বরে বললেন, মেজবৌ, এ কী করলে?
রাসু হাতে-ধরা প্রদীপটা রোগিণীর মুখের আরো কাছে এগিয়ে অল, ভূবনেশ্বরী কষ্টে চোখের পাতা টেনে চোখ দুটো খুলল একবার। কি একটা বলতে গেল, ঠোঁট নাড়তে পারল না। চোখের কোণ থেকে দু ফোঁটা জল রগ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। ১৬০
